ঢাকা, রোববার, ৩০ আগস্ট ২০২৬

১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

অরক্ষিত লেভেল ক্রসিং ও ঝুঁকিপূর্ণ সেতু

সাড়ে ৭ মাসে রাজবাড়ী রেলওয়ে থানা এলাকায় ৪০ মৃত্যু

রাজবাড়ী রেলওয়ে থানার (জিআরপি) অধীনে থাকা পাঁচ জেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর ঘটনা প্রায়ই সামনে আসে। সম্প্রতি গোপালগঞ্জ জেলার কাশিয়ানীতে ট্রেনে কাটা পড়ে দুই যুবকের মৃত্যুর বিষয়ে আলোচনায় আসে।

প্রকাশ: ১৭:৫০, ২৯ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৭:৫২, ২৯ আগস্ট ২০২৬

সাড়ে ৭ মাসে রাজবাড়ী রেলওয়ে থানা এলাকায় ৪০ মৃত্যু

সংগৃহীত ছবি

জানা গেছে, চলতি বছরের গত সাড়ে সাত মাসে রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুরে মোট ৪০ জন প্রাণ হারিয়েছেন। রাজবাড়ী জিআরপির আওতাভুক্ত রেলওয়ের শতাধিক স্থান অরক্ষিত ও অনেক লেভেল ক্রসিংয়ে নেই গেটম্যান। ব্রিটিশ আমলে নির্মিত কালিকাপুর রেল ব্রিজটিও দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ। অভিযোগ রয়েছে, প্রায়ই ট্রেন দুর্ঘটনা ও প্রাণহানি ঘটলেও এটি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে না রেল কর্তৃপক্ষ।

রাজবাড়ী রেলওয়ে থানা সূত্রে জানা গেছে, এ থানা এলাকার অধীনে মোট পাঁচটি জেলা রয়েছে। জেলাগুলো হলো রাজবাড়ী, ফরিদপুর, মাদারীপুর, গোপালগঞ্জ ও শরীয়তপুর। জিআরপির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারিতে পাঁচজন, ফেব্রুয়ারিতে দুজন এবং মার্চে তিনজন ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান। পরবর্তী সময়ে এপ্রিলে নয়জন, মে মাসে তিনজন, জুনে আটজন, জুলাইয়ে ছয়জন ও সর্বশেষ ২৫ আগস্ট পর্যন্ত চার জনের মৃত্যু হয়। সব মিলিয়ে নিহতের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৪০ জনে।

জেলাভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, রাজবাড়ীর পাংশা, মাছপাড়া, কালুখালী, পাংশুরিয়া, সূর্যনগর ও খানখানাপুর—এ ছয় স্পটে মারা গেছে ১৫ জন। ফরিদপুর জেলার তালমা, কুমারডাঙ্গা, বাখুণ্ডা, নগরকান্দা, মধুখালী, সাতৈর, বাসাগারী, আমিরাবাদ, বোয়ালমারী ও সুভারামপুরসহ ১০টি স্পটে ১৬ জন নিহত হন। গোপালগঞ্জের মহেষপুর ও কাশিয়ানী স্পটে মারা যান চারজন। মাদারীপুরের শিবচর ও বন্দরখোলা স্পটে প্রাণ হারিয়েছেন পাঁচজন। তবে এ সময়ে শরীয়তপুর জেলায় ট্রেনে কাটা পড়ে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি।

দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে সরজমিনে রাজবাড়ীর কালিকাপুর রেল ব্রিজ এলাকায় ভয়াবহ চিত্র দেখা যায়। ব্রিটিশ আমলে তৈরি ব্রিজটির কাঠামো এখনো অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিকে বর্তমানে ট্রেনের বগি ও ইঞ্জিনের উচ্চতা এবং সাইজ আগের চেয়ে বেড়েছে। ফলে ব্রিজের ভেতরের ফাঁকা জায়গা খুবই সংকীর্ণ হয়ে পড়েছে। ট্রেনের ছাদ থেকে উপরিভাগের উচ্চতা কম থাকায় ছাদে ওঠা যাত্রীরা ব্রিজের গার্ডারে ধাক্কা খেয়ে নিচে পড়ে যান। এখানে প্রায়ই দুর্ঘটনা ঘটে।

স্থানীয় বাসিন্দা মাসুদ রেজা জানান, ব্রিজটি তৈরির পর থেকেই এখানে প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে। যে কারণে এলাকার মানুষের কাছে এটি ‘লাল ব্রিজ’ নামে পরিচিত। তিনি বলেন, ‘ব্রিজের উচ্চতা একেবারেই কম। ফলে ছাদে কোনো যাত্রী থাকলে তার মৃত্যু প্রায় নিশ্চিত। ভাগ্যক্রমে কেউ বেঁচে ফিরলেও তাকে আজীবন পঙ্গুত্ববরণ করতে হয়।’

rajbari-(10)

আরেক বাসিন্দা খলিলুর রহমান বলেন, ‘একসময় এখানে প্রায়ই মরদেহ পড়ে থাকত। তখন পরিচয় না পাওয়ায় শেয়াল-কুকুরে মরদেহ টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যেত। এখনো দুর্ঘটনা ঘটছে। তবে বর্তমানে পুলিশ এসে মরদেহ উদ্ধার করে। পরিচয় মিললে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়, আর পরিচয় না পেলে অজ্ঞাত হিসেবে দাফন করা হয়।’

এলাকাবাসীর অভিযোগ, এ ব্রিজে এত মানুষের প্রাণ গেলেও রেল কর্তৃপক্ষের টনক নড়ছে না। তারা জানান, দুর্ঘটনা প্রতিরোধে জোরালো পদক্ষেপ নেয়া এখন সময়ের দাবি। হয় ব্রিজের ওপরের অংশ ভেঙে ফেলতে হবে, নয়তো আরো উঁচু করতে হবে। একই সঙ্গে ট্রেনে ছাদে যাত্রী ওঠা বন্ধে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার মাছপাড়া থেকে ভাটিয়াপাড়া পর্যন্ত অন্তত শতাধিক স্থানে রেলপথ অরক্ষিত। কোথাও অবৈধভাবে গড়ে উঠেছে রেল ক্রসিং, কোথাও ক্রসিংয়ে নেই ব্যারিয়ার, কোথাও আবার নেই গেটম্যান। ফলে মানুষ একটু অসতর্ক হলেই ঘটছে দুর্ঘটনা। যে কারণে দিন দিন ট্রেনে কাটা পড়ে মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে।

কালুখালীর রতনদিয়া বাজারের অরক্ষিত ক্রসিং নিয়ে স্থানীয় বাসিন্দা ইমরান হোসেন বলেন, ‘বাজারে কোনো গেট বা গেটম্যান নেই। ট্রেন চলে এলে প্রায়ই যানবাহন সামনে পড়ে দুর্ঘটনা ঘটে। এতে প্রতিনিয়ত মানুষ আহত ও নিহত হচ্ছে।’ তাই দ্রুততম সময়ে গেটম্যান নিয়োগ বা অরক্ষিত গেট বন্ধ করার দাবি জানান তিনি।

এসব বিষয়ে রাজবাড়ীর স্টেশন মাস্টার তন্ময় কুমার বণিক জানান, নিরাপদ যোগাযোগ মাধ্যম হিসেবে রেল জনপ্রিয় হলেও কিছু মানুষের অসচেতনতার কারণে দুর্ঘটনা ঘটে। তাই ট্রেনে ছাদ ভ্রমণ থেকে বিরত থাকা ও সতর্ক হয়ে রেলপথ পার হওয়ার আহ্বান জানান তিনি। তিনি দাবি করেন, স্টেশনে ট্রেন আসার আগে বারবার মাইকিং করে সচেতন করা হয়। আর অরক্ষিত রেলপথের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। অনুমতি পেলেই ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন