ঢাকা, সোমবার, ৩১ আগস্ট ২০২৬

১৬ ভাদ্র ১৪৩৩

দুই মেট্রোরেল প্রকল্পে ব্যয় কমানোর নির্দেশ

প্রকাশ: ১২:১১, ৩১ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১২:১২, ৩১ আগস্ট ২০২৬

দুই মেট্রোরেল প্রকল্পে ব্যয় কমানোর নির্দেশ

ঢাকার দুটি মেট্রোরেল প্রকল্পের ব্যয় কমানোর নির্দেশ দিয়ে ফেরত পাঠিয়েছে পরিকল্পনা কমিশন। একই সঙ্গে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্প থেকে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা এবং এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প থেকে ৮০০ কোটি টাকা কমানোর প্রাথমিক সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রকল্প দুটির ব্যয় আরও যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনতে নতুন একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে বিভিন্ন খাত পর্যালোচনা করে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় কমানোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

গতকাল রোববার দুই মেট্রোরেলের সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর প্রকল্প মূল্যায়ন কমিটির (পিইসি) সভা হয়। ওই সভায় প্রকল্প দুটি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শেষে বিপুল ব্যয় বৃদ্ধির সংশোধিত প্রকল্প প্রস্তাব দুটির ব্যয় কমানোর জন্য ফেরত দেওয়া হয়। নতুন কমিটির পর্যালোচনার পর প্রকল্প দুটির চূড়ান্ত ব্যয় কত দাঁড়াবে, তা নির্ধারণ হবে। মেট্রোরেলের প্রয়োজনীয়তা স্বীকার করলেও এমন বড় ধরনের ব্যয় বৃদ্ধিকে যৌক্তিক পর্যায়ে নামিয়ে আনার বিষয়টিকেই গুরুত্ব দিচ্ছে পরিকল্পনা কমিশন।

ঢাকার গণপরিবহন ব্যবস্থার উন্নয়ন ও যানজট কমাতে ২০১৯ সালে এমআরটি লাইন-১ ও এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর) প্রকল্প নেওয়া হয়। দুটি প্রকল্পের শুরুতে মোট ব্যয় ধরা হয়েছিল ৯৩ হাজার ৮০০ কোটি টাকা। কিন্তু বিস্তারিত নকশা, নির্মাণসামগ্রীর দাম বৃদ্ধি, টাকার অবমূল্যায়ন, বাস্তবায়নে বিলম্বসহ নানা কারণ দেখিয়ে এখন মোট ২ লাখ ১৩ হাজার ৯৮৫ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ মূল প্রাক্কলনের তুলনায় ব্যয় বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকার বেশি। বিষয়টি নিয়ে পরিকল্পনা কমিশনে পর্যালোচনা শুরু হয়।

এর মধ্যে এমআরটি লাইন-১ প্রকল্পের মূল ব্যয় ছিল ৫২ হাজার ৫৬১ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা বাড়িয়ে ১ লাখ ২০ হাজার ৭৯৪ কোটি টাকা করার আবেদন করা হয়। অর্থাৎ এক প্রকল্পেই প্রায় ৬৮ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সভায় এ ব্যয় থেকে প্রাথমিকভাবে প্রায় ৪ হাজার কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

কমলাপুর থেকে বিমানবন্দর পর্যন্ত পাতালপথে মেট্রোরেল নির্মাণ হচ্ছে এমআরটি লাইন ১-এর আওতায়। এর নর্দ্দা থেকে পূর্বাচল অংশে থাকবে উড়ালপথ। সব মিলিয়ে প্রকল্পটির দৈর্ঘ্য ৩১ দশমিক ২৪১ কিলোমিটার। এতে ২১টি স্টেশন নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। ২০১৯ সালে অনুমোদনের সময় প্রকল্পটি ২০২৬ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। কিন্তু ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত সাত বছরে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৭ দশমিক ৩০ শতাংশ। অর্থ ব্যয় হয়েছে ৩ হাজার ৯০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা, যা মোট প্রকল্প ব্যয়ের ৩ দশমিক ২৪ শতাংশ।

অন্যদিকে সাভার থেকে গাবতলী, মিরপুর, গুলশান হয়ে ভাটারা পর্যন্ত নির্মাণ করা হবে এমআরটি লাইন-৫ (উত্তর)। প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ এই প্রকল্পে উড়াল ও পাতালপথের সমন্বয় থাকবে এবং স্টেশন হবে ১৪টি। প্রকল্পটির মূল ব্যয় ছিল ৪১ হাজার ২৩৯ কোটি টাকা। সংশোধিত প্রস্তাবে তা প্রায় ৯৩ হাজার ১৯১ কোটি টাকা করার আবেদন করা হয়েছে। এতে মূল ব্যয়ের তুলনায় প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে। সভায় এই প্রকল্প থেকেও প্রাথমিকভাবে ৮০০ কোটি টাকা কমানোর সিদ্ধান্ত হয়েছে।

ব্যয় বাড়ানোর পেছনে বিস্তারিত নকশায় পরিবর্তন, নির্মাণসামগ্রীর মূল্যবৃদ্ধি, ডলারের বিপরীতে টাকার দরপতন, কর-ভ্যাট, ভূমি অধিগ্রহণ, সেবা সংস্থার লাইন স্থানান্তর, পরামর্শক ব্যয়, নির্মাণকালীন সুদসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে। ২০১৯ সালে ডলারের দাম প্রায় ৮৪ টাকা ৫০ পয়সা ধরা হলেও পরে তা অনেক বেড়েছে। ফলে বিদেশ থেকে আমদানি করা যন্ত্রপাতি ও অন্যান্য সামগ্রীর ব্যয় বেড়েছে বলে প্রকল্পসংশ্লিষ্টরা দাবি করছেন। তবে শুধু এসব কারণ দেখিয়ে ব্যয় এতটা বাড়ানো কতটা যৌক্তিক, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে পরিকল্পনা কমিশন। বিশেষ করে প্রকল্প বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা এবং ব্যয়ের বিভিন্ন খাতে অস্বাভাবিক বৃদ্ধির বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে। মেট্রোরেল প্রকল্পে ঠিকাদার নিয়োগে প্রতিযোগিতা কম থাকার বিষয়টিও আলোচনায় এসেছে।

সড়ক পরিবহন মন্ত্রণালয়ের সূত্রের দাবি, জাইকার বিভিন্ন শর্তের কারণে দরপত্রে মূলত জাপানি প্রতিষ্ঠান বা তাদের যৌথ উদ্যোগের প্রতিষ্ঠানগুলো অংশ নেওয়ার সুযোগ পেয়েছে। এতে প্রতিযোগিতা কমেছে এবং ঠিকাদারদের দর কমানোর সুযোগও সীমিত হয়েছে।

এদিকে ব্যয় কমানোর বিষয়ে পরামর্শ দিতে গত ২৪ মে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের সাবেক অধ্যাপক শামীম জেড বসুনিয়ার নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি কারিগরি কমিটি গঠন করা হয়েছিল। গত জুলাইয়ে কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়। তবে কমিটি মূল প্রকল্প প্রস্তাবের তুলনায় দ্বিগুণের বেশি ব্যয়কেও যৌক্তিক বলে মত দিয়েছিল। এরপরই ডিএমটিসিএল সংশোধিত ব্যয়ের প্রস্তাব পরিকল্পনা কমিশনে পাঠায়।

প্রকল্প দুটির ব্যয় আরও পর্যালোচনা ও যৌক্তিকীকরণের জন্য পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের সড়ক পরিবহন উইংয়ের প্রধান অতিরিক্ত সচিব আলী রেজা সিদ্দিকীকে প্রধান করে একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে প্রকল্পের বিভিন্ন ব্যয় খাত যাচাই করে প্রয়োজনীয় ছাঁটাইয়ের মাধ্যমে বাস্তবসম্মত ব্যয় নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ঢাকার যানজট কমাতে গুরুত্বপূর্ণ এই দুই মেট্রোরেল প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে আপত্তি না থাকলেও, অস্বাভাবিক ব্যয় বৃদ্ধির প্রস্তাব এখন বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের নতুন কমিটির পর্যালোচনার পরই বোঝা যাবে, দুই প্রকল্পের ব্যয় কতটা কমানো সম্ভব হয়।

আরও পড়ুন