চট্টগ্রাম: তীব্র জনবল সংকটে ধুঁকছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। স্টেশন মাস্টার থেকে শুরু করে গেটকিপার, পয়েন্টসম্যান ও লোকোমাস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা।
শিরোনাম
প্রকাশ: ১৫:৩৪, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৩৪, ৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬
চট্টগ্রাম: তীব্র জনবল সংকটে ধুঁকছে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল। স্টেশন মাস্টার থেকে শুরু করে গেটকিপার, পয়েন্টসম্যান ও লোকোমাস্টারসহ গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য থাকায় ব্যাহত হচ্ছে ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবা।
জানা গেছে, পূর্বাঞ্চলে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে মোট জনবলের প্রায় অর্ধেকই শূন্য। বিশেষ করে গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান সংকটের কারণে রেলক্রসিং এবং স্টেশন পরিচালনায় বাড়ছে ঝুঁকি।
স্টেশন মাস্টারের অধিকাংশ পদ শূন্য
পূর্বাঞ্চল চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্টের কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, স্টেশন মাস্টার (গ্রেড-১) পদে ২৭টি অনুমোদিত পদের একটিতেও কর্মকর্তা নেই। গ্রেড-২ এর ৬৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র একজন। অর্থাৎ এই গ্রেডে ৬৩টি পদই শূন্য। স্টেশন মাস্টার (গ্রেড-৩) পদে ১৫৬টির মধ্যে কর্মরত ১৩৪ জন, শূন্য ২২টি। গ্রেড-৪ এর ২৪৫টি পদের মধ্যে কর্মরত ৬৬ জন, শূন্য ১৭৯টি।
এছাড়া সহকারী স্টেশন মাস্টারের ৩৬৬টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১৪৭ জন, শূন্য ২১৯টি। কেবিন মাস্টারের ৪০টি পদের মধ্যে কর্মরত ১৭ জন, শূন্য ২৩টি। সবচেয়ে বেশি সংকট গেটকিপার ও পয়েন্টসম্যান পদে। ৪৫০টি গেটকিপার পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ১৯৪ জন, শূন্য ২৬৫টি। আর ৯৮৫টি পয়েন্টসম্যান পদের মধ্যে কর্মরত ৫৫৮ জন, শূন্য রয়েছে ৪২৭টি।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জনবল সংকটের কারণে কর্মরতদের ওপর বাড়তি দায়িত্ব পড়ছে। কোথাও কোথাও প্রয়োজনীয় সংখ্যক কর্মী না থাকায় স্বাভাবিক কার্যক্রমও ব্যাহত হচ্ছে।
বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাচ্ছে ৬ ট্রেন
জনবল সংকট মোকাবিলা, সেবার মানোন্নয়ন ও রাজস্ব আয় বাড়াতে পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। নতুন করে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার তালিকায় রয়েছে: চট্টগ্রাম-নাজিরহাট রুটের নাজিরহাট লোকাল, নরসিংদী কমিউটার, নোয়াখালী এক্সপ্রেস, সমতট এক্সপ্রেস, জয়দেবপুর কমিউটার ও ঝারিয়া লোকাল।
এসব ট্রেন চট্টগ্রাম, ঢাকা, ময়মনসিংহ ও নোয়াখালী রুটে চলাচল করে। বর্তমানে পূর্বাঞ্চলের বিভিন্ন রুটে আটটি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত হচ্ছে। নতুন ছয়টি যুক্ত হলে এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১৪টিতে।
রেলওয়ে কর্মকর্তারা মনে করছেন, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালনা করা হলে আয় ১৫ থেকে ২৫ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। একই সঙ্গে টিকিট ব্যবস্থাপনায় শৃঙ্খলা ফিরবে এবং কালোবাজারিও কমবে বলে আশা করছেন তারা। এ বিষয়ে রেল ভবনে প্রজ্ঞাপন তৈরির কাজ চলছে। প্রজ্ঞাপন জারি হওয়ার পরই নতুন ব্যবস্থাপনায় ট্রেন পরিচালনার সময়সূচি নির্ধারণ করা হবে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় (চট্টগ্রাম) পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও) ফারহান মাহমুদ বলেন, নাজিরহাট লোকালসহ পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। রেল ভবন থেকে প্রজ্ঞাপনের কপি এলে কবে থেকে এগুলো বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলবে, তা জানা যাবে।
জনবল না থাকায় বন্ধ ৫৩ স্টেশন
পূর্বাঞ্চলে জনবল সংকটের কারণে বন্ধ রয়েছে ৫৩টি রেলস্টেশন। এর মধ্যে ৫১টি সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ। স্টেশন মাস্টার ও পয়েন্টসম্যান না থাকায় অনেক স্টেশনের সিগন্যাল রুম ও টিকিট কাউন্টারে তালা ঝুলছে।
রেলস্টেশন বন্ধ থাকায় যাত্রীসেবা ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি রাজস্ব আয়েও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। দীর্ঘদিন পরিত্যক্ত অবস্থায় থাকায় এসব স্টেশনের মূল্যবান সরঞ্জাম ও সম্পদ চুরি হওয়ার ঝুঁকিও রয়েছে।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ঢাকা বিভাগের ৩২টি স্টেশন সম্পূর্ণ এবং দুটি আংশিক বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে চট্টগ্রাম বিভাগের ১৯টি স্টেশন সম্পূর্ণ বন্ধ। চট্টগ্রাম বিভাগের বন্ধ স্টেশনগুলোর মধ্যে রয়েছে-বাড়বকুন্ড, বারৈয়াঢালা, মীরসরাই, মস্তাননগর, মুহুরীগঞ্জ, কালিদহ, শশদী, নাওটি, আলীশহর, ময়নামতি, ঝাউতলা, সরকারহাট, কাঞ্চননগর, ধলঘাট, দৌলতগঞ্জ, খিলা, বজরা, শাহাতলী ও চিতোষী রোড।
বিভাগীয় পরিবহন বিভাগ বলছে, জনবল সংকটের কারণেই এসব স্টেশন চালু করা যাচ্ছে না। প্রয়োজনীয় জনবল চেয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছে। জনবল নিয়োগ হলে পর্যায়ক্রমে বন্ধ স্টেশনগুলো চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে।
লোকোমাস্টার সংকটে ট্রেন চলাচলে বিলম্ব
জনবল সংকটের বড় প্রভাব পড়েছে ট্রেন পরিচালনাতেও। পূর্বাঞ্চলে ১২০ জন লোকোমাস্টারের প্রয়োজন হলেও কর্মরত আছেন মাত্র ৬৫ জন। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় প্রায় অর্ধেক লোকবল দিয়ে ট্রেন পরিচালনা করতে হচ্ছে।
রেলওয়ে সংশ্লিষ্টরা জানান, লোকোমাস্টারদের অতিরিক্ত দায়িত্ব পালনের জন্য আগে মাইলেজসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হতো। এসব সুবিধা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত ডিউটি করতেও অনীহা তৈরি হয়েছে। এর প্রভাব পড়ছে ট্রেনের সময়সূচিতে।
লোকোমাস্টার মো. ওমর ফারুক বলেন, মাইলেজসহ বেশ কিছু সুবিধা বাতিল হওয়ায় লোকোমাস্টাররা অতিরিক্ত ডিউটি করতেও অনীহা প্রকাশ করছেন। আগে জনবল সংকট থাকায় নিয়মিত ডিউটির পরও আমরা অতিরিক্ত কাজ করতাম। এর জন্য কিছু সুযোগ-সুবিধা দেওয়া হতো। এখন সেগুলোও নেই।
তিনি বলেন, রেলওয়ের নিয়ম অনুযায়ী ১০০ মাইল বা আট ঘণ্টা ট্রেন পরিচালনার জন্য রানিং স্টাফরা এক দিনের মূল বেতনের সমপরিমাণ রানিং ভাতা বা মাইলেজ পেতেন। বর্তমানে সেই সুবিধা নেই।
রেলওয়ের কর্মীদের সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা ও ছুটির দিনের দায়িত্ব পালনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন মাইলেজ সুবিধা নিয়েও দীর্ঘদিন ধরে অসন্তোষ রয়েছে বলে জানান কর্মরতরা।
ভূ-সম্পত্তি বিভাগেও তীব্র সংকট
শুধু অপারেশন বিভাগ নয়, জনবল সংকটে রয়েছে রেলওয়ের ভূ-সম্পত্তি বিভাগও। পূর্বাঞ্চলের এ বিভাগে বিভিন্ন পদে প্রায় ১০০টি পদ শূন্য রয়েছে। এর মধ্যে সহকারী ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তার দুটি পদ, লিটিগেশন ইন্সপেক্টরের পাঁচটি পদ, ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী, উপসহকারী প্রকৌশলী ও উপসহকারী প্রকৌশলী (ড্রয়িং)-এর চারটি পদ, সার্কেল অফিসারের সাতটি পদ এবং ফিল্ড কানুনগোর তিনটি পদ শূন্য রয়েছে। উচ্চমান সহকারী, কম্পিউটার অপারেটর ও জুনিয়র ড্রাফটম্যানসহ আরও বিভিন্ন পদেও রয়েছে জনবল সংকট।
রেলওয়ের ২৪ হাজার ৪৪১ একর জমি দেখভালের জন্য অনুমোদিত ১৪৪টি পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন মাত্র ৪৬ জন। শূন্য রয়েছে ৯৮টি পদ। ফলে প্রয়োজনের তুলনায় জনবল সংকট প্রায় ৬৮ শতাংশ।
জনবল সংকটের সুযোগে রেলওয়ের মূল্যবান সম্পত্তি দখলের অভিযোগও রয়েছে। দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বলছেন, পর্যাপ্ত লোকবল না থাকায় নিয়মিত তদারকি ও উচ্ছেদ অভিযান পরিচালনা করাও কঠিন হয়ে পড়ছে।
চট্টগ্রাম ও সদর ভূ-সম্পত্তি বিভাগের দুই কার্যালয়ে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট নিয়োগ দেওয়া হলেও তাদের জন্য পর্যাপ্ত যানবাহন ও চালক না থাকায় দ্রুত অভিযান পরিচালনাতেও সমস্যা হচ্ছে।
রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মোহাম্মদ সুবক্তগীন বলেন, নাজিরহাট লোকালসহ পূর্বাঞ্চলের ছয়টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনার সিদ্ধান্ত হয়েছে। ঢাকা থেকে এখনো চিঠি ইস্যু হয়নি। বিভিন্ন স্টেশন বন্ধ রয়েছে। কিছু স্টেশনে লোকবল নিয়োগ দিয়ে চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতা রয়েছে, সেগুলো কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা করছি।
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বলছেন, দীর্ঘদিনের জনবল সংকট কাটাতে দ্রুত নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা জরুরি। অন্যথায় একদিকে যেমন ট্রেন পরিচালনা ও যাত্রীসেবায় চাপ বাড়বে, অন্যদিকে নিরাপত্তা ও রেলওয়ের সম্পত্তি সুরক্ষাও কঠিন হয়ে পড়বে।