শিরোনাম
রেল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০৯:২৭, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৯:২৮, ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
দেশের দুই প্রান্তের ভৌগোলিক সীমানাকে এক সুতায় গেঁথে এবার পাহাড় থেকে বঙ্গোপসাগর পর্যন্ত পাড়ি দেবে রেলের চাকা। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বিশেষ অগ্রাধিকার প্রকল্পে-দেশের সর্ব উত্তরের জেলা হিমালয়ঘেঁষা পঞ্চগড় থেকে দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সমুদ্র শহর কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ব্রডগেজ/ডুয়েলগেজ লাইনে ট্রেন চলবে। এ পথের দূরত্ব ১০৭৭ কিলোমিটার। পাঁচটি প্রকল্পের সমন্বয়ে দেশের সবচেয়ে দূরত্বের এ পথে নতুন করে সরাসরি ২০টি আন্তঃনগর ট্রেনসহ প্রায় আড়াইশ ট্রেন পরিচালনা করা যাবে। বর্তমান সরকারের মেয়াদের মধ্যেই প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন সমাপ্ত করে ট্রেন চালানো নিশ্চিত করা হবে।
এ প্রসঙ্গে রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, পঞ্চগড়সহ পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের সাধারণ মানুষ ট্রেনে চড়ে সরাসরি কক্সবাজার যেতে পারবে। সাড়ে চার বছরের মধ্যেই এ পথের ৫টি প্রকল্প সমাপ্ত করে ট্রেন চালানো হবে। এজন্য যথাযথ ইঞ্জিন ও কোচ সংগ্রহ করা হচ্ছে। প্রায় আড়াইশ ট্রেন পরিচালনা সম্ভব হবে। আয় বাড়বে লাফিয়ে।
রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম যুগান্তরকে বলেন, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি ট্রেন চলবে। প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের অনুশাসন অনুযায়ী এর বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা হবে বর্তমান সরকারের মেয়াদেই। এটি হবে রেল যোগাযোগের ইতিহাসে এক অভূতপূর্ব ও বৈপ্লবিক মেলবন্ধন। আমাদের লক্ষ্য খুব স্পষ্ট-আধুনিক ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের মাধ্যমে পশ্চিম-উত্তরের প্রান্তিক জনপদ থেকে শুরু করে দক্ষিণের সমুদ্রতট পর্যন্ত ট্রেনের গতি ও যাত্রীসেবাকে এমন এক স্তরে নিয়ে যাওয়া, যা আগে কেউ কল্পনাও করেনি। এ রুটটি চালু হলে এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ট্রেন ছুটবে, যা দেশের পর্যটন আর অর্থনীতিতে এক নতুন রূপান্তর ঘটাবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে পরিকল্পনা দপ্তর সূত্র জানায়, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত ১০৭৭ কিলোমিটার রেলপথ ব্রডগেজ/ডুলেয়গেজ করা হচ্ছে। এরই অংশ হিসাবে রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের টঙ্গী থেকে আখাউড়া, লাকসাম থেকে চট্টগ্রাম, চট্টগ্রাম থেকে দোহাজারী এবং পশ্চিমাঞ্চলের শান্তাহার থেকে বগুড়া পর্যন্ত রেলপথকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে ব্রডগেজ ও ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণ করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন করে ব্রডগেজ/ডুয়েলগেজ লাইন নির্মাণকাজ দ্রুততার সঙ্গে চলছে। এ পাঁচটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হবে। দীর্ঘ এ রেল রুটটিকে গতিশীল করতে ইতোমধ্যে প্রশাসনিক তৎপরতা তুঙ্গে। খোদ প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার থাকায় এই করিডরের আধুনিকায়নে কোনোরকম আপস করতে রাজি নয় প্রশাসন। রেলওয়ে অপারেশন ও পরিবহণ দপ্তর সূত্র বলছে, এ রুটটি শুধু যাত্রীদের সেবাই বাড়াবে না, বরং পাহাড় আর সাগরের দূরত্ব ঘুচিয়ে দেশের অর্থনীতিতে এক নতুন জোয়ার আনবে। চলমান আয়ের অর্ধেকের বেশি আয় হবে এ রুট চালুর মাধ্যমে।
রেলওয়ের প্রধান পরিকল্পনা কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ১৫-২০ বছরের মধ্যে হয়তো মিটারগেজ ট্রেন চলাচলই বন্ধ হয়ে যাবে। সব রুটেই ব্রডগেজ ট্রেন চালানো সম্ভব হবে। বিশ্বে মিটারগেজ কোচ, ইঞ্জিন ও রোলিং সামগ্রী নির্মাণ একেবারেই কমে আসছে।
আধুনিক এ সময়ে সারা বিশ্বেই ব্রডগেজ ট্রেন চলাচল করছে। আশা করছি, ৫-৭ বছরের মধ্যেই পুরো রেলপথ ব্রডগেজ/ডুয়েলগেজে রূপান্তর হবে। বর্তমান প্রধানমন্ত্রীর অনুশাসন অনুযায়ী আমরা দ্রুততার সঙ্গে উল্লিখিত ৫টি প্রকল্প বাস্তবায়নে সম্মিলিতভাবে কাজ করছি। রেলকে লাভবান করাসহ যাত্রীসেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ প্রকল্প হবে আশীর্বাদ। সারা দেশ থেকেই কক্সবাজারে ভ্রমণ করবেন সাধারণ যাত্রীরা। বিদেশি পর্যটকরা দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে রেলে ভ্রমণ করবেন।
মো. রফিকুল ইসলাম আরও বলেন, দেশের পর্যটন ও অর্থনৈতিক সংযোগকে অন্য উচ্চতায় নিয়ে যেতে এই প্রকল্প যে প্রধানমন্ত্রীর অত্যন্ত পছন্দের একটি উদ্যোগ, তা স্পষ্ট করে দিচ্ছে রেলের অন্দরে চলা সাম্প্রতিক কর্মযজ্ঞ। প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকায় চট্টগ্রাম-দোহাজারী ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণকাজ দ্রুততার সঙ্গে চলছে। ১২ হাজার কোটি টাকায় সিরাজগঞ্জ-বগুড়া রেলপথ নির্মাণকাজও একই ধারায় এগিয়ে যাচ্ছে। ১৫ হাজার কোটি টাকা লাকসাম-চট্টগ্রাম, ১৪ হাজার কোটি টাকা আখাউড়া-টঙ্গী এবং ৭ হাজার কোটি টাকা শান্তাহার-বগুড়া রেলপথের উন্নয়ন ব্যয় ধরা হয়েছে। তিনি বলেন, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে চলমান মালবাহী তথা কনটেইনার ট্রেন চলাচল বাড়বে ১০ গুণ। রেলের দুটি অঞ্চল (পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চল) মিলে একাকার হবে। যাত্রী, মালামাল ও কনটেইনারবাহী ট্রেন সরাসরি চলবে দুই অঞ্চল ধরে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, পঞ্চগড় থেকে কক্সবাজার পর্যন্ত সরাসরি রেল নেটওয়ার্ক নিরবচ্ছিন্ন যাতায়াত নিশ্চিত করতে চলতি বছরের ১৭ জুন সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে রেলওয়ের ভবিষ্যৎ উন্নয়নবিষয়ক বিশেষ সভা অনুষ্ঠিত হয়। এ রুট নিশ্চিতকরণের মধ্য দিয়ে ট্রান্স-এশিয়ান রেলওয়ে নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংযোগ স্থাপন এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যের পরিধি বাড়বে। সংশ্লিষ্টরা আরও জানান, এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে পর্যটকরা খুব সহজেই পাহাড় ও সমুদ্রের সৌন্দর্য একই যাত্রায় উপভোগ করতে পারবেন, যা পর্যটন খাতে রাজস্ব আয় বহুলাংশে বাড়িয়ে দেবে। তাছাড়া দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে উৎপাদিত কৃষিপণ্য এবং দক্ষিণাঞ্চল থেকে উৎপাদিত লবণ ও শুঁটকি সরাসরি সারা দেশে সস্তায় ও দ্রুততম সময়ে পরিবহণ করা যাবে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (রোলিংস্টক) ফকির মো. মহিউদ্দিন বলেন, এ প্রকল্পটি রেলের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এ প্রকল্প বাস্তবায়নের মধ্য দিয়ে রেলের দুটি অঞ্চল এক হয়ে যাচ্ছে। দুই প্রান্তে সরাসরি ট্রেন পরিচালনার জন্য ইঞ্জিন-কোচসহ প্রয়োজনীয় রোলিংস্টক সামগ্রীও ক্রয় করা হচ্ছে।
রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) মো. নাজমুল ইসলাম বলেন, পুরো রেলপথ একই ধারায় উন্নতি হচ্ছে। এতে ট্রেনের সংখ্যা বাড়বে। যাত্রী সেবা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার সঙ্গে আয়ও বাড়বে।
রেলওয়ের মহাপরিচালক প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন বলেন, এটি সময়ের দাবি। এ প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রধানমন্ত্রীর সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার থাকায় আমাদের ওপর দায়িত্বও অনেক। পঞ্চগড় থেকে ঢাকা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত পুরো রুটে নিরবচ্ছিন্ন ও উচ্চগতির ট্রেন পরিচালনার জন্য আমরা দ্রুততার সঙ্গে কাজ করছি। নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যেই এই ঐতিহাসিক প্রকল্প বাস্তবায়ন করে দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে দারুণ গতিতে ট্রেন চালানো সম্ভব হবে।