শিরোনাম
প্রকাশ: ০১:০৩, ১৩ জুলাই ২০২৬
নরসিংদীর রায়পুরার মেথিকান্দা রেলওয়ে স্টেশনে হামলা ও লুটের ঘটনায় নিহত ববি বেগম ওরফে ওয়াহিদা বেগমের (৭০) সন্ধান ২৫ বছর পর পেলেন তার পরিবারের সদস্যরা।
স্থানীয়দের কাছে ‘বুবি’ নামে পরিচিত ছিলেন বাক্প্রতিবন্ধিতাসম্পন্ন এ বৃদ্ধা। আজ রোববার বিকেলে তার কবর জিয়ারত করতে এসে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন বগুড়া থেকে আসা তার স্বজনরা।
বুবির পরিবারের ১৩ সদস্য ভোরে বগুড়া থেকে রওনা দিয়ে বিকেলে মেথিকান্দা স্টেশনে পৌঁছান। পরে স্টেশনসংলগ্ন নুরপুর কবরস্থানে বুবির কবর জিয়ারত করেন। এসময় সেখানে হৃদয়বিদারক পরিবেশের সৃষ্টি হয়।
পরিবারের দাবি, বুবি ওরফে ওয়াহিদা বেগমের বাড়ি বগুড়ার গাবতলী উপজেলার রামেশ্বরপুর ইউনিয়নের ঘোন সাগাটিয়া গ্রামে। তিনি মৃত রহিম উদ্দিন প্রামাণিক ও আনিসা বিবি দম্পতির বড় মেয়ে।
পরিবারের সদস্যরা জানান, বুবির বাবা-মা দুজনই বাক্প্রতিবন্ধী ছিলেন। তাঁদের আট সন্তানের মধ্যে সাতজনই বাক্প্রতিবন্ধী হয়ে জন্মগ্রহণ করেন। বুবিসহ তিন ভাই-বোন মারা গেছেন। জীবিত পাঁচ ভাই-বোনের সবাই বাক্প্রতিবন্ধী।
স্বজনদের ভাষ্য, বিয়ের দেড় বছরের মাথায় বুবির স্বামীর মৃত্যু হয়। তাদের একমাত্র কন্যাসন্তানও জন্মের পরপরই মারা যায়। এরপর তিনি বাবার বাড়িতেই থাকতেন। প্রায় ২৫ বছর আগে ছোট বোনের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে যান।
এরপর আর তার কোনো খোঁজ মেলেনি। তিন বছর ধরে খোঁজাখুঁজির পর পরিবারও আশা ছেড়ে দেয়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ছবি দেখে তারা নিশ্চিত হন, নিহত নারীই তাদের হারিয়ে যাওয়া ওয়াহিদা বেগম।
বুবির ছোট বোনের স্বামী সৈকত ইসলাম বলেন, ‘অনেকে বলছেন, আমরা নাকি টাকার লোভে এসেছি। যদি তার কোনো টাকা থেকে থাকে, তা স্থানীয় মসজিদ, মাদ্রাসা বা এতিমখানায় দিয়ে দেওয়া হোক। সেই টাকার প্রতি আমাদের কোনো দাবি নেই। ২৫ বছর পর তার কবরটা দেখতে পেরেছি, এটাই আমাদের সবচেয়ে বড় সান্ত্বনা।’
রেলওয়ে পুলিশ ও স্টেশন সূত্র জানায়, প্রায় ২৫ বছর আগে একদিন ট্রেন থেকে নেমে মেথিকান্দা স্টেশনেই থেকে যান ববি বেগম। এরপর স্টেশনের পরিত্যক্ত একটি কক্ষই হয়ে ওঠে তার আশ্রয়। প্ল্যাটফর্ম ঝাড়ু দেওয়া, শৌচাগার পরিষ্কারসহ বিভিন্ন পরিচ্ছন্নতার কাজ করতেন তিনি। যাত্রী ও স্থানীয়দের দেওয়া সামান্য অর্থে দিন চলত তার। দীর্ঘদিন ধরে জমিয়েও রেখেছিলেন কিছু টাকা।
গত ৪ জুলাই দিবাগত রাত ২টার দিকে কয়েকজন বুবির কাছে টাকা দাবি করে। টাকা দিতে অস্বীকৃতি জানালে দুর্বৃত্তরা তাকে পিটিয়ে গুরুতর আহত করে এবং তার কাছ থেকে লুকিয়ে রাখা প্রায় ৪০ হাজার টাকা লুট করে পালিয়ে যায়। পরদিন সকালে আহত বুবিকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
পরে ৭ জুলাই রাতে রায়পুরা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স থেকে তাকে নরসিংদী সদর হাসপাতালে নেওয়ার পথে তিনি মারা যান।
এ ঘটনায় ৬ জুলাই রাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে মামলা করা হয়। পরে ববি মারা গেলে এটি হত্যা মামলায় রূপ নেয় বলে জানিয়েছে র্যাব।
মামলায় এ পর্যন্ত সাকিব মিয়া, ইলিয়াছ মিয়া, বিল্লাল মিয়া, দ্বীন ইসলাম ও রিফাত মিয়াসহ পাঁচজনকে গ্রেপ্তার করেছে যৌথ বাহিনী।
রোববার নরসিংদীর আদালত তাদের প্রত্যেকের তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন।
ময়নাতদন্ত শেষে গত বুধবার রাতে মেথিকান্দা স্টেশনে বুবির জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে স্টেশনসংলগ্ন নুরপুর সামাজিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।