শিরোনাম
মনিরুজ্জামান মনির সাংবাদিক ও কলামিস্ট
প্রকাশ: ১৪:০৬, ২২ মার্চ ২০২৬ | আপডেট: ১৪:১৯, ২২ মার্চ ২০২৬
ঢাকা-চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী সুবর্ণ এক্সপ্রেস ট্রেনের টিকিট কালোবাজারি কাণ্ডে বাংলাদেশ রেলওয়ে-এর সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত জনমনে তীব্র প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। দুই স্টুয়ার্টকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার এবং অনবোর্ড সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান এস এ করপোরেশন-কে মাত্র ৭,৫০০ টাকা জরিমানা—এই পদক্ষেপকে অনেকেই অপর্যাপ্ত, দায়সারা এবং লোকদেখানো বলে অভিহিত করছেন।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হওয়া একটি ভিডিওতে টিকিট কালোবাজারির একটি সংঘবদ্ধ চক্রের কার্যক্রম প্রকাশ পায়। প্রাথমিক তদন্তে ভিডিওটির সত্যতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট দুই স্টুয়ার্টের সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হয়। দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে তাদের চাকরি থেকে বহিষ্কার করা হলেও, মূল প্রশ্ন থেকে যায়—এতেই কি সমস্যার সমাধান?
বাস্তবতা হলো, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত এসব স্টাফের মধ্যে কার্যকর জবাবদিহিতা অনেকাংশেই অনুপস্থিত। ফলে টিকিট কালোবাজারি অনেক ক্ষেত্রে একটি “নিয়মিত ব্যবসা” হিসেবে গড়ে উঠেছে। ব্যক্তি পর্যায়ে শাস্তি দিয়ে সমস্যার গভীরে পৌঁছানো সম্ভব নয়, যদি না প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো ও নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থায় পরিবর্তন আনা হয়।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে কেন কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হলো না? অনবোর্ড সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান হিসেবে এস এ করপোরেশন-এর অধীনে নিয়োজিত কর্মীদের মাধ্যমে যদি এ ধরনের অপরাধ সংঘটিত হয়, তাহলে প্রতিষ্ঠানটির লাইসেন্স বাতিল বা স্থায়ীভাবে ব্ল্যাকলিস্ট করা উচিত ছিল। তাতে ভবিষ্যতে অন্যান্য ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সতর্ক হতো এবং একটি শক্ত বার্তা যেত।
কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, মাত্র ৭,৫০০ টাকা জরিমানা এবং একটি কৈফিয়ত তলবের মধ্যেই বিষয়টি সীমাবদ্ধ রাখা হয়েছে। এতে করে অপরাধের গভীরতা ও প্রভাবের তুলনায় শাস্তির মাত্রা অত্যন্ত নগণ্য বলেই প্রতীয়মান হয়।
আরও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে রেলওয়ের কিছু উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার দীর্ঘদিনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকার অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনেকের কাছে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিরপেক্ষতার প্রশ্নে বিতর্কিত হয়ে উঠেছে। এটি কি সত্যিই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান, নাকি দায় এড়ানোর একটি কৌশল—এই প্রশ্ন এখন সর্বত্র।
সাধারণ যাত্রীদের প্রত্যাশা ছিল, বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করবে, যা ভবিষ্যতে টিকিট কালোবাজারির মতো অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর বার্তা দেবে। কিন্তু বর্তমান পদক্ষেপ সেই প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হয়েছে বলেই প্রতীয়মান।
টিকিট কালোবাজারি একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; এটি একটি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার বহিঃপ্রকাশ। এ থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং ঠিকাদারি ব্যবস্থার উপর কঠোর নিয়ন্ত্রণ। অন্যথায়, দুই স্টুয়ার্টের বহিষ্কার এবং সামান্য জরিমানা দিয়ে সমস্যার মূল কারণ কখনোই নির্মূল হবে না—বরং তা বারবার নতুন রূপে ফিরে আসবে।
এখন সময় এসেছে, বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকৃত অর্থে কঠোর ও ন্যায্য সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে জনগণের আস্থা পুনরুদ্ধার করুক।