শিরোনাম
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ২৩:০১, ১১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২৩:০১, ১১ জুলাই ২০২৬
অনুমোদনের প্রায় দুই বছর পরও কালুরঘাটে কর্ণফুলী নদীর ওপর বহুল প্রতীক্ষিত নতুন রেল কাম-সড়ক সেতুর নির্মাণকাজ শুরুই হয়নি। পরামর্শক (কনসালট্যান্ট) নিয়োগে বিলম্বের কারণে প্রকল্পটি স্থবির হয়ে আছে। অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূস ২০২৫ সালের ১৪ মে দেশের অন্যতম ব্যয়বহুল এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করলেও এখনো পরামর্শক নিয়োগের প্রক্রিয়া চূড়ান্ত হয়নি। ২০২৪ সালের অক্টোবরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) প্রকল্পটি অনুমোদন দেয়।পরিকল্পনা অনুযায়ী, ওই বছরের নভেম্বরের মধ্যেই পরামর্শক নিয়োগ এবং চলতি বছরের মাঝামাঝি সময়ে পূর্ণাঙ্গ ভৌত নির্মাণকাজ শুরু হওয়ার কথা ছিল। তবে প্রকল্প সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, রিকোয়েস্ট ফর প্রপোজাল (আরএফপি) বারবার সংশোধনের কারণে পুরো প্রক্রিয়ায় বিলম্ব হয়েছে। মূলত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে অর্থায়নকারী সংস্থার পর্যালোচনার সময় আরএফপিতে কয়েকটি কারিগরি ত্রুটি চিহ্নিত হয়। পরে চার দফা সংশোধনের পর তা চূড়ান্ত করা হয়।গতকাল বৃহস্পতিবার কালবেলাকে বাংলাদেশ রেলওয়ের (পূর্বাঞ্চল) প্রকল্প পরিচালক (পিডি) মো. আবুল কালাম চৌধুরী বলেন, প্রস্তাব মূল্যায়নের পর একটি প্রতিষ্ঠানকে পরামর্শক নির্বাচন করা হবে। আশা করছি, চলতি বছরের মধ্যেই নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে ভূমি অধিগ্রহণের প্রস্তাব ও বিস্তারিত নকশার কাজ এগিয়ে নিতে পারব।তিনি বলেন, গত বছরের জুলাই মাসেই এক্সপ্রেশন অব ইন্টারেস্ট (ইওআই) পর্ব সম্পন্ন হয় এবং একই মাসে আরএফপি অনুমোদনের জন্য কোরিয়ান এক্সিম ব্যাংকে পাঠানো হয়। অর্থায়নকারী সংস্থার চূড়ান্ত অনুমোদনের অপেক্ষায় থাকাকালে তারা আরএফপিতে কয়েকটি কারিগরি ত্রুটি চিহ্নিত করে চার দফা সংশোধনের নির্দেশ দেয়। চলতি বছরের ১৮ মার্চ আরএফপি অনুমোদন পায় এবং ২৪ মার্চ পাঁচটি সংক্ষিপ্ত তালিকাভুক্ত (শর্টলিস্টেড) প্রতিষ্ঠানের কাছে তা পাঠানো হয়।সরকারি নথিতে ‘কর্ণফুলী নদীর ওপর কালুরঘাটে রেল কাম-সড়ক সেতু নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পটি ২০২৪ সালের ৭ অক্টোবর একনেকে অনুমোদিত হয়। প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে ১১ হাজার ৫৬০ কোটি টাকা এবং বাস্তবায়নের সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে ডিসেম্বর ২০৩০ পর্যন্ত। তবে সরকারি প্রকল্প পর্যবেক্ষণ সংস্থা আইএমইডির সর্বশেষ বাস্তবায়ন অগ্রগতি প্রতিবেদনে দেখা গেছে, প্রকল্পটির ভৌত ও আর্থিক অগ্রগতি মাত্র ১ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ। যদিও চলতি অর্থবছরের বরাদ্দের একটি অংশ ব্যয় হয়েছে, তবে মাঠপর্যায়ে এখনো মূল নির্মাণকাজ শুরু হয়নি।এ বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক বলেন, এ পর্যন্ত যে অর্থ ব্যয় হয়েছে তার বেশিরভাগই প্রকল্প কার্যালয় পরিচালনা, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমে ব্যয় হয়েছে। মূল নির্মাণকাজে এখনো কোনো অর্থ ব্যয় হয়নি।
চট্টগ্রাম ও কক্সবাজারের মধ্যে রেল যোগাযোগ উন্নত করার পাশাপাশি প্রকল্পটির লক্ষ্য ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের মাধ্যমে চীন, ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সংযোগ সহজ করা এবং কক্সবাজার জেলার মহেশখালীর মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর থেকে পণ্য পরিবহনের জন্য নিরবচ্ছিন্ন রেল করিডোর গড়ে তোলা। মোট প্রকল্প ব্যয়ের মধ্যে ৪ হাজার ৪৩৫ কোটি টাকা বহন করবে বাংলাদেশ সরকার এবং বাকি ৭ হাজার ১২৫ কোটি টাকা দক্ষিণ কোরিয়ার ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট কো-অপারেশন ফান্ড ও ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট প্রমোশন ফ্যাসিলিটি থেকে ঋণ হিসেবে আসবে।
এর আগে ২০১৮ সালে একই স্থানে একটি সেতু নির্মাণের জন্য ১ হাজার ১৬৩ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রস্তুত করা হলেও নানা জটিলতায় সেটি অনুমোদন পায়নি।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, সে সময় প্রস্তাবিত নকশায় সেতুর নৌ-উচ্চতা ৭ দশমিক ৬ মিটার ধরা হয়েছিল। পরে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ) ১২ দশমিক ২ মিটার নৌ-উচ্চতার দাবি জানালে নকশা পুনর্বিবেচনার প্রয়োজন হয়। ফলে ওই প্রকল্পটি আর অনুমোদন পায়নি।
নতুন প্রকল্পের প্রধান বৈশিষ্ট্যের মধ্যে রয়েছে ৭০০ মিটার দীর্ঘ ডাবল-ট্র্যাক, ডাবল-লেন রেল কাম-সড়ক সেতু, ৬ দশমিক ২ কিলোমিটার ভায়াডাক্ট, ৪ দশমিক ৫৪ কিলোমিটার বাঁধ (এমব্যাংকমেন্ট) এবং ২ দশমিক ৪০ কিলোমিটার সড়ক ভায়াডাক্ট নির্মাণ।
বর্তমান একমুখী সেতুর সীমাবদ্ধতার কারণে যানবাহনকে দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয় এবং ভারী পণ্যবাহী যানবাহনকে বিকল্প ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। এ কারণে নতুন সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা আরও বেড়েছে। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার নতুন রেলপথে ট্রেন চলাচল নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ রেলওয়ে ২০২৩ সালের আগস্টে ৯৪ বছর পুরোনো বিদ্যমান সেতুটির সংস্কারকাজ শুরু করে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে নতুন রেলপথ চালু হওয়ার পর সংস্কারকাজ শেষ হলে ২০২৪ সালের ২৭ অক্টোবর সেতুটি পুনরায় যান চলাচলের জন্য খুলে দেওয়া হয়। বর্তমানে নির্ধারিত ওজনসীমা মেনে প্রয়োজনীয় সতর্কতা অবলম্বন করে সেতুটি দিয়ে ট্রেন চলাচল অব্যাহত রয়েছে। নতুন সেতুর নির্মাণকাজ শুরু না হওয়ায় প্রায় শতবর্ষী এই সেতুর ওপরই দক্ষিণ চট্টগ্রামের রেল যোগাযোগ নির্ভর করছে।
বুয়েটের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক এম. শামসুল হক কালবেলাকে বলেন, প্রকল্পটি প্রযুক্তিগতভাবে এখনো ২০৩০ সালের মধ্যে সম্পন্ন করা সম্ভব। কারণ এতে বড় ধরনের প্রকৌশলগত জটিলতা বা ভূমি অধিগ্রহণসংক্রান্ত সমস্যা নেই। তবে আরও দেরি হলে মুদ্রাস্ফীতি এবং পুরোনো ব্যয়-প্রাক্কলনের কারণে প্রকল্পের মোট ব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাবে। তিনি বলেন, এই অচলাবস্থা কাটাতে অর্থায়ন দ্রুত চূড়ান্ত করতে হবে। এ জন্য অর্থায়নকারী পক্ষের সঙ্গে কৌশলগতভাবে বিষয়টি এগিয়ে নিতে হবে। অন্যথায়, প্রয়োজনে বিকল্প অর্থায়নকারী বা অর্থায়ন অংশীদার খুঁজে বের করার উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
নতুন সেতুটি স্থানীয় মানুষের দীর্ঘদিনের প্রাণের দাবি উল্লেখ করে বোয়ালখালী-কালুরঘাট সেতু বাস্তবায়ন পরিষদের আহ্বায়ক আব্দুল মোমেন বলেন, জনস্বার্থে প্রকল্পটির বাস্তবায়ন দ্রুত এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে কার্যকর উদ্যোগ নিতে হবে। চট্টগ্রামের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা আন্তরিকভাবে উদ্যোগ নিলেই সেতু নির্মাণের কাজ দ্রুত শুরু করা সম্ভব হবে। তিনি আরও বলেন, নতুন সেতু নির্মিত হলে জ্যৈষ্ঠপুরা পাহাড় ও করলডেঙ্গা পাহাড়সংলগ্ন বিস্তীর্ণ এলাকা কৃষিভিত্তিক উৎপাদনের নতুন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। একই সঙ্গে চট্টগ্রাম নগরের সম্প্রসারণ ত্বরান্বিত হবে এবং বোয়ালখালী, পটিয়াসহ দক্ষিণ চট্টগ্রামের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে।
সৌজন্যে: কালবেলা।