শিরোনাম
প্রকাশ: ২১:৩০, ৩ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ২২:০০, ৩ জুলাই ২০২৬
মনিরুজ্জামান মনির
রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সাবেক অতিরিক্ত সচিব মাহবুব কবির মিলনের ভেরিফায়েড ফেসবুক পোস্টে বাংলাদেশ রেলওয়ের ব্যবস্থাপনা, অবকাঠামো, যাত্রী নিরাপত্তা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা নিয়ে উত্থাপিত বিভিন্ন মন্তব্য আমার দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের উন্নয়ন, নিরাপত্তা ও সুশাসন নিয়ে গঠনমূলক সমালোচনা অবশ্যই স্বাগত। তবে তাঁর বক্তব্যের কিছু অংশে আমি সুস্পষ্ট দ্বৈত অবস্থান এবং রহস্যজনক উদ্দেশ্যের ইঙ্গিত দেখতে পাচ্ছি।
তিনি একদিকে বর্তমান রেলপথ মন্ত্রণালয়ের দুই মন্ত্রীকে সৎ, কর্মঠ ও ভালো মানুষ হিসেবে উল্লেখ করেছেন, অন্যদিকে আবার রেলওয়ের মাত্র ৩ থেকে ৪ জন শীর্ষ কর্মকর্তাকে বর্তমান দায়িত্ব থেকে অপসারণের আহ্বান জানিয়েছেন। প্রশ্ন হচ্ছে—বাংলাদেশ রেলওয়ের দীর্ঘদিনের সংকট, অনিয়ম ও দুর্নীতির জন্য কি শুধুই কয়েকজন কর্মকর্তা দায়ী? নাকি এটি নীতিনির্ধারণ, প্রশাসনিক কাঠামো, তদারকি ও জবাবদিহিতার দীর্ঘদিনের একটি সামগ্রিক ব্যর্থতা?
মাহবুব কবির মিলন নিজেই তাঁর বক্তব্যে বলেছেন যে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের প্রযুক্তিগত জ্ঞানের অভাব রয়েছে। কিন্তু তিনি নিজেও দীর্ঘদিন একই মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে ছিলেন। সেই সময়ে তিনি কেন এই সীমাবদ্ধতা দূর করতে কার্যকর সংস্কার বা প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ গ্রহণ করতে পারেননি, সেটিও জনগণের জানার অধিকার রয়েছে।
বাংলাদেশ রেলওয়ে একটি বিশেষায়িত কারিগরি প্রতিষ্ঠান। এটি সরকারের অন্যান্য সাধারণ প্রশাসনিক মন্ত্রণালয়ের মতো নয়। তাই শুধু প্রশাসনিক দক্ষতা নয়, রেল পরিচালনায় কারিগরি জ্ঞান, পেশাগত অভিজ্ঞতা এবং বাস্তব দক্ষতাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে। দক্ষ ও জবাবদিহিমূলক নেতৃত্ব ছাড়া রেলওয়ের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন সম্ভব নয়।
চলন্ত ট্রেনে পাথর নিক্ষেপ একটি জঘন্য অপরাধ। এ ধরনের অপরাধ দমনে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে এবং দায়ীদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনতে হবে। তবে প্রতিটি কোচের জানালায় স্টিলের নেট বসিয়ে ট্রেনকে জেলখানার মতো পরিবেশে পরিণত করা কোনো টেকসই বা যাত্রীবান্ধব সমাধান হতে পারে না।
একইভাবে ট্রেনের ছাদে যাত্রী ভ্রমণ বন্ধ করতে হলে কেবল ছাদের নকশা পরিবর্তনের প্রস্তাব যথেষ্ট নয়। যাত্রীচাহিদা অনুযায়ী নতুন ট্রেন ও কোচ সংযোজন, ট্রেনের সংখ্যা বৃদ্ধি এবং সেবার মান উন্নয়নই হতে পারে বাস্তবসম্মত ও দীর্ঘমেয়াদি সমাধান।
আমি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করি, বাংলাদেশ রেলওয়েসহ দেশের সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে যদি সত্যিকার অর্থে দুর্নীতি, অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা বন্ধ করতে হয়, তাহলে শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের কয়েকজন কর্মকর্তাকে দায়ী করলে হবে না। সবার আগে রাজনীতিবিদ, আমলা এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের সব স্তরের দুর্নীতিবাজ ও দায়িত্বে ব্যর্থ ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সমানভাবে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।
রেলওয়ের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তাকে অপসারণের পরামর্শ দেওয়ার আগে রেলপথ মন্ত্রণালয়সহ সরকারের সব মন্ত্রণালয়ের দুর্নীতিবাজ ও জবাবদিহিহীন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও একই ধরনের অবস্থান নেওয়া উচিত। আইনের দৃষ্টিতে কেউই জবাবদিহির ঊর্ধ্বে নন।
দুর্নীতির বিরুদ্ধে অবস্থান যদি সত্যিই নীতিগত হয়, তবে তা ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানভেদে নয়—রাষ্ট্রের সর্বস্তরে সমানভাবে প্রয়োগ করতে হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়েকে একটি আধুনিক, নিরাপদ, প্রযুক্তিনির্ভর ও জনবান্ধব প্রতিষ্ঠানে রূপান্তর করতে হলে ব্যক্তি পরিবর্তনের রাজনীতি নয়, প্রয়োজন প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা এবং সর্বস্তরে জবাবদিহি নিশ্চিত করা। এ লক্ষ্যেই রাষ্ট্রের সব পর্যায়ে সমানভাবে দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান গ্রহণ করা এখন সময়ের দাবি।
মনিরুজ্জামান মনির
সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং সভাপতি
বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি