শিরোনাম
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৪:৩২, ১১ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৪:৩২, ১১ জুলাই ২০২৬
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন। একের পর এক ট্রেন ছুটে যাচ্ছে আপন গন্তব্যে। প্রতিটি ট্রেন যেন বহন করছে হাজারো মানুষের স্বপ্ন, ব্যস্ততা আর জীবনের গল্প। কিন্তু এই একই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে বছরের পর বছর জমে থাকে কিছু অশ্রুর গল্পও। এমনই এক গল্প তিন বছর ধরে বুকের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল ছোট্ট শিশু সোহাগ।
মাত্র একটি ভুল সিদ্ধান্ত, বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে এসে হারিয়ে যাওয়া, আর তারপর দীর্ঘ তিন বছরের বিচ্ছেদ। সেই বিচ্ছেদ কেড়ে নিয়েছিল একটি শিশুর শৈশব, আর একটি মায়ের মুখের হাসি।
অবশেষে সেই অপেক্ষার অবসান।
বেসরকারি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা লোকাল এডুকেশন অ্যান্ড ইকোনমিক ডেভেলপমেন্ট অর্গানাইজেশন (লিডো)-এর আন্তরিক প্রচেষ্টায় আজ সকালে ময়মনসিংহের জামালপুরে তিন বছর আগে নিখোঁজ হওয়া শিশু সোহাগকে তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। ঢাকা রেলওয়ে থানার সাধারণ ডায়েরির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে লিডোর সমাজকর্মীরা শিশুটিকে নিরাপদে তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দেন।
লিডোর ট্রানজিশনাল শেল্টার "সেতুবন্ধন"এর সমাজকর্মীরা জানান, গত ৯ জুলাই কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে অসহায় অবস্থায় সোহাগকে উদ্ধার করা হয়। পরে ঢাকা রেলওয়ে থানায় সাধারণ ডায়েরি করে তাকে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য শেল্টারে নিয়ে আসা হয়।
শিশুটি জানায়, প্রায় তিন বছর আগে বন্ধুদের সঙ্গে ঢাকায় বেড়াতে এসে সে হারিয়ে যায়। অনেক খোঁজাখুঁজির পর যখন পরিবারের পুরোনো ভাড়া বাসায় ফিরে যায়, তখন সেখানে আর কাউকে খুঁজে পায়নি। ঠিকানা বলতে না পারায় আর পরিবারের সন্ধান না পেয়ে আবার ফিরে আসে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনে। সেখানেই দিনের পর দিন, মাসের পর মাস, বছরের পর বছর কাটিয়েছে একটি আশায়—একদিন হয়তো মা এসে তাকে নিয়ে যাবে।
স্টেশনের কোলাহল, ট্রেনের হুইসেল, অসংখ্য মানুষের ভিড় সবকিছুর মাঝেও সোহাগের চোখ খুঁজেছে শুধু একটি মুখ, তার মায়ের মুখ।
সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে শিশুটির পরিবারের সন্ধান চেয়ে একটি ভিডিও ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নজরে আসে লিডোর সমাজকর্মীদের। তারা দ্রুত শিশুটিকে নিরাপদ আশ্রয়ে নিয়ে যান, তথ্য-উপাত্ত যাচাই করেন এবং দীর্ঘ অনুসন্ধানের পর ময়মনসিংহের জামালপুরে তার পরিবারের সন্ধান পান। এরপর আইনগত সকল প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে আজ তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
তিন বছর পর ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে কান্নায় ভেঙে পড়েন সোহাগের মা ময়না বেগম।
ময়না বেগম বলেন
"আমার ছেলে হারিয়ে যাওয়ার পর আমরা অনেক জায়গায় খুঁজেছি। কোথাও পাইনি। কিন্তু আমি কখনো আশা ছাড়িনি। আমার বিশ্বাস ছিল, একদিন না একদিন আমার ছেলে আমার কাছেই ফিরে আসবে। একজন মায়ের দোয়া আল্লাহ কখনো বিফলে দেন না। আজ আমার সেই বিশ্বাস সত্য হয়েছে। যারা আমার ছেলেকে খুঁজে দিয়েছেন, আল্লাহ তাদের উত্তম প্রতিদান দিন।"
সোহাগকে ফিরে পেয়ে আনন্দে কেঁদেছেন পরিবারের অন্য সদস্যরাও। দীর্ঘ তিন বছরের অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে যেন আবার পূর্ণতা ফিরে পেয়েছে একটি পরিবার।
লিডো জানান, প্রতিটি পথশিশুর পেছনেই লুকিয়ে থাকে এমন অসংখ্য না বলা গল্প। তাই শুধু উদ্ধার নয়, পরিবারের সন্ধান, পুনর্মিলন এবং পুনর্বাসন নিশ্চিত করাই আমাদের মূল লক্ষ্য।
উল্লেখ্য, দীর্ঘদিন ধরে লিডো পথশিশুদের সুরক্ষা, অধিকার প্রতিষ্ঠা ও পুনর্বাসনে কাজ করে আসছে। ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা শিশুদের উদ্ধার, পরিবারে পুনর্মিলন, নিরাপদ আশ্রয়, শিক্ষা, মোবাইল স্কুল, পথশালা এবং বিভিন্ন মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের মাধ্যমে সংস্থাটি অসংখ্য শিশুর জীবনে নতুন আশার আলো জ্বালিয়ে চলেছে।