ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

বগুড়া-সিরাজগঞ্জ রেলপথ

পাঁচ বছরের প্রকল্প ১৩ বছরে খরচ বেড়ে হচ্ছে দ্বিগুণ

রেল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ০৯:১০, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৯:১০, ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬

পাঁচ বছরের প্রকল্প ১৩ বছরে খরচ বেড়ে হচ্ছে দ্বিগুণ

নকশায় ত্রুটি, বাস্তবায়নে ধীরগতি এবং অর্থায়নের জটিলতায় পড়ে দীর্ঘমেয়াদি আর্থিক খেসারতের মুখে পড়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ের ‘বগুড়া হতে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ’ প্রকল্প। ২০১৮ সালে শুরু হওয়া পাঁচ বছর মেয়াদি এই প্রকল্পটি নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করা তো দূরের কথা, আট বছর পর এসে দেখা যাচ্ছে কাজের তিন-চতুর্থাংশই বাকি। অথচ এই দীর্ঘ বিলম্বের অজুহাতে এবার মূল ব্যয়ের তুলনায় এক লাফে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকা বা প্রায় ৯০ শতাংশ ব্যয় বাড়ানো হচ্ছে।

ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদও আড়াই গুণের বেশি বাড়িয়ে ২০৩০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের জন্য শুরু হওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের সময় লেগে যাচ্ছে সাড়ে ১২ বছর। একই সঙ্গে প্রকল্পের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়ায় যাতায়াতের সুবিধার্থে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রস্তাবিত প্রকল্পটি ২০১৮ সালে অনুমোদন দেওয়া হয়। বাংলাদেশ রেলওয়ে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। ভারতের তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি-৩) আওতায় প্রকল্প বাস্তবায়নে ব্যয় ধরা হয়েছিল ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকা। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ধরা হয় ২০১৮ সালের জুলাই থেকে ২০২৩ সালের জুন পর্যন্ত। সেই হিসাবে ২০২৩ সালের জুনে প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা ছিল।

প্রকল্পটির প্রশাসনিক ও ভৌত অগ্রগতির নথিপত্র পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বাস্তবায়নের গতি ছিল চরম মন্থর। নির্ধারিত সময়সীমায় কাজ শেষ হয়নি। পরে প্রথম দফায় এক বছর এবং দ্বিতীয় দফায় আরও দুই বছর বাড়িয়ে ২০২৬ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত মেয়াদ বাড়ানো হয়। পরবর্তী সময়ে বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় কিছুটা বাড়িয়ে সময়সীমা ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত বহাল রাখা হলেও মাঠপর্যায়ের কাজের চিত্র বদলায়নি।

প্রকল্প নথির তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬ সালের জুলাই মাস পর্যন্ত প্রকল্পের আওতায় খরচ হয়েছে ২ হাজার ২৭৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা। সেই হিসাবে প্রকল্পটির আর্থিক অগ্রগতি দাঁড়িয়েছে ৩৮ দশমিক ৫৩ শতাংশ। বাস্তব বা ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ২৭ দশমিক ৭২ শতাংশ। অর্থাৎ আট বছরে কাজ হয়েছে প্রকল্পের এক তৃতীয়াংশের কম। সেই হিসাবে তিন ভাগের দুই ভাগ বেশি কাজ এখনো বাকি রয়েছে।

বারবার মেয়াদ বাড়িয়েও শেষ করতে না পারায় অবশেষে বর্ধিত মেয়াদ শেষে প্রকল্পটি সংশোধন করা হচ্ছে। এরই মধ্যে প্রস্তাবিত সংশোধনী প্রস্তাব যাচাই-বাছাই শেষ করে অনুমোদনের জন্য সুপারিশ করেছে পরিকল্পনা কমিশন। পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, আগামী সপ্তাহে অনুষ্ঠিতব্য একনেক সভায় প্রকল্পটির সংশোধিত প্রস্তাবটি উপস্থাপন করা হবে। একনেকে অনুমোদন পেলে দীর্ঘদিনের জট কাটিয়ে প্রকল্পটির কার্যক্রম আবার শুরু হবে।

সংশোধনী প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, ৫ হাজার ৫৭৯ কোটি টাকার প্রকল্পটি বাড়িয়ে ১০ হাজার ৫৭০ কোটি টাকা করার প্রস্তাব করা হয়েছে। এর আগে বিশেষ সংশোধনীর মাধ্যমে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ৫ হাজার ৯০২ কোটি টাকা। সেই হিসাবে অনুমোদিত বিশেষ সংশোধিত ব্যয় থেকে বাড়ছে ৪ হাজার ৬৬৭ কোটি টাকা, আর মূল অনুমোদিত ব্যয়ের চেয়ে বাড়ানো হচ্ছে ৪ হাজার ৯৯০ কোটি টাকা। যদিও সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় আরও দুই হাজার কোটি টাকা বেশি চাওয়া হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন যাচাই-বাছাই করে প্রায় দুই হাজার কোটি টাকা ব্যয় কমিয়েছে।

ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধির কারণ হিসেবে বলা হয়েছে, সম্ভাব্যতা যাচাই ও বিস্তারিত নকশা হালনাগাদ করার পর প্রকল্পের কাজের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়ানো হয়েছে। নতুন করে ঢাকা-রংপুর হাইওয়ের ওপর ১৭৮ দশমিক ৩ মিটার রেল ওভারপাস এবং বগুড়া-নাটোর হাইওয়ের ওপর ১ হাজার ৩৩৫ দশমিক ৭ মিটার রোড ওভারপাস অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এ ছাড়া সেতু-কালভার্টের সংখ্যা বৃদ্ধি, আটটি নতুন স্টেশন নির্মাণ, তিনটি স্টেশন পুনর্নির্মাণ ও আধুনিকায়ন, জমি অধিগ্রহণের হার বৃদ্ধি এবং ইউটিলিটি স্থানান্তর ও পুনর্বাসন ব্যয় নতুন করে যুক্ত করতে হয়েছে।

এ ছাড়া, ২০১৮ সালের ২৫ মার্চ মূল ডিপিপি তৈরির সময় প্রতি মার্কিন ডলার রেট ধরা হয়েছিল ৮২ দশমিক ৯৬ টাকা। কিন্তু ২০২৬ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারি ডিপিপি সংশোধনের সময় তা বেড়ে দাঁড়ায় ১২২ দশমিক ৩৩ টাকায়। টাকার মান কমে যাওয়ায় পরামর্শক ফি, ভৌত কেনাকাটা ও ঠিকাদারি কাজ বাস্তবায়নে বাড়তি খরচ যুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া নির্মাণকালীন মূল্যস্ফীতি বিবেচনা করে তিন বছরের জন্য ৯ শতাংশ প্রাইস অ্যাডজাস্টমেন্ট এবং ৩ শতাংশ ফিজিক্যাল কন্টিনজেন্সি যুক্ত হওয়ায় মূল অনুমোদিত ব্যয় থেকে সংশোধত প্রস্তাবে ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে।

প্রকল্প প্রস্তাবনা পর্যালোচনায় জানা গেছে, প্রস্তাবিত প্রথম সংশোধিত প্রস্তাবে ব্যয় ধরা হয়েছিল ১২ হাজার ৫২৪ কোটি টাকা। প্রকল্পটির ওপর চলতি বছরের ১২ জুলাই পিইসি সভা হয়। সভায় বিভিন্ন খাতে ব্যয় কমিয়ে প্রস্তাবিত সংশোধিত প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। ব্যয় বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রকল্পের মেয়াদও আড়াই গুণের বেশি বাড়িয়ে ২০৩০ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। ফলে ২০১৮ সালে পাঁচ বছরের জন্য শুরু হওয়া প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করতে সরকারের সময় লেগে যাচ্ছে সাড়ে ১২ বছর।

একনেকে অনুমোদনের সুপারিশে পরিকল্পনা কমিশন বলছে, প্রকল্পটির ওপর গত ১২ জুলাইয়ের পিইসি সভায় কিছু সিদ্ধান্ত প্রতিপালন সাপেক্ষে প্রকল্পটি অনুমোদনের সুপারিশ করা হয়েছে। যেহেতু কোনো প্রকল্পের ব্যয় ২৫ শতাংশের বেশি অথবা ৫০ কোটি টাকার বেশি বৃদ্ধি পেলে তা একনেক সভার অনুমোদন নেওয়ার বিধান রয়েছে, তাই একনেক সভায় বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করা হবে।

প্রকল্পের নাম পরিবর্তন: শুধু প্রকল্পের ব্যয় ও মেয়াদ বৃদ্ধি নয়, সংশোধনী প্রস্তাবে প্রকল্পের নামও পরিবর্তন করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটি যখন নেওয়া হয় তখন নাম ছিল ‘বগুড়া হতে শহীদ এম মনসুর আলী স্টেশন পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলওয়ে লাইন নির্মাণ’। পরে ২০২৫ সালে প্রকল্পের নাম পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত হয়। সেই সিদ্ধান্ত অনুযায়ী সংশোধনী প্রস্তাবে প্রকল্পের নাম পরিবর্তন করে ‘বগুড়া হতে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত নতুন ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ (প্রস্তাবিত ১ম সংশোধিত)’ নামকরণ করা হয়েছে।

বাদ ভারতীয় ঋণ, নতুন অর্থায়নকারী এআইআইবি: প্রস্তাবনা সূত্রে জানা গেছে, প্রকল্পটির পরিকল্পনায় বড় ধরনের ধাক্কা আসে বৈশ্বিক অর্থায়নের উৎসে পরিবর্তন ঘটায়। মূল ডিপিপিতে ভারতের তৃতীয় লাইন অব ক্রেডিটের (এলওসি-৩) আওতায় ৩ হাজার ১৪৬ কোটি টাকা ঋণ দেওয়ার কথা ছিল। ওই অর্থায়নে প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বিস্তারিত নকশা তৈরি এবং দরপত্রের খসড়া নথি প্রস্তুতের পাশাপাশি বগুড়া ও সিরাজগঞ্জ জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে কিছু জমি অধিগ্রহণের অর্থও বিতরণ করা হয়।

কিন্তু ২০২৫ সালের ৫ মার্চ অনুষ্ঠিত এলওসি পর্যালোচনা সভার ২৩তম বৈঠকে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ প্রকল্পটিকে এলওসি-৩ এর অর্থায়ন কাঠামো থেকে বাদ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এতে ঋণ অনিশ্চয়তায় দেখা দেয়। পরে এশিয়ান ইনফ্রাস্ট্রাকচার ইনভেস্টমেন্ট ব্যাংক (এআইআইবি) প্রকল্পটিতে বিনিয়োগের আগ্রহ দেখায়। নতুন প্রস্তাবে ভারতীয় ঋণের পরিবর্তে এআইআইবি থেকে প্রকল্প ঋণ ধরা হয়েছে ৭ হাজার ৪৮৪ কোটি টাকা, যা মূল ডিপিপির ঋণ সংস্থানের চেয়ে ৪ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা।

সংশোধনী প্রস্তাবের বাস্তবায়নকারী সংস্থা বাংলাদেশ রেলওয়ে জানিয়েছে, বিদ্যমান রেল যোগাযোগ ব্যবস্থায় সিরাজগঞ্জ থেকে বগুড়া পর্যন্ত ১৯০ কিলোমিটার রেলপথ অতিক্রম করতে হয়, প্রকল্পটি বাস্তবায়িত হলে বগুড়া থেকে সিরাজগঞ্জ পর্যন্ত ৭৬ কিলোমিটার রেলপথ নির্মিত হবে; এর ফলে ১১৪ কিলোমিটার দূরত্ব হ্রাস পাবে এবং ভ্রমণ সময় প্রায় তিন ঘণ্টা সাশ্রয় হবে। রাজধানী ঢাকার সঙ্গে উত্তরাঞ্চলের মধ্যে দ্রুততম সময়ে নিরাপদ ও সাশ্রয়ী রেল যোগাযোগব্যবস্থা স্থাপন করা সম্ভব হবে। সড়কপথে চলাচলকারী যাত্রী ও পণ্য পরিবহনের একটি বড় অংশ রেলপথের মাধ্যমে পরিবহন করা সম্ভব হবে। এতে উত্তরাঞ্চলের অর্থনীতিতে ব্যাপক গতি সঞ্চার হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন