ঢাকা, শনিবার, ০৪ জুলাই ২০২৬

১৯ আষাঢ় ১৪৩৩

মেট্রোরেলের দু’প্রকল্প করবে জাপান

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ০৯:৫৬, ৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ০৯:৫৭, ৩ জুলাই ২০২৬

মেট্রোরেলের দু’প্রকল্প করবে জাপান

জাপান বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী। দেশের অনেক উন্নয়ন প্রকল্প জাপান নির্ধারিত সময়ের আগে সম্পন্ন করে প্রকল্পে খরচ কমানোর রেকর্ড গড়েছে। অথচ অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে দায়িত্বশীলদের অদূরদর্শিতার কারণে একাধিক প্রকল্প নিয়ে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু নির্বাচিত বিএনপি সরকার সে টানাপোড়েন ঘুচিয়ে জাপানি ঋণে মেট্রোরেলের দুটি প্রকল্পের (লাইন-১ ও লাইন-৫) প্রক্রিয়া এগিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার দায়িত্বও জাপানকে দেওয়া হচ্ছে। তবে ব্যয় কমানোর বিষয়ে দর-কষাকষিও চালিয়ে যাবে। এ জন্য ৭ সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছে।জানতে চাইলে সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশীদ বলেন, সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত হচ্ছে জাপানের অর্থায়নে মেট্রোরেল দুটি নির্মাণ হবে। তবে প্রকল্পের ব্যয় কমাতে জাপানের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা জাইকার সঙ্গে আলোচনা চলছে। অচিরেই বিষয়টি সুরাহা হবে।জানা যায়, রাজধানীতে নতুন দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পে জাপানি কোম্পানিগুলোর উচ্চ দর প্রস্তাবকে কেন্দ্র করে জাপানের সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে টানাপোড়েন তৈরি হয়। অন্তর্বর্তী সরকার এই দুই প্রকল্পের প্রক্রিয়াগত কাজ স্থগিত রাখে। অথচ বাংলাদেশের বড় উন্নয়ন সহযোগী জাপান। বিদেশি ঋণ ও সহায়তা বিষয়ে অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) (২০২৪-২৫) প্রতিবেদনে দেখা যায়, ২০২৫ সালের ৩০ জুন বাংলাদেশের বিদেশি ঋণের পরিমাণ (স্থিতি) ছিল ৭ হাজার ৭২৮ কোটি মার্কিন ডলার। এর ১৮ শতাংশই দিয়েছে জাপান। সহজ শর্তে জাপানি ঋণ পাওয়া যায়।


জাপান জাইকার মাধ্যমে বাংলাদেশের মেট্রোরেল, মহেশখালীর মাতারবাড়ীর বিদ্যুৎকেন্দ্র, ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল, যমুনা নদীর ওপর নির্মিত রেলওয়ে সেতুসহ বিভিন্ন প্রকল্পে সাম্প্রতিককালে ঋণ দিয়েছে। তবে কোনো কোনো প্রকল্পে উচ্চ ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। যেমন দর প্রস্তাব অনুযায়ী ঢাকায় নতুন দুটি পথে মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় ধরা হয়েছে ৩ হাজার ৬১৮ কোটি টাকা। রাজধানীর উত্তরা থেকে মতিঝিল পর্যন্ত মেট্রোরেল নির্মাণে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় হয়েছে ১ হাজার ৫৭৪ কোটি টাকা।ঢাকা মাস ট্রানজিট কোম্পানির (ডিএমটিসিএল) পক্ষ থেকে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় বিশ্লেষণ করা হয়েছিল। তাতে দেখা যায়, জমি অধিগ্রহণ ও বেতন-ভাতা বাদ দিয়ে শুধু প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে ভারতে ব্যয় হয় ১৫০ থেকে ৪৫০ কোটি টাকা।

নতুন দুটি মেট্রোরেল পথের একটি ঢাকার বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর, নতুনবাজার থেকে পূর্বাচল (এমআরটি লাইন-১) এবং হেমায়েতপুর-ভাটারা (এমআরটি লাইন-৫)। ২০১৯ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে এ দুটি প্রকল্প অনুমোদন পায়। তখন দুটি প্রকল্পের প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় যথাক্রমে ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি ও ৪১ হাজার ২৩৮ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে বিস্তারিত সমীক্ষা শেষে এমআরটি-১ প্রকল্পের ব্যয় ৯৬ হাজার ৫০০ কোটি টাকা এবং এমআরটি-৫ প্রকল্পের ব্যয় ৮৮ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করে প্রকল্প বাস্তবায়নকারী সংস্থা জাইকা। মানে এমআরটি-১ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ৮৪ শতাংশ, এমআরটি-৫ প্রকল্পে ব্যয় বাড়ছে ১১৩ শতাংশ।উচ্চ হারে দর প্রস্তাব নিয়ে আপত্তি করেছিল ডিএমটিসিএলের তৎকালীন প্রশাসন। তখন ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন ফারুক আহমেদ। তাঁর অস্ট্রেলিয়া, ভারত, সউদী আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও হংকং এই পাঁচটি দেশে মেট্রোরেল নির্মাণ ও পরিচালনায় কাজ করার অভিজ্ঞতা রয়েছে। ডিএমটিসিএল ব্যয় নিয়ে প্রশ্ন তোলার পর মেট্রোরেল প্রকল্প ‘অধিক পর্যালোচনার জন্য আপাতত স্থগিত থাকুক’ বলে নির্দেশনা দেয় পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। ওই সময় মেট্রোরেলের খরচ নিয়ে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে জাপানের তৈরি হওয়া টানাপোড়েন কমাতে সচিবালয় ও সচিবালয়ের বাইরে অন্তত চারটি বৈঠক হয়েছে। মেট্রোরেল বাস্তবায়নের সঙ্গে সম্পৃক্ত সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তাদের মধ্যে একটি, অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের (ইআরডি) সচিব শাহরিয়ার কাদের ছিদ্দিকীর সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত সাইদা শিনইচির একটি, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব জিয়াউল হকের সঙ্গে জাইকার প্রতিনিধিদের একটি এবং সড়ক ও সেতুমন্ত্রী শেখ রবিউল আলমের সঙ্গে জাইকার প্রতিনিধিদলের মধ্যে একটি বৈঠক হয়।


মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, সব দিক বিবেচনা করে প্রকল্প এগিয়ে নেওয়া এবং আলোচনা করে মেট্রোরেল নির্মাণের প্রাক্কলিত ব্যয় কমানোর চেষ্টা করার সিদ্ধান্ত হয়। গত ২০ মে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে দুটি প্রকল্পের ‘অস্বাভাবিক’ খরচ নিয়ে আলোচনা হয়। সভায় সিদ্ধান্ত হয়, ব্যয় কমানোর জন্য দর-কষাকষি অব্যাহত রাখা হবে। প্রয়োজনে আন্তর্জাতিক মানের পরামর্শকও নিয়োগ করা যেতে পারে।

অবশ্য ডিএমটিসিএলের একটি সূত্র জানিয়েছে, জাইকার পক্ষ থেকে যুক্তি দেওয়া হচ্ছে যে, নতুন দুটি মেট্রোরেলের বড় অংশ যাবে মাটির নিচ দিয়ে। সে কারণে মেট্রোরেল-৬ (মতিঝিল থেকে উত্তরার দিয়াবাড়ি) এর চেয়ে নতুন দুটি মেট্রোরেলের খরচ বেশি পড়ছে। ডলার ও নির্মাণ উপকরণের মূল্যবৃদ্ধিও খরচ বেড়ে যাওয়ার কারণ। চারটি বৈঠকে জাইকার পক্ষ থেকে উদাহরণ দেওয়া হয়, ২০১৯ সালে গাবতলী স্টেশনের যে নকশা করা হয়েছিল, এখন তা সংশোধন করতে হচ্ছে। তখন গাবতলী স্টেশনের দৈর্ঘ্য ধরা হয় ৩০০ মিটার, সেটি বাড়িয়ে করা হচ্ছে ৬৫০ মিটার। আবার ভাটারা স্টেশন ও কচুক্ষেত স্টেশনের গভীরতা বাড়ছে। শ্রমিকের ব্যয় বাড়ছে। অন্যদিকে সরকার বলছে, জাপানের ঋণের শর্তগুলো এমনভাবে তৈরি করা হয়, যেখানে অন্য কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দরপত্রে অংশ নেওয়ার সুযোগ থাকে কম।মেট্রোরেল প্রকল্পে দরপত্রগুলো সবার জন্য উন্মুক্ত থাকলেও মোটাদাগে দু-তিনটি কোম্পানি ঘুরেফিরে দরপত্রে অংশ নিয়ে থাকে। ফলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণের সুযোগ কমে যায়।
এদিকে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ এ দুটি প্রকল্প প্রস্তাবের ব্যয় বৃদ্ধির যৌক্তিকতা যাচাই করতে ৭ সদস্যের কারিগরি কমিটির আহ্বায়ক এশিয়া প্যাসিফিক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস প্রফেসর এম শামীমুজ্জামান বসুনিয়া বলেন, দুটি মেট্রোরেলের ব্যয় কেন বাড়ল, সেটি আমরা পর্যালোচনা করবো। ব্যয় বৃদ্ধি যৌক্তিক কি না, তা-ও দেখা হবে।

এদিকে ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনার (গ্রাউন্ড হ্যান্ডলিং) কাজ জাপানি কোম্পানিকে দেওয়া এবং রাজস্ব ভাগাভাগি নিয়ে অনেক দিন ধরেই দর-কষাকষি ও সিদ্ধান্তহীনতা চলছিল। বিএনপি সরকার আসার পর বিষয়টি সুরাহা হয়েছে। কাজটি পাচ্ছে জাপানি কোম্পানিই। ২০১৭ সালে ২১ হাজার কোটি টাকার বেশি ব্যয়ে তৃতীয় টার্মিনাল প্রকল্প নেওয়া হয়। এই ব্যয়ের মধ্যে সরকার পাঁচ হাজার কোটি টাকা দিয়েছে। বাকিটা ঋণ দিয়েছে জাপান।বিএনপি সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর গত ২২ ফেব্রুয়ারি তৃতীয় টার্মিনাল দ্রুত চালুর জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম গণমাধ্যমকে বলেন, তৃতীয় টার্মিনাল পরিচালনায় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে জাপানি কনসোর্টিয়ামের (চার কোম্পানির জোট) এ মাসের মধ্যে চুক্তি সইয়ের জোর চেষ্টা চলছে। টার্মিনাল পরিচালনায় রাজস্ব ভাগাভাগিতে জাপান পাবে ৭৩ শতাংশ, বাংলাদেশ পাবে ২৭ শতাংশ।

জাপানি কনসোর্টিয়ামে রয়েছে জাপান এয়ারপোর্ট টার্মিনাল কোম্পানি, সুমিতোমো করপোরেশন, নিপ্পন কোয়েই এবং নারিতা ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট করপোরেশন।
এদিকে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অন্যান্য দেশের জন্য ঋণের সুদের হার বাড়িয়েছে জাপান। নতুন সুদের হার গত ১ এপ্রিল কার্যকর হয়েছে। ইআরডি সূত্র জানায়, সাধারণ জাপানি ঋণের ক্ষেত্রে গত বছরের অক্টোবরে সুদের হার (স্থির) ছিল ২ দশমিক ৯ শতাংশ। ১ এপ্রিল থেকে সেটা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ দশমিক ৬ শতাংশে। অর্থাৎ সুদের হার বেড়েছে শূন্য দশমিক ৭ শতাংশীয় বিন্দু। সুদের হার আগের অবস্থানে বা নমনীয় রাখতে জাপানের অর্থমন্ত্রীকে চিঠি দিয়েছেন বাংলাদেশের অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। চিঠিতে বলা হয়, জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রযাত্রায় জাপানের ভূমিকা অপরিসীম। চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটের কারণে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময়সীমা তিন বছর পিছিয়ে দেওয়ার জন্য জাতিসংঘকে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ। এলডিসি উত্তরণ-প্রস্তুতির সময়কাল ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর অনুরোধের সমর্থনও পাওয়া গেছে। অর্থমন্ত্রী আগামী তিন বছর সুদের হার নমনীয় বা আগের অবস্থানে রাখতে জাপানের অর্থমন্ত্রীকে অনুরোধ জানান।

জানতে চাইলে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের সাবেক মুখ্য অর্থনীতিবিদ জাহিদ হোসেন বলেন, জাপানি কোম্পানিগুলোর দক্ষতা ও যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন নেই। ভূরাজনীতি ও অর্থনীতির প্রয়োজনে জাপানের সঙ্গে বাংলাদেশের সুসম্পর্ক রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু প্রকল্পে ব্যয় কমানোর চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।

আরও পড়ুন