শিরোনাম
মো: মোতাহার হোসেন সরকার
প্রকাশ: ২০:০০, ৮ মার্চ ২০২৬
ভারত থেকে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি নতুন ব্রডগেজ (BG) এলএইচবি (LHB) কোচ সরবরাহের প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রকৌশল প্রতিষ্ঠান RITES Limited এই কোচগুলো সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে। এ সংক্রান্ত কোচ ও স্পেয়ার পার্টস পরিবহন এবং কাস্টমস ক্লিয়ারেন্সের জন্য একটি ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার নিয়োগ দিতে সম্প্রতি টেন্ডার প্রকাশ করা হয়েছে।
প্রকল্প অনুযায়ী বাংলাদেশে মোট ২০০টি ব্রডগেজ এলএইচবি কোচ পাঠানো হবে। এর সঙ্গে রেলপথে প্রায় ১২০০ ঘনমিটার (CBM) এবং সড়কপথে প্রায় ৮০০ ঘনমিটার স্পেয়ার পার্টসও সরবরাহ করা হবে। এসব কোচ ও যন্ত্রাংশের চূড়ান্ত গ্রহণকারী হবে বাংলাদেশ রেলওয়ের সৈয়দপুরে অবস্থিত ক্যারেজ ও ওয়াগন ওয়ার্কশপের ওয়ার্কস ম্যানেজার।
কোচগুলো ভারতের পাঞ্জাবের কাপুরথালায় অবস্থিত Rail Coach Factory (RCF) থেকে রেলপথে কাপুরথালা–রানাঘাট–গেদে হয়ে দর্শনা সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করবে। পরে বাংলাদেশ রেলওয়ের ইন্টারচেঞ্জ পয়েন্টে কোচগুলো হস্তান্তর করা হবে। অন্যদিকে স্পেয়ার পার্টসের একটি অংশ দিল্লিতে রাইটসের গুদাম অথবা কাপুরথালা থেকে সড়কপথে পেট্রাপোল সীমান্ত হয়ে বেনাপোল দিয়ে বাংলাদেশে পৌঁছাবে।
ডেলিভারি শর্ত অনুযায়ী কোচ ও স্পেয়ার পার্টস CIP (Carriage and Insurance Paid) ভিত্তিতে সরবরাহ করা হবে। অর্থাৎ পরিবহন ও বীমার দায়িত্ব থাকবে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ওপর।
পরিকল্পনা অনুযায়ী প্রথম রেক, যার মধ্যে থাকবে ৮টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) এবং ১২টি নন-এসি কোচ যেটি ২০২৬ সালের মার্চ মাসে কাপুরথালা থেকে পাঠানো হবে। এরপর প্রতি মাসে ২০টি করে কোচের একটি রেক বাংলাদেশে পাঠানো হবে। সব কোচ পাঠানো শেষ হওয়ার সম্ভাব্য সময় ধরা হয়েছে ২০২৭ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি।
স্পেয়ার পার্টসের চালানও একই সময়সীমার মধ্যে ধাপে ধাপে পাঠানো হবে। সড়কপথে স্পেয়ার পার্টস পাঠানো শুরু হবে ২০২৬ সালের মার্চ থেকে এবং তা চলবে ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। রেলপথে পাঠানো স্পেয়ার পার্টসও একই সময়ের মধ্যে বাংলাদেশে পৌঁছানোর কথা রয়েছে।
এই কোচ ও যন্ত্রাংশ পরিবহন, কাস্টমস ক্লিয়ারেন্স এবং ডেলিভারির জন্য ফ্রেইট ফরওয়ার্ডার নিয়োগ দিতে ২০ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখে টেন্ডার প্রকাশ করেছে RITES। টেন্ডারের বিড জমা দেওয়ার শেষ সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ৯ মার্চ ২০২৬ সকাল ১১টা পর্যন্ত এবং টেন্ডার খোলা হবে ১০ মার্চ সকাল ১১টা ৩০ মিনিটে। শুধুমাত্র ভারতের যোগ্য ফ্রেইট ফরওয়ার্ডিং প্রতিষ্ঠানগুলো এতে অংশ নিতে পারবে।
অবশেষে দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর প্রকল্পটির বাস্তবায়ন শুরু হতে যাচ্ছে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে আধুনিক এলএইচবি কোচ যুক্ত হবে, যা যাত্রীসেবার মান উন্নত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
২০০টি এলএইচবি কোচ নির্মাণের দায়িত্ব পেয়েছে ভারতের রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান RITES Limited এবং কোচগুলো তৈরি হচ্ছে পাঞ্জাবের কাপুরথালার Rail Coach Factory-তে। কোচগুলোতে অ্যান্টি-টেলিস্কোপিক বডি, ডিস্ক ব্রেকসহ আধুনিক নিরাপত্তা প্রযুক্তি রয়েছে এবং এগুলো ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ১৬০ কিলোমিটার গতিতে চলাচলের উপযোগী।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ২০ মে বাংলাদেশ রেলওয়ে ও RITES Limited-এর মধ্যে ২০০টি ব্রডগেজ এলএইচবি কোচ কেনার চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। প্রায় ১ হাজার ৩০০ কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্পে অর্থায়ন করছে বাংলাদেশ সরকার ও European Investment Bank (EIB)। এতে প্রতিটি কোচের আনুমানিক মূল্য প্রায় ৬ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।
তবে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের পর রাজনৈতিক পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশ–ভারত সম্পর্কের কিছুটা অবনতি ঘটে। এতে নতুন ২০০টি কোচ কবে দেশে আসবে তা নিয়ে একসময় অনিশ্চয়তা দেখা দেয়।
পরবর্তীতে দুই দেশের সম্পর্ক স্বাভাবিক হলে চুক্তির প্রায় দেড় বছর পর ২০২৫ সালের ২৩ নভেম্বর ভারতের রেল কোচ ফ্যাক্টরি (RCF) বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য কোচ উৎপাদন শুরু করে। প্রথম চালানের জন্য ২০টি কোচ তৈরি করা হয়, যার মধ্যে থাকবে ৮টি শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত (এসি) এবং ১২টি নন-এসি কোচ।
এই প্রকল্পের অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বর মাসে বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি প্রতিনিধি দল ভারতের লখনউয়ে অবস্থিত গবেষণা নকশা ও মান সংস্থা RDSO-তে এলএইচবি কোচের প্রযুক্তি ও নিরাপত্তা মান যাচাই কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে। প্রতিনিধি দলটি বগির অ্যাক্সেল, লোড ও চাপ সহনশীলতার ফ্যাটিগ টেস্ট এবং দুর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতি কমাতে কোচ শেলের ক্র্যাশ সিমুলেশন পরীক্ষাও পরিদর্শন করে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের বহরে বর্তমানে যাত্রীবাহী কোচ সংকট রয়েছে। বিদ্যমান কোচের প্রায় ৫৫ শতাংশই মেয়াদোত্তীর্ণ হওয়ায় নতুন কোচ যুক্ত হলে বিভিন্ন আন্তঃনগর রুটে ট্রেন চলাচল আরও স্বাভাবিক হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এর আগে ২০১৬–১৭ অর্থবছরেও বাংলাদেশ রেলওয়ে ভারতের কাছ থেকে ১২০টি এলএইচবি কোচ আমদানি করেছিল।