শিরোনাম
প্রকাশ: ২২:০৩, ৩০ জুলাই ২০২৬
দেশের আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থার সম্প্রসারণ এবং যানজট নিরসনে ঢাকা শহরে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেল প্রকল্পে অতিরিক্ত খরচের অভিযোগ উঠেছে প্রধান উন্নয়ন সহযোগী জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থার (জাইকা) বিরুদ্ধে।
কারিগরি সহায়তা থেকে শুরু করে ঋণ প্রদান এবং প্রকল্প বাস্তবায়নÑ সব ক্ষেত্রেই শুরু থেকে সংস্থাটি ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত রয়েছে। তবে সাম্প্রতিক সময়ে অন্যান্য দেশের সঙ্গে তুলনামূলক নির্মাণব্যয় বিশ্লেষণে এই অতিরিক্ত খরচ নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে এবং বিষয়টি মূল্যায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সচিবালয়ে অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা সভায় জানানো হয়েছে, পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের বেঙ্গালুরুতে প্রতি কিলোমিটার মেট্রোরেল নির্মাণে খরচ হয় ৮১ মিলিয়ন ডলার এবং চেন্নাইতে ৮৪ মিলিয়ন ডলার। অথচ বাংলাদেশে জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেলে প্রতি কিলোমিটারের জন্য খরচ হচ্ছে ১৮২ মিলিয়ন ডলার।
সচিবালয়ে গত ২০ মে অনুষ্ঠিত সভায় অংশ নেওয়া অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগের সচিব শাহরিয়ার কাদের সিদ্দিকীর কাছে জাইকার খরচ বাড়ানোর বিষয়টি জানতে চাওয়া হলে তিনি প্রতিদিনের বাংলাদেশকে বলেন, বিভিন্ন দেশের মেট্রোরেলের তুলনায় জাইকার অর্থায়নে বাস্তবায়নাধীন মেট্রোরেলের খরচ বেশি। বিষয়টি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলছে।
এক প্রশ্নের জবাবে তিনি আরও বলেন, এতদিন মেট্রোরেল প্রকল্পে জাইকার পাশাপাশি এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি) এবং দক্ষিণ কোরিয়া যুক্ত থাকলেও এবার নতুন করে বিশ্বব্যাংক অর্থায়নে যুক্ত হতে যাচ্ছে। মেট্রোরেল লাইন-২-এর সম্ভাব্যতা সমীক্ষা প্রকল্পের জন্য অনুদান দিতে প্রাথমিক আগ্রহ প্রকাশ করছে বিশ্বব্যাংক। শুধু তাই নয়, পরবর্তীতে মূল প্রকল্পে বিনিয়োগের ক্ষেত্রেও তাদের প্রবল ইচ্ছা রয়েছে।
ভারতের মেট্রো নির্মাণ ব্যয় তুলনামূলক কম হওয়ার কারণ হিসেবে নিজস্ব উৎপাদিত কোচ, ট্রেন কন্ট্রোল সিস্টেম ও নিজস্ব টেকনোলজি সাপোর্ট ব্যবহার এবং ভূমি অধিগ্রহণ ব্যয় কম থাকাকে উল্লেখ করা হয়েছে। এই বিপুল ব্যয়ের বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখতে আন্তর্জাতিক মানের প্রাইজ কনসালটেন্ট নিয়োগ করে প্রাইজ নেগোশিয়েট করা হবে বলে বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
জানা গেছে, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় ঢাকা ম্যাস ট্রানজিট কোম্পানি লিমিটেডের (ডিএমটিসিএল) বাস্তবায়নাধীন ও প্রক্রিয়াধীন প্রকল্পগুলোর সার্বিক অগ্রগতি পর্যালোচনার জন্যই মূলত এই বিশেষ বৈঠকটি আহ্বান করা হয়েছিল। এতে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ আবদুর রহিম সাকিও উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মেট্রোরেলগুলোর বাস্তবায়ন অগ্রগতি, বিদ্যমান চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বলে সভায় অংশ নেওয়া একাধিক কর্মকর্তা নিশ্চিত করেছেন।
ডিপিপির তুলনায় অতিরিক্ত দর
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের আওতায় বাস্তবায়িত এমআরটি লাইন-১ এবং এমআরটি লাইন-৫ (নর্দান) রুটের বিভিন্ন প্যাকেজের মূল্যায়িত দর অনুমোদিত উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবের (ডিপিপি) প্রাক্কলিত মূল্যের চেয়ে বেশি। এর ফলে বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহণে দেরি হচ্ছে এবং কাজের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে।
ডিএমটিসিএলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ২০১৮ সালের সম্ভাব্যতা সমীক্ষার আলোকে ডিপিপি তৈরি হলেও দাপ্তরিক প্রাক্কলন তৈরি করা হয় ২০২৩-২০২৫ সালের মধ্যে। এই সময়ের ব্যবধানে ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য অবচয় ঘটেছে প্রায় ৪৫ শতাংশ (২০১৯-২০২৫), এবং আন্তর্জাতিক মুদ্রাস্ফীতির কারণে নির্মাণ সামগ্রীর অত্যাবশ্যকীয় উপাদানের দাম গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এ ছাড়া ডিটেইল ডিজাইনের পর কাজের পরিধি পরিবর্তনের কারণে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ। অর্থাৎ সার্বিকভাবে দাপ্তরিক প্রাক্কলনের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে গড়ে প্রায় ৬৫ শতাংশ।
প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধির সম্ভাব্য কারণ হিসেবে ঠিকাদারদের পক্ষ থেকে কাজ বাস্তবায়নকালীন অতিরিক্ত ঝুঁকি বিবেচনা, কিছু অংশে টানেলের অত্যাধিক গভীরতা এবং কোন কোন স্টেশনের দৈর্ঘ্য বৃদ্ধির ফলে নির্মাণ ব্যয় বৃদ্ধি পাওয়ার কথা বলা হয়েছে। পাশাপাশি মেকানিক্যাল, ইলেকট্রিক্যাল, প্লাম্বিং এবং ফায়ার ফাইটিং যন্ত্রপাতিতে ইউরোপিয়ান স্ট্যান্ডার্ড বিবেচনা করায় ব্যয় আরও বেড়েছে। এই প্রেক্ষাপটে দর যাচাইয়ের জন্য ইতোমধ্যে কাজ শুরু করেছে একটি বিশেষ কমিটি।
বাড়তি ব্যয় ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
বাড়তি ব্যয় প্রসঙ্গে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়োদ সাকি বলেছেন, বিভিন্ন দেশ থেকে ঋণ সহায়তায় নেওয়া প্রকল্পগুলোতে দক্ষতা উন্নয়নমূলক কম্পোনেন্ট থাকা জরুরি এবং চলমান মেট্রো প্রকল্পে বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা উচিত। প্রস্তাবিত এমআরটি লাইন-৫ (সাউদার্ন রুট) প্রকল্পটিতে এডিবি ও দক্ষিণ কোরিয়া সরকারের উন্নয়ন সহযোগী সংস্থার যৌথ অর্থায়ন করার প্রস্তাব করা হয়েছে, ফলে ডিপিপি অনুমোদন করে প্রকল্পের কাজটি এগিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এর মাধ্যমে চলমান প্রকল্পের সঙ্গে আসন্ন প্রকল্পের গুণগত দিক ও ব্যয়ের তুলনামূলক পার্থক্য যাচাই করা সম্ভব হবে।
সংশোধিত স্ট্র্যাটেজিক ট্রান্সপোর্ট প্ল্যান (আরএসটিপি) অনুযায়ী ঢাকা শহরের যানজট দূর করতে পাবলিক ট্রান্সপোর্টেশন নেটওয়ার্ক হিসেবে মোট ৬টি ম্যাস র্যাপিড ট্রানজিট (এমআরটি) লাইন নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে এমআরটি লাইন-৬-এর মতিঝিল-কমলাপুর অংশ ব্যতীত উত্তরা হতে কমলাপুর পর্যন্ত পুরো লাইনে বাণিজ্যিক কার্যক্রম সফলভাবে চলমান রয়েছে।
এ ছাড়া এমআরটি লাইন-১ (বিমানবন্দর থেকে কমলাপুর স্টেশন এবং নতুন বাজার থেকে পূর্বাচল ডিপো পর্যন্ত ৩১ দশমিক ২৪১ কিমি) এবং এমআরটি লাইন-৫ নর্দান রুট (হেমায়েতপুর থেকে ভাটারা পর্যন্ত ২০ কিমি) প্রকল্পের নির্মাণ কার্যক্রম বর্তমানে চলমান রয়েছে। অগ্রাধিকারপ্রাপ্ত প্রকল্প হিসেবে এমআরটি লাইন-৫ সাউদার্ন রুট (গাবতলী থেকে দাশেরকান্দি পর্যন্ত ১৭ দশমিক ২ কিমি) নির্মাণের জন্য প্রাক-সম্ভাব্যতা সমীক্ষা, বেসিক ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন, ডিটেইল্ড ডিজাইন, টেন্ডার সহায়তা, ভূমি অধিগ্রহণ প্ল্যান ও পুনর্বাসন অ্যাকশন প্ল্যান তৈরির কাজ চলছে। এডিবির অর্থায়নে একটি কারিগরি সহায়তা প্রকল্পের আওতায় এই কাজ শেষ হয়েছে এবং মূল বিনিয়োগ প্রকল্পটি বর্তমানে এনইসি-একনেক ও সমন্বয় অনুবিভাগে রয়েছে।
পাশাপাশি এমআরটি লাইন-২ এবং এমআরটি লাইন-৪ প্রকল্পগুলোর বৈদেশিক অর্থায়ন প্রাপ্তির জন্য ডিপিপি ও পিডিপিপি তৈরির কাজ বিভিন্ন পর্যায়ে রয়েছে। প্রকল্পের ব্যয় ও গুণগত মান যাচাই এবং সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের মাধ্যমে দ্রুত কাজ এগিয়ে নিতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নিরলসভাবে কাজ করে যাচ্ছে।