ঢাকা, বুধবার, ১৩ মে ২০২৬

৩০ বৈশাখ ১৪৩৩, ২৬ জ্বিলকদ ১৪৪৭

জন্ম না দিয়েও প্রায় দুই হাজার পথশিশুর “মা” সাহেলা খান রিমু

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১১:৫৬, ১১ মে ২০২৬ | আপডেট: ১২:০৫, ১১ মে ২০২৬

জন্ম না দিয়েও প্রায় দুই হাজার পথশিশুর “মা” সাহেলা খান রিমু

রাত তখন প্রায় সাড়ে এগারোটা। রাজধানীর কমলাপুর রেলস্টেশন প্ল্যাটফর্মে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ঘুমিয়ে আছে কয়েকজন পথশিশু। কারও গায়ে ছেঁড়া কাপড়, কেউ না খেয়েই ক্লান্ত শরীর নিয়ে পড়ে আছে মাটিতে। চারপাশে ট্রেনের শব্দ, মানুষের ব্যস্ততা আর একরাশ নির্লিপ্ততা।

ঠিক সেই সময় ছোট্ট এক মেয়ে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরে এক নারীকে। কাঁপা কণ্ঠে বলে ওঠে—
“মা… তুমি আজ আসছো তো?”

নারীটি শিশুটিকে বুকে টেনে নেন। চোখের কোণে জমে ওঠে অশ্রু।
তিনি সাহেলা খান রিমু—জন্ম না দিয়েও যিনি আজ প্রায় দুই হাজার পথশিশুর মা।

রাজধানীর সবুজবাগে জন্ম ও বেড়ে ওঠা সাহেলা খান রিমুর। বাবা আব্দুর রাশেদ খান ও মা সাদেকা খাতুনের স্নেহে বেড়ে ওঠা রিমু ছোটবেলা থেকেই ছিলেন স্বপ্নবাজ। নিজের ভবিষ্যতের পাশাপাশি সমাজের অবহেলিত শিশুদের নিয়েও ভাবতেন তিনি।শৈশব থেকেই তার ইচ্ছে ছিল এমন একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা, যেখানে শিশুরা শুধু বইয়ের শিক্ষা নয়, মানুষ হওয়ার শিক্ষাও পাবে।

তিনি পড়াশোনা করেছেন Moniza Rahman Girls' School & College এবং পরে Government Shaheed Suhrawardy College-এ। শিক্ষাজীবন থেকেই শিশুদের নিয়ে কাজ করার প্রবল আগ্রহ তাকে তাড়িয়ে বেড়াতো।

সেই স্বপ্ন থেকেই ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন “Dhaka Central Model School”। পরে গড়ে তোলেন “Dhaka City Model School”। ধীরে ধীরে প্রায় এক হাজার পরিবারের শিশুদের নিয়ে কাজ শুরু করেন তিনি।

তবে ২০২০ সালের করোনা মহামারিই বদলে দেয় তার জীবনের মোড়।

যখন মানুষ ঘরে বন্দি হয়ে নিজেদের নিরাপত্তা নিয়ে ব্যস্ত, তখন সাহেলা খান রিমু দেখলেন অন্য এক বাস্তবতা—স্টেশনের পাশে ক্ষুধার্ত শিশু, ফুটপাতে ঘুমিয়ে থাকা কিশোর, পরিবারহীন অসহায় মুখ।সেই দৃশ্য তাকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দেয়।

সাহেলা খান রিমু বলেন,
“আমি ঘরে বসে থাকতে পারিনি। বারবার মনে হচ্ছিল, এই শিশুগুলোর পাশে যদি কেউ না দাঁড়ায়, তাহলে ওরা কোথায় যাবে?”

২০২০ সালের ১৫ জুন থেকে শুরু হয় তার নতুন পথচলা। শুরুতে ছিল হাতে গোনা কয়েকজন শিশু। সময়ের সঙ্গে সেই সংখ্যা বাড়তে থাকে। একসময় পথশিশুরাই হয়ে ওঠে তার পৃথিবী, তার পরিবার, তার বেঁচে থাকার কারণ।

আজ পর্যন্ত প্রায় দুই হাজার পথশিশুর মুখে তিনি শুনেছেন পৃথিবীর সবচেয়ে আবেগময় শব্দ—“মা”।তিনি বলেন,
“অনেক রাত আমি ঘুমাতে পারিনি শুধু একটা শিশুর কান্না ভেবে। নিজের কষ্ট ভুলে ওদের মুখে খাবার তুলে দিয়েছি। কারণ আমি জানি, ক্ষুধা কত ভয়ংকর।”

তার এই দীর্ঘ পথচলায় রয়েছে অসংখ্য গল্প। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি নাড়িয়ে দিয়েছিল ছোট্ট “সাথী”-র গল্প।

একদিন কমলাপুর রেলস্টেশন-এর পাশে এলোমেলো চুল ও ময়লা জামা পরা এক শিশুকে দেখতে পান তিনি। ভীত চোখে মানুষের দিকে তাকিয়ে থাকা মেয়েটি কাছে যেতেই তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলেছিল—
“মা, আমাকে ফেলে যেও না…”

পরে জানা যায়, পরিবার থেকে হারিয়ে রাস্তায় চলে এসেছিল শিশুটি। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর অবশেষে তাকে পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দিতে সক্ষম হন সাহেলা খান রিমু।সেদিনের স্মৃতি এখনও আবেগাপ্লুত করে তাকে।

সাথীর মা যখন মেয়েকে বুকের মধ্যে জড়িয়ে ধরে কান্না করছিলেন, তখন চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি রিমুও। সেই মুহূর্তে তিনি উপলব্ধি করেন—কাউকে তার আপন ঠিকানায় ফিরিয়ে দেওয়ার চেয়ে বড় সুখ হয়তো আর কিছু নেই।

আজ মা দিবসে পথশিশুরা যখন তাকে ঘিরে “মা” বলে ডাকে, তখন আবেগে ভেঙে পড়েন সাহেলা খান রিমু।

তিনি বলেন,
“পথশিশুদের মুখে শোনা ‘মা’ ডাকটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অর্জন, সবচেয়ে বড় অ্যাওয়ার্ড।”

স্বার্থ আর প্রতিযোগিতার এই ব্যস্ত নগরজীবনে সাহেলা খান রিমু যেন মানবতার এক উজ্জ্বল নাম। তিনি প্রমাণ করেছেন—মা হওয়া শুধু জন্ম দেওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মা হওয়া মানে নিঃস্বার্থ ভালোবাসা, আশ্রয় আর নিরাপত্তার আরেক নাম।

আরও পড়ুন