শিরোনাম
প্রকাশ: ০৩:৪৭, ১৬ জুলাই ২০২৬
রাজধানীর যানজট নিরসনের অন্যতম ভরসা হিসেবে যাত্রা শুরু করেছিল দেশের প্রথম মেট্রোরেল। প্রতিদিন প্রায় চার লাখ যাত্রী বহনকারী এই গণপরিবহনকে নিরাপদ, আধুনিক ও দীর্ঘস্থায়ী অবকাঠামো হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষার (সেফটি অডিট) সর্বশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে সম্পূর্ণ ভিন্ন এক চিত্র।
মাত্র আড়াই বছরের মাথায় মেট্রোরেলের ৭৩০টি বেয়ারিং প্যাডে ত্রুটি, পিয়ারে ফাটল, রেললাইনে মরিচা, বৈদ্যুতিক স্পার্কিং, ট্রেনের অস্বাভাবিক কম্পন, বারবার যান্ত্রিক ত্রুটি এবং গতি কমিয়ে চলার মতো একাধিক গুরুতর সমস্যা শনাক্ত হয়েছে। নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এগুলো বিচ্ছিন্ন কোনো ত্রুটি নয়, বরং পুরো ব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতার ইঙ্গিত।
নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, পরিদর্শন করা বেয়ারিং প্যাডের মধ্যে ৭৩০টি বা ২৩ শতাংশের বেশি ত্রুটিপূর্ণ। এসব ত্রুটির সঙ্গে মেট্রোরেলের নিম্নমানের রাইডিং কোয়ালিটি, অতিরিক্ত কম্পন এবং বিভিন্ন স্থানে গতিসীমা কমিয়ে আনার সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে।
ফলে যাত্রীদের স্বাচ্ছন্দ্য যেমন কমেছে, তেমনি পুরো ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
২১ দশমিক ২৬ কিলোমিটার দীর্ঘ এমআরটি লাইন-৬ এর বিভিন্ন অংশে পিয়ার হেড এবং কংক্রিট বেইজে উল্লেখযোগ্য ফাটল শনাক্ত করা হয়েছে।
একই সঙ্গে রেললাইনের বিভিন্ন অংশে মরিচা, ফাস্টেনিং যন্ত্রাংশের ত্রুটি এবং অন্যান্য অবকাঠামোগত দুর্বলতাও ধরা পড়েছে। ওভারহেড ক্যাটেনারি সিস্টেমে ক্রমাগত বৈদ্যুতিক স্পার্কিংকে স্থায়ী পরিচালনগত ঝুঁকি হিসেবে উল্লেখ করে অগ্নিকাণ্ডের আশঙ্কার কথাও বলা হয়েছে।
কমিটির পর্যবেক্ষণে বলা হয়েছে, ট্রেন চলাচলের সময় অতিরিক্ত কম্পন, ঝাঁকুনি, ট্র্যাক-সাপোর্ট সমস্যা এবং ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাডের কারণে যাত্রী স্বাচ্ছন্দ্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। কম্পন নিয়ন্ত্রণে রাখতে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন অংশে ট্রেনের গতি কমিয়ে দেওয়া হয়েছে। অথচ পুরো সিস্টেমটি ঘণ্টায় ১১০ কিলোমিটার গতিতে চলার উপযোগী করে নির্মাণ করা হয়েছিল।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বর্তমানে অধিকাংশ অংশে ট্রেনের গতি ঘণ্টায় ৬০ থেকে ৯০ কিলোমিটারের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা হচ্ছে। আবার অন্তত কয়েকটি অংশে গতি নেমে এসেছে ঘণ্টায় মাত্র ৪৪ থেকে ৪৭ কিলোমিটারে। অর্থাৎ পরিকল্পিত সক্ষমতার অনেক নিচে পরিচালিত হচ্ছে দেশের সবচেয়ে ব্যয়বহুল গণপরিবহন প্রকল্প।
২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর ফার্মগেট স্টেশনের কাছে একটি স্থানচ্যুত লোড-বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ে এক পথচারীর মৃত্যুর পর উচ্চ আদালত ও সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় ৯ সদস্যের স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষা কমিটি গঠন করা হয়।
এর আগের বছর একই এলাকায় আরেকটি বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ার ঘটনাও ঘটে। মাত্র এক বছরের ব্যবধানে একই ধরনের দুটি ঘটনা মেট্রোরেলের নকশা, নির্মাণমান এবং রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে।
চুয়েটের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক মো. জাহাঙ্গীর আলমের নেতৃত্বাধীন কমিটি সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলেছে, এমআরটি লাইন-৬ বর্তমানে একটি ‘যৌগিক ঝুঁকি প্রোফাইলে’র অধীনে পরিচালিত হচ্ছে। অর্থাৎ এখানে একাধিক নিরাপত্তা ঝুঁকি একে অপরের সঙ্গে সম্পর্কযুক্ত এবং সময়মতো সমাধান না করলে পরিস্থিতি আরও জটিল হতে পারে।
নিরীক্ষায় বিশেষভাবে ৪২৩, ৪৪২, ৪৪৬ এবং ৪৪৮ নম্বর পিলারের বেয়ারিং প্যাডকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ট্রেন চলাচলের সময় এসব পিয়ারে বেয়ারিং প্যাডে তীব্র আঘাত লাগছে এবং অন্তত একটি প্যাড স্থানচ্যুত হয়েছে। কমিটি এগুলো দ্রুত প্রতিস্থাপনের সুপারিশ করেছে।
বেয়ারিং প্যাডের ব্যাপক ত্রুটির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে নকশাগত দুর্বলতার বিষয়টিও সামনে এসেছে। এ কারণে জাপানি নকশা পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছে কমিটি। যদিও সংশ্লিষ্ট পরামর্শক প্রতিষ্ঠান দাবি করেছে, ঠিকাদাররা ডিফেক্ট নোটিফিকেশন পিরিয়ডের আওতায় ত্রুটিগুলো সমাধান করছে। কিন্তু একই ধরনের সমস্যা বারবার ফিরে আসায় সেই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নয় নিরীক্ষা কমিটি।
কাঠামোগত ত্রুটির মধ্যে সবচেয়ে উদ্বেগজনক হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে পিয়ার হেড, কংক্রিট বেইজ এবং বক্স গার্ডারের ফাটল। বিশেষ করে ৩৪১ নম্বর পিয়ারে এক মিলিমিটারের বেশি প্রশস্ত ফাটল শনাক্ত হয়েছে। কমিটির ভাষায়, এ ধরনের ফাটল অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে কাঠামোগত অবনতি আরও বাড়তে পারে। তাই অবিলম্বে ফাটল সিল করে প্রকৌশলগত প্রতিকারমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে।
পরিচালনগত দিক থেকেও একের পর এক দুর্বলতা সামনে এসেছে। নিরীক্ষায় দেখা গেছে, ট্রেনগুলো প্রায়ই নির্ধারিত অবস্থানের আগেই থেমে যাচ্ছে। অতিরিক্ত ঝাঁকুনি দিয়ে ব্রেক করার ফলে ট্রেনের দরজা ও প্ল্যাটফর্ম স্ক্রিন ডোরের মধ্যে অসামঞ্জস্য তৈরি হচ্ছে। এতে যাত্রীদের নিরাপত্তা ঝুঁকি বাড়ছে।
ঘন ঘন যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে ইতোমধ্যে পাঁচটি ট্রেনসেট অপারেশন থেকে প্রত্যাহার করতে হয়েছে। এছাড়া ট্রেনের চাকার অস্বাভাবিক ক্ষয়, সম্ভাব্য ফাটল, দরজা নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার ব্যর্থতা এবং প্যান্টোগ্রাফের ক্ষতিও শনাক্ত হয়েছে। কমিটি সতর্ক করেছে, চাকার এসব ত্রুটি সময়মতো সমাধান না করা হলে লাইনচ্যুতির মতো বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাতেও একাধিক উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ১২টি বজ্রপাত নিরোধকের মধ্যে তিনটি ক্ষতিগ্রস্ত। ওভারহেড ক্যাটেনারি তারে নিয়মিত বৈদ্যুতিক স্পার্কিং হচ্ছে। বৈদ্যুতিক ও সিগন্যালিং কক্ষে পানি চুইয়ে পড়ছে। এসব কারণে শর্ট সার্কিট, অগ্নিকাণ্ড, তার ছিঁড়ে যাওয়া, ট্রেন আটকে পড়া কিংবা পুরো সিস্টেম বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে বলে উল্লেখ করেছে কমিটি।
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, বহু স্থানে রিয়েল-টাইম স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম নেই। ফলে সমস্যা তৈরি হওয়ার পর চাক্ষুষ পরিদর্শনের ওপরই নির্ভর করতে হচ্ছে। আধুনিক মেট্রোরেলের ক্ষেত্রে যেখানে সেন্সরভিত্তিক সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা থাকার কথা, সেখানে এখনো পর্যাপ্ত প্রযুক্তিগত নজরদারি গড়ে ওঠেনি।
নিরীক্ষায় আরও দেখা গেছে, অনেক স্টেশনের কলাম সিঙ্গেল-পাইল ফাউন্ডেশনের ওপর নির্মিত হলেও পর্যাপ্ত পার্শ্বীয় ব্রেসিং নেই। ভূমিকম্পের সময় এ ধরনের কাঠামো অতিরিক্ত ঝুঁকিতে পড়তে পারে। এছাড়া স্থায়ী পাইলগুলোর লোড টেস্টের তথ্যও অসম্পূর্ণ অথবা পর্যাপ্তভাবে সংরক্ষণ করা হয়নি।
কমিটি এক মাসের মধ্যে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ পিয়ারগুলোতে জরুরি মেরামতের সুপারিশ করেছে। একই সঙ্গে ক্র্যাক গেজ স্থাপন, ত্রুটিপূর্ণ বেয়ারিং প্যাড প্রতিস্থাপন, বর্ষার আগে সব সাবস্টেশন ও সিগন্যালিং রুম পানি নিরোধক করা, ত্রুটিপূর্ণ ট্রেন অপারেশন থেকে সরিয়ে নেওয়া এবং বৈদ্যুতিক স্পার্কিংয়ের কারণ অনুসন্ধানের সুপারিশ করা হয়েছে।
আগামী ছয় মাসের মধ্যে পুরো লাইনে ডায়নামিক ভাইব্রেশন টেস্ট সম্পন্ন করে ধাপে ধাপে গতিসীমা সংকোচন প্রত্যাহারের পরিকল্পনা নেওয়ার কথাও বলা হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী স্ট্রাকচারাল হেলথ মনিটরিং সিস্টেম স্থাপন, ডিজিটাল ত্রুটি ব্যবস্থাপনা চালু এবং আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষক নিয়োগের সুপারিশ করেছে কমিটি।
বিশ্লেষকদের মতে, ৩২ হাজার ৭১৭ কোটি টাকার এই মেগা প্রকল্প শুধু একটি পরিবহনব্যবস্থা নয়, দেশের উন্নয়নের প্রতীক হিসেবেও বিবেচিত। কিন্তু যাত্রী নিরাপত্তা নিয়ে বারবার প্রশ্ন উঠলে প্রকল্পটির প্রতি জনআস্থাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। বিশেষ করে একই ধরনের বেয়ারিং প্যাড নিচে পড়ার ঘটনা দুইবার ঘটার পরও মূল কারণ স্থায়ীভাবে সমাধান না হলে ভবিষ্যতে আরও বড় ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, একটি নতুন মেট্রোরেলে এত অল্প সময়ে এ ধরনের বহুমাত্রিক ত্রুটি স্বাভাবিক নয়। সাধারণত এ ধরনের অবকাঠামো ২০ থেকে ২৫ বছর বড় ধরনের কাঠামোগত সমস্যা ছাড়াই পরিচালিত হওয়ার কথা। সেখানে মাত্র কয়েক বছরের মধ্যেই বেয়ারিং প্যাড, পিয়ার, ট্র্যাক, বিদ্যুৎ ব্যবস্থা এবং রোলিং স্টকে একসঙ্গে ত্রুটি দেখা দেওয়া উদ্বেগজনক।
তারা আরও বলেন, মেট্রোরেলের বর্তমান অবস্থা কেবল নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের সমস্যা নয়; বরং এটি একটি সিস্টেমভিত্তিক সতর্কবার্তা। এখনই নকশা, নির্মাণমান, রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থাপনাকে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী পুনর্মূল্যায়ন না করলে যাত্রী নিরাপত্তা, সেবার মান এবং এই মেগা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব বড় চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। দেশের সবচেয়ে আধুনিক গণপরিবহন হিসেবে যে মেট্রোরেল নির্ভরতার প্রতীক হওয়ার কথা ছিল, স্বাধীন নিরাপত্তা নিরীক্ষার পর্যবেক্ষণ বলছে, সেটি এখন একের পর এক ত্রুটি নিয়ে ঝুঁকির মধ্যেই চলছে।
কমিটির সদস্য এবং বুয়েটের অধ্যাপক ড. শামসুল হক ঢাকা মেইলকে বলেন, এত অল্প সময়ে বেয়ারিং প্যাড স্থানচ্যুত হওয়া বা নিচে পড়ে যাওয়া আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী অত্যন্ত অস্বাভাবিক। বিশ্বে এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল। আপাতত নতুন করে প্যাড যাতে স্থানচ্যুত না হয়, সে জন্য সেগুলোর চারপাশে ব্র্যাকেট বসানো হচ্ছে। তবে এটি স্থায়ী সমাধান নয়, বরং সাময়িক ঝুঁকি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা।
ড. শামসুল হক বলেন, বর্তমানে গতি কমিয়ে এবং বেয়ারিং প্যাডে ব্র্যাকেট বসিয়ে সিস্টেম সচল রাখা হচ্ছে। কিন্তু এগুলো কোনো স্থায়ী সমাধান নয়। ট্রেনগুলো নকশায় নির্ধারিত গতিতে চলতে পারছে না। গতি কমিয়ে ঝুঁকি কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করা গেলেও এতে যাত্রীসেবা, উৎপাদনশীলতা এবং রাজস্ব আয় কমে যাচ্ছে। একই সঙ্গে রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয়ও দ্রুত বাড়ছে।
এই বিশেষজ্ঞ বলেন, শুরু থেকেই রক্ষণাবেক্ষণ ব্যয় এভাবে বাড়তে থাকলে ভবিষ্যতে প্রকল্পের আর্থিক টেকসই ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। তিনি বৈদ্যুতিক স্পার্কিং, দরজার অসামঞ্জস্য, সাবস্টেশনে পানি প্রবেশ এবং পর্যাপ্ত মনিটরিংব্যবস্থার অভাবকে ভবিষ্যতের বড় সংকটের পূর্বাভাস হিসেবে উল্লেখ করেন।