ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৫ মে ২০২৬

২২ বৈশাখ ১৪৩৩, ১৮ জ্বিলকদ ১৪৪৭

কমলাপুর স্টেশনের তোলা ছবিতে মিললো ফটোগ্রাফির অস্কার

সেলিমুর রহমান

প্রকাশ: ১০:৫৪, ৫ মে ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৫, ৫ মে ২০২৬

কমলাপুর স্টেশনের তোলা ছবিতে মিললো ফটোগ্রাফির অস্কার

ছবি: সংগৃহীত

আলোকচিত্র অঙ্গনে বিশ্বব্যাপী মর্যাদাপূর্ণ নাম লুইসি ফাউন্ডেশন। ২০০৩ সালে হোসেইন ফারমানি-এর প্রতিষ্ঠিত এই অলাভজনক সংস্থা দীর্ঘদিন ধরে বিশ্বজুড়ে আলোকচিত্রশিল্পের উৎকর্ষতা তুলে ধরছে। তাদের আয়োজিত লুসি অ্যাওয়ার্ডস-কে অনেকেই আলোকচিত্র জগতের ‘অস্কার’ হিসেবে বিবেচনা করেন।

এবার সেই মর্যাদাপূর্ণ আসরে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন আলোকচিত্রী ইনামুল কবির। ‘এক লাফে বিশ্বাস’ শিরোনামের একটি মুহূর্তভিত্তিক ছবির জন্য তিনি ‘অন দ্য ব্লক’ প্রতিযোগিতার স্বতঃস্ফূর্ত আলোকচিত্র বিভাগে প্রধান পুরস্কার অর্জন করেছেন। আগামী ১৩ জুন যুক্তরাষ্ট্রের হাউস অব লুইসি-এ তাঁর এই ছবি প্রদর্শিত হবে।একটি মুহূর্ত, এক গভীর গল্প
পুরস্কারপ্রাপ্তির খবরটি আসে হঠাৎ করেই। তখন তিনি সিঙ্গাপুরে সফরে ছিলেন। প্রথমে বিশ্বাস করতে পারেননি। পরে প্রতিষ্ঠানের ওয়েবসাইটে নিজের ছবিটি দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়েন। একজন বাংলাদেশি হিসেবে এমন আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাঁর কাছে বিশেষ গর্বের।

ছবিটির গল্পও ততটাই হৃদয়স্পর্শী। ২০১৫ সালে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন-এ ঈদযাত্রার সময় তোলা এই ছবি। ভিড়ের মধ্যে ট্রেনের জানালা দিয়ে এক ব্যক্তি একটি শিশুকে আরেক নারীর হাতে তুলে দিচ্ছেন—চারদিকে বিশৃঙ্খলা থাকলেও সেই মুহূর্তে ছিল অটুট বিশ্বাস ও পারস্পরিক নির্ভরতা। সেই ক্ষণস্থায়ী দৃশ্যই ক্যামেরায় ধারণ করেন তিনি।

ইনামুল বলেন, স্বতঃস্ফূর্ত আলোকচিত্রে সময়জ্ঞানই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। এমন একটি মুহূর্তের জন্য তাঁকে দিনের পর দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে, বারবার ব্যর্থ হয়ে আবার চেষ্টা করতে হয়েছে। অবশেষে সেই কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত ধরা দিয়েছে তাঁর ক্যামেরায়।মফস্বল থেকে বিশ্বমঞ্চে
ঝিনাইদহের কোটচাঁদপুরে বেড়ে ওঠা ইনামুলের দৃষ্টিভঙ্গি গড়ে উঠেছে মফস্বলের বাস্তবতায়। সেখান থেকেই তিনি মানুষ ও জীবনের গল্প দেখতে শিখেছেন। পরে ঢাকায় এসে ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিক থেকে ব্যবসায় প্রশাসনে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেন। বর্তমানে একটি লেবেল ও মোড়কজাত পণ্য প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানে কর্মরত থাকলেও আলোকচিত্রই তাঁর প্রকৃত ভালোবাসা।

তিনি মনে করেন, আলোকচিত্র শুধু শখ নয়—এটি গল্প বলার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। তাঁর অনুপ্রেরণার জায়গায় রয়েছেন আলোকচিত্রী ইমতিয়াজ আলম বেগ। তাঁর কাছ থেকে পাওয়া দিকনির্দেশনাই ইনামুলের দৃষ্টিভঙ্গিতে বড় পরিবর্তন এনে দেয়।যন্ত্র নয়, দৃষ্টিভঙ্গিই আসল
পুরস্কারপ্রাপ্ত ছবিটি একটি সাধারণ মানের ক্যামেরা ও মাঝারি পরিসরের লেন্স ব্যবহার করে তোলা হয়েছে। ইনামুল সাধারণত বিস্তৃত কোণের লেন্সে কাজ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন, যা তাঁকে ঘটনার খুব কাছে নিয়ে যায়। রঙিন আলোকচিত্র তাঁর বেশি পছন্দ—কারণ প্রতিটি রং তাঁর কাছে আলাদা বার্তা বহন করে।

স্বীকৃতির সঙ্গে বাড়ছে দায়িত্ব
এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি তাঁর কাছে যেমন আনন্দের, তেমনি বড় দায়িত্বেরও। তিনি মনে করেন, বাংলাদেশের চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অসংখ্য গল্প আরও যত্ন নিয়ে বিশ্বের সামনে তুলে ধরা প্রয়োজন।

নতুনদের উদ্দেশে তাঁর পরামর্শ—ধৈর্য ধরতে হবে, নিয়মিত কাজ করতে হবে এবং নিজের স্বতন্ত্র ভাষা খুঁজে নিতে হবে। কারণ, এই ধারাবাহিক চর্চাই একসময় সাফল্যের দ্বার খুলে দেয়।

বাংলাদেশের গল্প, মানুষের অনুভূতি আর বিশ্বাস—এসবই এখন বিশ্বমঞ্চে তুলে ধরছেন ইনামুল কবির, একেকটি ছবিতে, একেকটি জীবন্ত মুহূর্তে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন