শিরোনাম
সেলিমুর রহমান
প্রকাশ: ০৮:৩৪, ৩০ মার্চ ২০২৬
এডিএম মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী ১১ পৃষ্টার প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করেন।কুমিল্লার পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ে ট্রেন-বাস সংঘর্ষে ১২ জন নিহতের ঘটনায় প্রতিবেদন দিয়েছে জেলা প্রশাসনের তদন্ত কমিটি। এতে ট্রেনের চালক, রেলের গেইটম্যান, স্টেশন মাস্টারসহ অনেকের অবহেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
রোববার তদন্ত কমিটির প্রধান অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট (এডিএম) মোহাম্মদ জাফর সাদিক চৌধুরী ১১ পৃষ্টার প্রতিবেদন জেলা প্রশাসকের কাছে হস্তান্তর করেন।
পরে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “পদুয়ার বাজার লেভেলক্রসিংয়ের চার গেইটম্যান, বিজয়পুর লেভেলক্রসিংয়ের দুই গেইটম্যান, লালমাই রেলস্টেশন মাস্টার, দুজন লোকোমাস্টার, বাসের চালক ও সড়ক বিভাগ নির্মাণ কাজে অবহেলা প্রতীয়মান হয়েছে।”ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি রোধে আটটি সুপারিশ করা হয়েছে প্রতিবেদনে।
তবে গোপনীয়তার স্বার্থে প্রতিবেদনের সব তথ্য প্রকাশ করা হয়নি বলেও জানান তদন্ত কমিটির প্রধান।২১ মার্চ রাত ৩টার দিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের পদুয়ার বাজার রেলক্রসিংয়ে ট্রেন ও বাসের সংঘর্ষে মোট ১২ জনের মৃত্যু হয়। আহত হন আটজন।
এ ঘটনায় জেলা প্রশাসনের গঠিত তদন্ত কমিটির অন্য সদস্যরা হলেন- বিআরটিএর সহকারী পরিচালক ফারুক আলম, ময়নামতি ক্রসিং হাইওয়ে থানার ওসি আবদুল মমিন, ফায়ার সার্ভিসের সহকারী পরিচালক মো. ইকবাল হোসেন, রেলওয়ের সহকারী পরিবহন কর্মকর্তা আসিফ খান চৌধুরী।
ঘটনার পর এক বাস যাত্রীর করা মামলায় এ পর্যন্ত তিন গেইটম্যানকে গ্রেপ্তার করেছে র্যাব ও পুলিশ।
ভাড়া করা গেইটম্যানও ছিলেন না:
তদন্ত প্রতিবেদনে দুর্ঘটনার ‘মূল কারণ’ হিসেবে ছয় গেইটম্যানের অবহেলাকে চিহ্নিত করা হয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, পদুয়ার বাজার রেলগেইটে দুর্ঘটনার দিন মেহেদী হাসান ও হেলাল নামের দুই গেইটম্যানের দায়িত্ব পালন করার কথা ছিল। কিন্তু তারা সেখানে অনুপস্থিত ছিলেন। তারা এক হাজার টাকার বিনিময়ে কাউসার ও নাজমুল নামে দুজনকে গেইটম্যানের দায়িত্ব পালনের জন্য রাখেন। ভাড়া করা গেইটম্যানও সেখানে ছিলেন না। এ বিষয়ে রেলের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও অবগত ছিলেন না।এ ছাড়া রেলের নিয়মানুযায়ী, পূর্ববর্তী বিজয়পুর রেলগেইটের মশিউর রহমান ও বাবুল হোসেন নামে দুই গেইটম্যানের পদুয়ার বাজারে ফোনে ট্রেন আসার বিষয়টি জানানোর কথা ছিল। কিন্তু তারাও সেটি করেননি।
বাবুল ও মশিউর পদুয়ার বাজারের গেইটম্যানকে ফোন দেওয়ার দাবি করলেও তদন্তের সময় তাদের কললিস্ট থেকে সেটি প্রমাণিত হয়নি। এতে তাদের দুজনেরও দায়িত্বে অবহেলাও প্রতীয়মান হয়েছে।
স্টেশন মাস্টার সতর্ক করেননি:
ট্রেন যখন আপ-এ (ঢাকামুখী) থাকে তখন পূর্ববর্তী স্টেশন মাস্টার পরবর্তী ক্রসিংগুলোতে ফোন করে সতর্ক করার কথা। সেদিন লালমাই স্টেশনে দায়িত্বে পালন করছিলেন সহকারী স্টেশন মাস্টার মো. বশিরুল্লাহ।
তিনি পদুয়ার বাজারে ফোন করেননি। সেটি তিনি লিখিতভাবে তদন্ত কমিটির কাছে জানিয়েছেন। তদন্ত কমিটি তার দায়িত্বে অবহেলারও প্রমাণ পেয়েছে।
চালক সংকেত পাননি, গতিও কমাননি:
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দুর্ঘটনা কবলিত ঢাকা মেইল ট্রেনের দুই লোকোমাস্টার (চালক) মো. হানিফ ও নজরুল ইসলাম লেভেল ক্রসিং পারাপারের সবুজ সংকেত বা ফোন পাওয়ার কথা ছিল। কিন্তু লালমাই স্টেশন মাস্টার ফোন না করার কারণে বিজয়পুর লেভেল ক্রসিংয়ের গেইটম্যান হয় তো তাদেরকে কল করেননি। কিংবা টর্চ বা পতাকার মাধ্যমে সবুজ সংকেত দেননি।যখন চালকরা ফোন বা সবুজ সংকেত পাননি তখন তাদের ট্রেনটি গতি কমিয়ে আনার কথা ছিল। কিন্তু তারা সেটি করেননি। তাই তাদেরও দায়িত্বে অবহেলার বিষয়টি আংশিকভাবে প্রতীয়মান হয়েছে।
স্থাপনার কারণে ট্রেন দেখা যায়নি :
তদন্তে উঠে এসেছে, পদুয়ার বাজার লেভেল ক্রসিংয়ের ২০ ফুটের মধ্যে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়ক সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনা টিন দিয়ে ঘিরে রাখা হয়েছে। এসব স্থাপনার কারণে বাস চালক লেভেল ক্রসিংয়ে উঠার সময় ট্রেনটি দেখতে পাননি।
যে কারণে সড়ক ও জনপথ বিভাগেরও দায় রয়েছে বলে প্রতীয়মান হওয়ায় তাদেরকেও জবাবদিহিতার আওতায় আনার কথা বলা হয়েছে প্রতিবেদনে।
বাসটি ওভারপাস দিয়ে যাওয়ার কথা:
দুর্ঘটনা কবলিত মামুন স্পেশাল বাসের চালক শহিদুল ইসলাম এই পথের নিয়মিত চালক। কিন্তু তিনি লেভেল ক্রসিংয়ের মত ঝুঁকিপূর্ণ জায়গা অতিক্রম করার সময় গতি কমাননি বলে তদন্ত কমিটির কাছে প্রতীয়মান হয়। তার অদক্ষতার পরিচয় পাওয়া গেছে।
একই সঙ্গে এই রেললাইনের উপরে যেহেতু ওভারপাস আছে- তাই বাসটি সেখান দিয়ে যাওয়ার কথা ছিল। তবে বাস কর্তৃপক্ষ দাবি করছে, যাত্রী নামানোর জন্য তাদের পদুয়ার বাজার মোড়ে থামার কথা ছিল।কিন্তু এই দাবিটি তদন্ত কমিটির কাছে সন্তোষজনক বলে মনে হয়নি। তাই বাস চালকেরও দায় রয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে।
যে কারণে বাস কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধেও যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি।
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে সুপারিশ:
দুর্ঘটনা প্রতিরোধে আটটি সুপারিশ করেছে তদন্ত কমিটি। সেগুলো হচ্ছে- লেভেল ক্রসিংয়ে গেইটগুলোকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের নিয়মিত মনিটর করা উচিত, নির্দিষ্ট সময় পর পর গেইটম্যানদের ডোপ টেস্ট করা, ডোপ টেস্টে তারা মাদকাসক্ত প্রমাণ পেলে প্রয়োজনে চাকরিচ্যুত করার সিদ্ধান্ত রাখা।
লেভেল ক্রসিংয়ের গেইটম্যানদের ঘরে দুই বছর ধরে বিদ্যুৎ নেই বলে প্রতীয়মান হওয়ায় রেলক্রসিংয়ের সঙ্গে সিগন্যাল লাইট ও ঘণ্টা চালু রাখতে বৈদ্যুতিক সংযোগ সচল করার সুপারিশ করা হয়েছে। গেইটম্যানদের ঘরে আসবাবপত্র ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়েছে।
সড়ক কর্তৃপক্ষ তাদের কাজের ক্ষেত্রে যেন অবশ্যই রেলের সঙ্গে সমন্বয় করে।
দীর্ঘমেয়াদি রেল ব্যারিকেড ও রেল সিগন্যাল যেন স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাজ করে।
বাস যেন সঠিক পথে চলাচল করে এবং এক পথের বাস যেন অন্য পথে না যায়।
বিআরটিএ যেন এর তদারকি করে তার কথাও বলা হয়েছে তদন্ত প্রতিবেদনে।