১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরুর পর প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগেনি বললেই চলে। পুরোনো যন্ত্রপাতি, তীব্র জনবল সংকট ও বাড়তে থাকা কোচ-ওয়াগনের চাপ নিয়ে চলছে রেলের গুরুত্বপূর্ণ এই মেরামত কারখানা।
শিরোনাম
রেল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১২:৪৪, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১২:৪৪, ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
১৯৮৭ সালে যাত্রা শুরুর পর প্রায় চার দশক পেরিয়ে গেলেও চট্টগ্রামের পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপে আধুনিকায়নের ছোঁয়া লাগেনি বললেই চলে। পুরোনো যন্ত্রপাতি, তীব্র জনবল সংকট ও বাড়তে থাকা কোচ-ওয়াগনের চাপ নিয়ে চলছে রেলের গুরুত্বপূর্ণ এই মেরামত কারখানা।
কারখানায় থাকা ৪৪৯টি যন্ত্রপাতির মধ্যে ২৭১টির বয়স ৫০ থেকে ৮০ বছর বা তারও বেশি। অথচ এসব যন্ত্রপাতির নির্ধারিত আয়ুষ্কাল ২০ বছর।
অন্যদিকে ২ হাজার ২০০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে বর্তমানে কর্মরত আছেন মাত্র ১ হাজার ৫০ জন।
পুরোনো যন্ত্রে কমেছে সক্ষমতা
পাহাড়তলী রেলওয়ে ওয়ার্কশপের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বছরের পর বছর মেরামত ও সংস্কার করে পুরোনো যন্ত্রপাতি সচল রাখা হয়েছে। নতুন প্রযুক্তির যন্ত্রপাতি পর্যাপ্ত না থাকায় অনেক কাজই করতে হচ্ছে পুরোনো পদ্ধতিতে।
রেলের বহরে নতুন ইঞ্জিন, কোচ ও ওয়াগন যুক্ত হলেও মেরামত অবকাঠামো সেই অনুপাতে বাড়েনি। এতে কারখানার ওপর চাপ বাড়ছে, অথচ সক্ষমতা বাড়ছে না। লোকবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অর্থ বরাদ্দ দিলে দিনে প্রায় ৬টি গাড়ি মেরামত শেষে কারখানা থেকে বের করা সম্ভব। কিন্তু বর্তমানে ২টি গাড়ি বের করতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। যারা অবসরে যাচ্ছেন তারা অভিজ্ঞ। কিন্তু ধার করে আনা শ্রমিকরা অভিজ্ঞ নয়। জনবল সংকটের কারণে নিয়মিত কর্মঘণ্টার পরও প্রায় দুই ঘণ্টা ওভারটাইম করতে হচ্ছে কর্মীদের। এর পরও প্রয়োজন অনুযায়ী মেরামতের কাজ শেষ করা যাচ্ছে না।
৯৩০ কোচ, ৬ হাজার ওয়াগনের চাপ
চট্টগ্রাম অঞ্চলে রেলের কোচ রয়েছে প্রায় ৯৩০টি এবং ওয়াগন প্রায় ৬ হাজার। এসব রেলযানের নিয়মিত মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণের চাপ সামলাতে হচ্ছে সীমিত জনবল ও পুরোনো যন্ত্রপাতি দিয়ে। এ ছাড়া জনবল ঘাটতি মেটাতে আলাদা একটি প্রকল্পের আওতায় অস্থায়ী শ্রমিক দিয়ে কোচ মেরামতের কাজ চলছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাময়িকভাবে এভাবে চাপ সামলানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে স্থায়ী ও প্রশিক্ষিত জনবলের বিকল্প নেই।
বহর বাড়ছে, বাড়ছে না মেরামত সক্ষমতা
রেলওয়ের উন্নয়নের সঙ্গে নতুন ইঞ্জিন, কোচ ও ওয়াগনের সংখ্যা বাড়ছে। কিন্তু সেই অনুপাতে মেরামত সক্ষমতা বাড়ানো যাচ্ছে না বলে জানান পাহাড়তলী রেলওয়ে কারখানার বিভাগীয় তত্ত্বাবধায়ক মোস্তফা জাকির হাসান। তিনি বলেন, রেলের বহর বাড়ার কারণে নতুন আরেকটি ওয়ার্কশপ নির্মাণ করা অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে।
এমন পরিস্থিতির মধ্যেই ইঞ্জিন দ্রুত মেরামত করে সচল রাখার নির্দেশ দিয়েছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মামুনুল ইসলাম।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) চট্টগ্রামের রেলওয়ে ট্রেনিং একাডেমি (আরটিএ), সিজিপিওয়াই, টার্ন টেবিল, ট্রায়াঙ্গেল লাইন, ইয়ার্ড লাইন, লোকোসেড, কনটেইনার কোম্পানি অব বাংলাদেশ (সিসিবিএল) ও পদ্মা অয়েল সাইডিং লাইন পরিদর্শন করেন তিনি। লোকোসেড পরিদর্শনের সময় ইঞ্জিন দ্রুত মেরামত ও সচল রাখার বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের বিভিন্ন পরামর্শ ও নির্দেশনা দেন জিএম। অন্যান্য স্থাপনা পরিদর্শনেও রেলের কার্যক্রম পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় দিকনির্দেশনা দেন।
নতুন ওয়ার্কশপ ও আধুনিকায়নের দাবি
শুধু নির্দেশনা দিয়ে পাহাড়তলী ওয়ার্কশপের সংকট দূর করা সম্ভব নয়। দ্রুত জনবল নিয়োগ, আধুনিক যন্ত্রপাতি সংযোজন, পর্যাপ্ত বাজেট এবং মহাপরিকল্পনা অনুযায়ী অবকাঠামোর আধুনিকায়ন প্রয়োজন।
কর্মকর্তারা জানান, প্রয়োজনীয় লোকবল, আধুনিক যন্ত্রপাতি ও অর্থ বরাদ্দ পেলে বর্তমান কারখানার সক্ষমতা অনেকটাই বাড়ানো সম্ভব। তবে আগামী ডিসেম্বরের মধ্যে আরও ১০১ জন অভিজ্ঞ কর্মী অবসরে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের মতে, রেলের বহর যখন ক্রমেই বাড়ছে, তখন মেরামত ও রক্ষণাবেক্ষণ অবকাঠামো পিছিয়ে থাকলে এর প্রভাব পড়তে পারে পুরো রেল পরিবহন ব্যবস্থায়।