ঢাকা, রোববার, ১৯ জুলাই ২০২৬

৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

সাইফুল্লাহ রিয়াদের ভুলে কাঠগড়ায় সচিব-ডিজি

প্রকাশ: ০২:৩৪, ১৯ জুলাই ২০২৬

সাইফুল্লাহ রিয়াদের ভুলে কাঠগড়ায় সচিব-ডিজি

ভুল নাম ও পদবি ব্যবহার করে বদলি আদেশ; নতুন কর্মস্থলে যোগদানের নির্দেশ দেওয়া হলেও দেওয়া হয়নি আদেশের কপি ও ছাড়পত্র। হাজিরা থাকার পরও দেওয়া হয়নি বেতন; উল্টো বন্ধ করা হয়। রেলের এক শ্রমিকের সঙ্গে এমন অমানবিকর আচরণ করেছেন রেলেরই এক কর্মকর্তা। ফলে ৯ মাস ২৩ দিন চাকরিহারা ছিলেন সেই শ্রমিক। ওই কর্মকর্তার ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার শ্রমিক জুনায়েদ মিয়া কর্মকর্তাদের কাছে কোনো প্রতিকার না পেয়ে ঢাকার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করেন।

আদালত সূত্রে জানা গেছে, প্রশাসনিক হয়রানি, বেতন বন্ধ রাখা, আর্থিক ও মানসিক ক্ষতির প্রতিকার এবং দায়ী কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের আবেদন জানিয়ে ঢাকার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলা দায়ের করা হয়। এতে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিব, রেলওয়ে অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি), রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম), ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (পথ) সাইফুল্লাহ রিয়াদ, সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী-১ মেহেদী হাসান আহমেদ তারেকসহ মোট ১০ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।

সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ১৪ অক্টোবর ঢাকার প্রশাসনিক ট্রাইব্যুনালে মামলাটি দায়ের করা হয়। এর আগে গত ৩ সেপ্টেম্বর আইনি নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। একই বছরের ২০ নভেম্বর শুনানি শেষে আদালত মামলাটি খারিজ করে দেন। এরপর চলতি বছরের ১৪ এপ্রিল ঢাকার প্রশাসনিক আপিল ট্রাইব্যুনালে আপিল করা হয়। গত বুধবার শুনানি শেষে মামলাটি আমলে নিয়ে বিবাদীদের বিরুদ্ধে আইনি নোটিশ জারি করেন আদালত। জানতে চাইলে বাদীর আইনজীবী আহমেদ ইমতিয়াজ আমাদের সময়কে বলেন, একজন শ্রমিককের প্রাপ্য বেতন না দেওয়ায়

আদালত মামলাটি আমলে নিয়েছেন। রেলের সচিব, ডিজিসহ সংশ্লিষ্ট দশ কর্মকর্তার প্রতি আইনি নোটিশ জারি করেছেন।

অভিযোগ উঠেছে, রেলওয়ে ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশল অফিসের শায়েস্তাগঞ্জের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী সাইফুল্লাহ রিয়াদের ব্যক্তিগত আক্রোশের শিকার ভারপ্রাপ্ত কার্পেন্টার (রেল ব্রিজের স্লিপার মেরামতের কাজে নিয়োজিত) জুনায়েদ মিয়া। ২০২২ সালে ৫০ লাখ টাকার একটি ঠিকাদারি কাজে সাইফুল্লাহ রিয়াদের অবৈধ প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় এমন পরিণতি। দুর্নীতির সাক্ষী হয়ে থাকায় তাকে চাকরিচ্যুত করতেই এমন ষড়যন্ত্র।

মামলার এজহারে উল্লেখ করা হয়েছে, ২০১৯ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে যোগদানের পর থেকে তাকে বিভিন্ন সময় বেতন থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বিশেষ করে ভুল বদলি আদেশের অজুহাতে ২০২৪ সালের ৩১ মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত দীর্ঘ ৯ মাস ২৩ দিন তার বেতন সম্পূর্ণ বন্ধ রাখা হয়। সরকারি নিয়ম লঙ্ঘন করে বদলির আদেশ ও ছাড়পত্র ছাড়াই বেআইনিভাবে তার সার্ভিস বুক অন্য দপ্তরে পাঠানো হয়েছে। একই পদে তাকে বহাল রেখে অন্য একজনকে পদায়ন করা হয়েছে এবং তার প্রাপ্য বেতন, ইনক্রিমেন্ট, সরকারি পোশাক ও অন্যান্য সরঞ্জাম থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। বেতন বন্ধ থাকায় জুনায়েদ মিয়া গুরুতর আর্থিক সংকটে পড়েন। তিনি ব্যাংকঋণ নিতে বাধ্য হন, যার সুদের পরিমাণ প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই আর্থিক ও প্রশাসনিক হয়রানির কারণে তার এবং তার পরিবারের সম্মান ও মর্যাদা ক্ষুণœ হয়েছে। এই ঘটনার জন্য দায়ী বিবাদীসহ অন্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা নিতে আদালতে আবেদন জানানো হয়।

ভুক্তভোগী জুনায়েদ মিয়া আমাদের সময়কে বলেন, বার বার আবেদন করার পরও ন্যায়বিচার না পেয়ে মামলা করতে বাধ্য হয়েছি। তিনি বলেন, ২০২৩ সালের ১৫ নভেম্বর-ডিসেম্বর মাসে আমি কর্মস্থলে চাকরি করেছি, হাজিরাও আছে, এরপরও পিডব্লিউ/আই সাইফুল্লাহ রিয়াদ আমার হাজিরা বিল দেয়নি। ২০২৩ থেকে ২০২৫ সাল পর্যন্ত আমার রেগুলার বেতন দেড় হাজার থেকে ১৮শ টাকা কম পাচ্ছি। ২০২৪ সালের মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত বিনা কারণে অবৈধভাবে আমার বেতন বন্ধ করে দেন। যা সম্পূর্ণ অযৌক্তিক ও অবৈধ। সরকারি বরাদ্দকৃত পোশাক ও সেফটি সামগ্রী আমাকে দেওয়া হয়নি।

তিনি আরও বলেন, ২০২৫ সালের ২১ জানুয়ারি পর্যন্ত আমি শায়েস্তাগঞ্জ কার্পেন্টার (ভারপ্রাপ্ত) হিসেবে কর্মরত ছিলাম। কিন্তু একই দপ্তরে, একই পদে আমাকে অব্যাহতি না দিয়ে, শূন্য পদ দেখিয়ে ২০২৪ সালের ২০ মে আরেকজনকে কার্পেন্টার হিসেবে পদায়ন করেন; যা সম্পূর্ণ অবৈধ। এমনকি আমাকে শায়েস্তাগঞ্জ কর্মরত রেখে আমার সার্ভিস বই ২০২৪ সালের ২৩ মে সম্পূর্ণ অবৈধভাবে অন্য দপ্তরে সরিয়ে নেয়। বেতনের বিপরীতে আমি ব্যাংকঋণ নিতে বাধ্য হয়েছি; কিন্তু বেতন বন্ধ থাকায় ব্যাংক টাকা পাচ্ছে না। ফলে ব্যাংক কর্তৃপক্ষ আমার বিরুদ্ধে আইনি পদক্ষেপ নিয়েছে। আমি কোনো প্রতিকার না পেয়ে আদালতের দ্বারস্থ হয়েছি।

মামলার বিষয়ে অবগত হয়েছেন জানিয়ে সাইফুল্লাহ রিয়াদ বলেন, এখন আমরা আইনিভাবে মোকাবিলা করব। সরকারি চাকরি বিধি অনুসরণ করেই আমি যাবতীয় কাজ করেছি। আদালতে যাওয়ার অধিকার সবার আছে।

এদিকে ঘটনাটি তদন্তে একটি কমিটি গঠন হয়েছে বলে জানিয়েছেন ঢাকা বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ আহসান হাবিব। বলেন, তদন্ত প্রতিবেদনের ভিত্তিতে সাইফুল্লাহ রিয়াদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন