শিরোনাম
প্রকাশ: ১২:৪০, ১৬ জুলাই ২০২৬
একসময় যেসব গভীর নলকূপ, ওভারহেড ট্যাংক ও পাম্পহাউসের মাধ্যমে সৈয়দপুর রেলওয়ে স্টাফ কোয়ার্টারে বসবাসকারী শত শত পরিবারের ঘরে পৌঁছানো হতো সুপেয় পানি, আজ সেগুলোই পরিণত হয়েছে মরিচাধরা লোহার স্তূপে। প্রায় চার দশক ধরে অচল পড়ে থাকা এই পানি সরবরাহ ব্যবস্থা এখন শুধু একটি পরিত্যক্ত অবকাঠামো নয়, বরং রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, প্রশাসনিক উদাসীনতা ও অব্যবস্থাপনার এক নীরব সাক্ষী।
খোলা আকাশের নিচে বছরের পর বছর পড়ে থেকে নষ্ট হচ্ছে পানির ট্যাংক, গভীর নলকূপ, বৈদ্যুতিক মোটর, পাইপলাইন ও মূল্যবান যন্ত্রপাতি। এরই মধ্যে অধিকাংশ পাম্পহাউস ও আশপাশের রেলভূমি অবৈধ দখলে চলে গেছে। সংশ্লিষ্টদের হিসাব অনুযায়ী, এই পরিত্যক্ত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার অবকাঠামো, যন্ত্রপাতি ও দখল হওয়া স্থাপনাসহ রাষ্ট্রীয় সম্পদের বর্তমান মূল্য প্রায় ১৫০ কোটি টাকা।
রেলওয়ে সূত্র জানায়, ১৮৭০ সালে দেশের বৃহত্তম সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা প্রতিষ্ঠার পর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের আবাসনের জন্য নির্মাণ করা হয় ২ হাজার ৬৭০টি স্টাফ কোয়ার্টার। এর মধ্যে ১৫০টি বাংলো ও ৭০০টি দ্বিকক্ষবিশিষ্ট কোয়ার্টারে নিরাপদ পানি পৌঁছে দিতে শহরের ইসলামবাগ (শেরু হোটেল মোড়), চিনি মসজিদ, গোলাহাট, পুরাতন বাবুপাড়া, সাহেবপাড়া ও মিস্ত্রিপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় স্থাপন করা হয় ৮টি উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন গভীর নলকূপ এবং ৫০ হাজার লিটার ধারণক্ষমতার ৮টি ওভারহেড পানির ট্যাংক। পুরো ব্যবস্থাটি পরিচালনা করত রেলওয়ের সেতু, বিদ্যুৎ ও কার্য (ওয়ার্কস) প্রকৌশল বিভাগ।
কিন্তু প্রায় ৪০ বছর আগে অজ্ঞাত কারণে এই কেন্দ্রীয় পানি সরবরাহ ব্যবস্থা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর আর কখনও তা সচল করা হয়নি।
বর্তমানে সৈয়দপুর রেলওয়ে কারখানা, রেলস্টেশন ও বিভিন্ন দপ্তরে ৩ হাজার ৮৩২টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন মাত্র প্রায় ৮৭০ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী। তাঁদের বড় একটি অংশ এখনও রেলওয়ের আবাসিক কোয়ার্টারে বসবাস করলেও মৌলিক নাগরিক সুবিধা হিসেবে সুপেয় পানির নিশ্চয়তা নেই।
সরেজমিনে বিভিন্ন পাম্পহাউস ঘুরে দেখা যায়, অধিকাংশ ভবনের দেয়াল ভেঙে পড়ছে, চারপাশ আগাছা ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে। বিশালাকার ওভারহেড ট্যাংকগুলো মরিচা ধরে ক্ষয়ে যাচ্ছে। বহু জায়গায় মোটর, ভালভ, পাইপের সংযোগ ও অন্যান্য মূল্যবান যন্ত্রাংশ খুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। কোথাও কোথাও পাম্পহাউসকে গুদামঘর, বসতঘর কিংবা ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন নজরদারি না থাকায় প্রভাবশালী মহল রেলওয়ের মূল্যবান জমিও দখল করে নিয়েছে।
অথচ পানি সরবরাহ বন্ধ থাকলেও কোয়ার্টারবাসীদের ভোগান্তি থেমে নেই। প্রতিদিন রান্না, গোসল ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজের জন্য দূর থেকে পানি সংগ্রহ করতে হচ্ছে। অনেকেই ব্যক্তিগত খরচে টিউবওয়েল স্থাপন করেছেন। তারপরও প্রতি মাসে বেতন থেকে বাসাভাড়ার পাশাপাশি পানিসহ বিভিন্ন সেবার বিল কেটে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ বাসিন্দাদের।
ইসলামবাগ এলাকার রেল কোয়ার্টারের বাসিন্দা আতিকুল ইসলাম বলেন, "নিজেদের টাকায় টিউবওয়েল বসিয়ে পানি তুলতে হচ্ছে। অথচ বেতন থেকে নিয়মিত পানির বিল কাটা হচ্ছে। দীর্ঘদিন ধরেই এই দুর্ভোগ চলছে, কিন্তু কেউ সমাধানের উদ্যোগ নিচ্ছে না।"
নাম প্রকাশ না করার শর্তে রেলওয়ের এক ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী বলেন, "কোয়ার্টারে বসবাসকারী পরিবারগুলোর জন্য সুপেয় পানির কোনো কেন্দ্রীয় ব্যবস্থা নেই। বহু বছর ধরে এই সমস্যা চললেও কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি।"
রেলওয়ে শ্রমিক ইউনিয়নের কারখানা শাখার সাধারণ সম্পাদক শেখ রোবায়েতুর রহমান বলেন, "রেলের কোটি কোটি টাকার সম্পদ চোখের সামনে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। অবৈধ দখলদারদের কারণে অনেক স্থাপনা হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে। দ্রুত দখলমুক্ত করে পানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালু না করলে রাষ্ট্রের আরও বড় ক্ষতি হবে।"
এ বিষয়ে রেলওয়ের ঊর্ধ্বতন উপসহকারী প্রকৌশলী (বিদ্যুৎ) চন্দন কুমার সরকার বার্তা২৪.কমকে বলেন, "তীব্র জনবল সংকটের কারণে পাম্পগুলো চালু রাখা সম্ভব হয়নি।"
কৃতজ্ঞতা: বার্তা ২৪