ঢাকা, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

৩০ বৈশাখ ১৪৩৩, ২৬ জ্বিলকদ ১৪৪৭

১১০ বছরের স্বপ্নপূরণে দুর্গাপুরে রেললাইন সম্প্রসারণ, জনমনে উৎসবের আমেজ

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ২৩:৪১, ১২ মে ২০২৬ | আপডেট: ২৩:৪১, ১২ মে ২০২৬

১১০ বছরের স্বপ্নপূরণে দুর্গাপুরে রেললাইন সম্প্রসারণ, জনমনে উৎসবের আমেজ

ব্যারিস্টার কায়সার কামাল

নেত্রকোনার দুর্গাপুর উপজেলায় প্রায় ১১০ বছরের পুরনো এক স্বপ্ন বাস্তবায়নের পথে। সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি এবার রেল যোগাযোগের সম্ভাবনায় উচ্ছ্বসিত হয়ে উঠেছে পুরো দুর্গাপুরবাসী। সম্ভাব্য রেললাইন সম্প্রসারণকে ঘিরে উপজেলার চায়ের দোকান, বাজার, শপিংমল থেকে শুরু করে গ্রামাঞ্চলজুড়ে এখন আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু একটাই— “দুর্গাপুরে আসছে রেললাইন”।

স্থানীয়দের মতে, আগামী ১৩ মে দুর্গাপুরবাসীর জন্য একটি স্মরণীয় দিন হয়ে থাকবে। তারা বলছেন, দীর্ঘদিনের প্রত্যাশার চেয়েও বড় সুখবর পেতে যাচ্ছে সীমান্তবর্তী এই জনপদ।ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৯১২ সালে শ্যামগঞ্জ থেকে জারিয়া-ঝাঞ্জাইল হয়ে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণের পরিকল্পনা শুরু হয়। ১৯১৮ সালে এ নিয়ে বাণিজ্যিক সিদ্ধান্তও গ্রহণ করা হয়েছিল। সে সময় রেলওয়ে কর্মচারীদের আবাসন নির্মাণের জন্য জমি অধিগ্রহণ এবং রেললাইন সম্প্রসারণের উদ্দেশ্যে সড়ক নির্মাণকাজও শুরু হয়েছিল। এমনকি জারিয়া এলাকার নাটোরকোনা অঞ্চলে এখনও সেই মাটি কাটার চিহ্ন রয়েছে বলে জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

তবে বিভিন্ন রাজনৈতিক ও ঐতিহাসিক ঘটনার কারণে প্রকল্পটি আর বাস্তবায়ন হয়নি। টংক আন্দোলন, ভাষা আন্দোলন, ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ, মুক্তিযুদ্ধসহ নানা অস্থিরতায় সে সময়ের আসাম বেঙ্গল রেলওয়ে ও পরবর্তীতে পাকিস্তান রেলওয়ে এই অঞ্চলে রেল নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণে কার্যকর উদ্যোগ নেয়নি। স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ রেলওয়ের পক্ষ থেকেও দীর্ঘদিন দৃশ্যমান কোনো উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়নি।সম্প্রতি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতির অংশ হিসেবে নেত্রকোনা-১ আসনে রেললাইন সম্প্রসারণের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আসে। এরপর থেকেই দুর্গাপুরজুড়ে আনন্দ-উচ্ছ্বাস বিরাজ করছে।

স্থানীয়দের বিশ্বাস, জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন, শিক্ষা ও শিল্পখাতে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ঘেরা দুর্গাপুরের পাহাড়, নদী, টিলা ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে। গড়ে উঠবে নতুন হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট ও ক্ষুদ্র ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। একই সঙ্গে স্থানীয় যুবকদের জন্য তৈরি হবে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ।

তারা আরও বলেন, যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নের ফলে কৃষিভিত্তিক শিল্প, খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ শিল্প এবং স্থানীয় আদিবাসী জনগোষ্ঠীর হস্তশিল্প খাতে বিনিয়োগ বাড়বে। কম খরচে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহন সম্ভব হবে।প্রবীণ সংস্কৃতিজন বীরেশ্বর চক্রবর্তী বলেন, “মৃত্যুর আগে দুর্গাপুরে রেললাইন সম্প্রসারণের স্বপ্ন পূরণ হতে দেখবো, এটা কখনও ভাবিনি। এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে পুরো এলাকার অর্থনৈতিক মুক্তি ঘটবে।”

আদিবাসী নেতা অঞ্জন চিছাম বলেন, “দুর্গাপুরে ট্রেনলাইন সম্প্রসারণের খবর শুনে আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে উৎসবের আমেজ বিরাজ করছে। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।”

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) আহমেদ সাদাত বলেন, “দুর্গাপুরে যোগদানের কয়েকদিনের মধ্যেই এমন একটি ইতিবাচক খবর পেলাম। রেললাইন চালু হলে দুর্গাপুর একটি নতুন অর্থনৈতিক অঞ্চলে পরিণত হবে এবং এখানকার মানুষের দীর্ঘদিনের প্রত্যাশা পূরণ হবে।”স্থানীয়দের মতে, জারিয়া-ঝাঞ্জাইল থেকে দুর্গাপুর পর্যন্ত রেললাইন সম্প্রসারণ শুধু একটি যোগাযোগ প্রকল্প নয়; এটি পুরো নেত্রকোণা অঞ্চলের উন্নয়ন ও সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলে দেবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন