শিরোনাম
হোসাইন রাজিব, পশ্চিমাঞ্চল প্রতিনিধি, রেল নিউজ ২৪
প্রকাশ: ২০:১০, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২০:১১, ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬
স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়ে হট্টগোল, প্রায় ৩ ঘণ্টা বিলম্বে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছাড়ল কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস
রংপুর রেলওয়ে স্টেশনে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের যাত্রীদের বিক্ষোভ ও শাটল ট্রেনের ইঞ্জিন বিকলের ঘটনায় প্রায় তিন থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত ট্রেন চলাচলে বিলম্ব হয়েছে। এ সময় স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়ের সামনে ব্যাপক হট্টগোল সৃষ্টি হয়।
শনিবার (৫ সেপ্টেম্বর) সকাল ১০ টা ৪০ মিনিটে রংপুর রেলওয়ে স্টেশনে এ ঘটনা ঘটে। ওই সময় স্টেশনে দায়িত্ব পালন করছিলেন স্টেশন মাস্টার রায়হানুর রহমান রাজু।
রেলওয়ে সূত্র ও প্রত্যক্ষদর্শীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ঢাকা থেকে ছেড়ে আসা কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস সকাল ৯টা ৪০ মিনিটে রংপুর স্টেশনে প্রবেশ করে। কুড়িগ্রামগামী যাত্রীদের কুড়িগ্রাম পর্যন্ত পৌঁছে দিতে রেলওয়ের ব্যবস্থাপনায় একটি শাটল ট্রেন রাখা হয়েছিল। রেলওয়ের পরিকল্পনা ছিল, কুড়িগ্রাম-রংপুর অংশে শাটল ট্রেনের মাধ্যমে যাত্রী পরিবহন করে মূল কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসকে দ্রুত ঢাকার উদ্দেশ্যে ফিরিয়ে দেওয়া।
রেলওয়ের ভাষায় এ ধরনের ব্যবস্থাকে ট্রান্সশিপমেন্ট বলা হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের বিলম্ব কমিয়ে ট্রেনটির রেক দ্রুত ঢাকার উদ্দেশ্যে পাঠানো।
এদিকে কুড়িগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা শাটল ট্রেনটি সকাল ৮টা ৫০ মিনিটে রংপুর স্টেশনে পৌঁছায়। ঢাকা থেকে আসা কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের যাত্রীদের শাটল ট্রেনে ওঠানোও হয়। কিন্তু রংপুরে আসার পর শাটল ট্রেনটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এতে ট্রেনটি প্রায় এক ঘণ্টা স্টেশনে আটকে থাকে।
ইঞ্জিন বিকলের কারণে শাটল ট্রেনের যাত্রীরা রংপুরেই আটকা পড়েন। এ অবস্থায় ঢাকার উদ্দেশ্যে ফেরত যাওয়ার জন্য কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস প্রস্তুত হলে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
বিক্ষুব্ধ যাত্রীরা স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়ে গিয়ে দাবি করেন, শাটল ট্রেনের পরিবর্তে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসকেই কুড়িগ্রাম পর্যন্ত নিয়ে যেতে হবে। তাঁদের অভিযোগ, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে টিকিট কেটে যাত্রা করলেও শাটল ট্রেনে এসি কোচ না থাকায় তাঁদের নন-এসি পরিবহনে কুড়িগ্রাম-রংপুর অংশে ভ্রমণ করতে হচ্ছে।
একপর্যায়ে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস ঢাকার উদ্দেশ্যে রংপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হলে শাটল ট্রেনে আসা যাত্রীরা বাধা দেন। তাঁরা দাবি করেন, তাঁরা শাটল ট্রেনে রংপুরে এসে আবার কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসে করে ঢাকায় ফিরে যেতে চান। ফলে দুই ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে উত্তেজনাকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
একপর্যায়ে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসের যাত্রীরাও ট্রেন থেকে নেমে স্টেশন মাস্টারের কার্যালয়ের সামনে অবস্থান নেন। এতে দুই ট্রেনের যাত্রীদের ভিড়ে স্টেশন মাস্টারের কার্যালয় এলাকায় ব্যাপক হট্টগোল সৃষ্টি হয়।
পরিস্থিতির মধ্যে সকাল ১০টা ৫০ মিনিটে পঞ্চগড় থেকে ছেড়ে আসা দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসও রংপুর স্টেশনে প্রবেশ করে। ফলে স্টেশনের লাইন ব্যবস্থাপনায়ও চাপ তৈরি হয় এবং ট্রেনগুলোর বিলম্ব আরও বাড়তে থাকে।
এর আগে থেকেই ট্রেনগুলো প্রায় তিন ঘণ্টা বিলম্বে চলাচল করছিল। তার ওপর শাটল ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়া এবং স্টেশনে যাত্রী বিক্ষোভের কারণে পরিস্থিতি জটিল হয়ে পড়ে।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রেলওয়ের পক্ষ থেকে লালমনিরহাট থেকে একটি ইঞ্জিন আনার ব্যবস্থা করা হয়। তবে রংপুর স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম ও লাইনগুলো ব্যস্ত থাকায় ওই ইঞ্জিনকে দ্রুত প্রয়োজনীয় স্থানে নেওয়া সম্ভব হচ্ছিল না। এতে সংকট আরও দীর্ঘায়িত হয়।
পরে ট্রেনের যাত্রী এবং স্টেশন মাস্টারসহ সংশ্লিষ্টরা রংপুর স্টেশনে আলোচনায় বসেন। যাত্রীরা এ সময় ঊর্ধ্বতন রেল কর্মকর্তাদের সঙ্গে সরাসরি কথা বলে সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান।
পরে রেলওয়ের সরকারি টেলিফোনের মাধ্যমে যাত্রীদের সঙ্গে লালমনিরহাট বিভাগের ডিআরএম জনাব তসলিম আহম্মেদ খান এর সাথে কথা বলিয়ে দেওয়া হয়। যাত্রীদের বক্তব্য শোনার পর ডিআরএম তাঁদের আশ্বস্ত করেন, ভবিষ্যতে শাটল ট্রেনের পরিবর্তে যাত্রীদের সুবিধা বিবেচনায় ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং ট্রেনের বিলম্ব কমানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। পাশাপাশি ভালো ইঞ্জিন ব্যবহারের বিষয়েও আশ্বাস দেওয়া হয়।
ডিআরএমের আশ্বাসের পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হয়। এরপর স্টেশন মাস্টার রায়হান তত্ত্বাবধানে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেসকে সকাল ১১টা ৫০ মিনিটে ঢাকার উদ্দেশ্যে রংপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
এ বিষয়ে রংপুর রেলওয়ে স্টেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত স্টেশন মাস্টার রায়হানুর রহমান রাজু বলেন, শাটল ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হওয়ায় এবং একই সময়ে একাধিক ট্রেন স্টেশনে থাকায় যাত্রীদের মধ্যে কিছুটা উত্তেজনা তৈরি হয়েছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তিনি যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের শান্ত থাকার আহ্বান জানান এবং সমস্যাটি সমাধানে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের ব্যবস্থা করেন।
তিনি আরও বলেন, "স্টেশনে একই সময়ে একাধিক ট্রেনের চলাচল এবং লাইনের সংকট থাকায় কিছুটা জটিল পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল। তারপরও যাত্রীদের সঙ্গে সমন্বয় করে এবং রেলওয়ের কন্ট্রোল ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী পর্যায়ক্রমে ট্রেনগুলো ছাড়ার ব্যবস্থা করা হয়েছে। শেষ পর্যন্ত কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস, শাটল ট্রেন এবং দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসকে স্টেশন থেকে ছাড়তে সক্ষম হয়েছি।"
অন্যদিকে কুড়িগ্রাম থেকে আসা শাটল ট্রেনটি দুপুর ১২টা ৩০ মিনিটের দিকে রংপুর থেকে কুড়িগ্রাম স্টেশনের উদ্দেশ্যে ছেড়ে যায়। এরপর দোলনচাঁপা এক্সপ্রেসও রংপুর স্টেশন থেকে ছেড়ে দেওয়া হয়।
বিক্ষুব্ধ যাত্রীদের অভিযোগ, কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস যতই বিলম্বিত হোক, সেটি কুড়িগ্রাম পর্যন্ত চালানো উচিত। তাঁদের মতে, শাটল ট্রেনে এসি কোচ না থাকায় এসি টিকিটধারী যাত্রীদেরও নন-এসি পরিবহনে যাতায়াত করতে হচ্ছে। তাই শাটল ট্রেনের পরিবর্তে মূল আন্তঃনগর ট্রেনই কুড়িগ্রাম পর্যন্ত চালানোর দাবি জানান তাঁরা।
রেলওয়ের পক্ষ থেকে অবশ্য ট্রেনের বিলম্ব কমানো এবং যাত্রীদের ভোগান্তি কমাতেই ট্রান্সশিপমেন্টের মাধ্যমে শাটল ট্রেন পরিচালনার ব্যবস্থা করা হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে শাটল ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে যাওয়ায় সেই ব্যবস্থাই শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের যাত্রী ভোগান্তি ও ট্রেন বিলম্বের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
ঘটনার পর ডিআরএমের আশ্বাসে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এলেও যাত্রীদের প্রশ্ন-ট্রেনের বিলম্ব কমাতে নেওয়া বিকল্প ব্যবস্থা যদি উল্টো যাত্রী ভোগান্তি বাড়িয়ে দেয়, তাহলে ভবিষ্যতে কুড়িগ্রাম এক্সপ্রেস পরিচালনায় কী ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে?
এ ঘটনায় রংপুর স্টেশনে কয়েক ঘণ্টা ধরে তিনটি ট্রেনের যাত্রীদের মধ্যে চরম ভোগান্তি ও উত্তেজনা সৃষ্টি হয়।