বাংলাদেশ রেলওয়ের যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট সেতু ও সিডিআরপি-র মেগা প্রকল্পে গত নয় বছরের (২০১৫-১৬-২০২৪-২৫) দরপত্র জালিয়াতি, আর্থিক লুটপাটের বিভিন্ন চিত্র উঠে এসেছে অডিট বিভাগের বিশেষ নিরীক্ষায়। এছাড়া কমপ্লায়েন্স অডিট রিপোর্টে, রেলের শতকোটি টাকার জমি বেদখল করে প্রভাবশালী মহলের পকেট ভারীর সুনির্দিষ্ট প্রমাণও মিলেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন এসব অনিয়মের মাধ্যমে রাষ্ট্রের হাজার হাজার কোটি টাকা গচ্চা গেলেও অভিযুক্ত শীর্ষ কর্মকর্তা ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে এখনো দৃশ্যমান কোন ব্যবস্থা নেয়া হয়নি
অনুসন্ধানে জানা যায়, যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পে অডিট বিভাগের বিশেষ নিরীক্ষায় ৩৪টি গুরুতর আপত্তিতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়ম ধরা পড়েছে। নথিপত্র বলছে, চুক্তির শর্ত ভেঙে কাজের পরিমাণ কমানো এবং ইউনিট রেট বাড়িয়ে ঠিকাদারকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ায় রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে ১ হাজার ৭২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
এছাড়াও উচ্চ হারে চুক্তি করে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২ কোটি ৬ লাখ টাকা দেওয়া হয়েছে। এর বাইরে ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ নিশ্চিত না করেই ৪০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা এবং ড্রয়িং-ডিজাইন ও বিওকিউ ছাড়াই ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকার বিল ছাড় করা হয়েছে।
ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের নামেও গচ্চা গেছে ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রকল্প এলাকায় ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে আনা বিলাসবহুল গাড়িগুলোর কোনো হদিস মিলছে না।
এসব ঘটনায় যমুনা রেলসেতুর প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা ৩ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ বর্তমানে অনুসন্ধান করছে দুদক।
কালুরঘাটে ‘কৃষিবিদকে’ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার বানানোর অপচেষ্টা:
কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পে দরপত্র জালিয়াতির এক নতুন কৌশল দেখা গেছে। আন্তর্জাতিক ‘টিম লিডার’ পদের জন্য বাধ্যতামূলক শর্ত ছিল ‘বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ডিগ্রি। কিন্তু ‘স্যামবো-জেভি’ নামের প্রতিষ্ঠানটি এমন একজনের সিভি জমা দেয়, যার ডিগ্রি ‘বিএসসি ইন এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’। পিপিআর ও দাতা সংস্থা ইডিসিএফ-এর নীতিমালা অনুযায়ী মৌলিক যোগ্যতার ঘাটতি সংশোধনের সুযোগ না থাকলেও, প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান গত ৩ আগস্ট এক গোপন চিঠিতে কৃষিনির্ভর এই ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না, তা দরদাতার কাছে জানতে চান! এ ঘটনায় এক বিডার সরাসরি সচিবের কাছে জালিয়াতির লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন।
সিডিআরপি প্রকল্পে ‘ম্যাক্স’-প্রীতি ও দ্বৈত নীতি:
সিডিআরপি প্রকল্পের দরপত্রে ম্যাক্স নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামকে কাজ পাইয়ে দিতে দ্বৈত নীতির আশ্রয় নেওয়া হয়েছে। প্রকল্পের শর্ত অনুযায়ী বিডারের সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার ২২০ মিলিয়ন ডলার থাকার কথা থাকলেও ম্যাক্সের রয়েছে ২০৮.১৭ মিলিয়ন ডলার। সামান্য ঘাটতির কারণে অন্যান্য দরদাতাদের টেকনিক্যালি ‘নন-রেসপন্সিভ’ (বাতিল) করা হলেও, ম্যাক্সকে যোগ্য বিবেচনা করে প্রায় ১ হাজার ৪৬১ কোটি টাকা সাশ্রয়ের খোঁড়া যুক্তি দেখিয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের সম্মতি চাওয়ার প্রস্তাব করা হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এমন অযোগ্য প্রতিষ্ঠান কাজ পেলে প্রকল্পের গুণগত মান চরম ঝুঁকির মুখে পড়বে।
ক্ষমতা থাকলেও নীরব প্রকৌশলীরা, বেদখল শতকোটি টাকার জমি:
প্রকল্পের বাইরে খিলগাঁও এলাকায় রেলের শতকোটি টাকার জমি দখল করে ৫৬০টিরও বেশি স্থায়ী দোকান নির্মাণ করা হয়েছে। রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, সীমানা রক্ষা ও দখল রোধে বিভাগীয় প্রকৌশলীদের জেলা প্রশাসকের সমমর্যাদার ক্ষমতা দেওয়া আছে। কিন্তু বিপুল ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও মোটা অঙ্কের মাসোহারার বিনিময়ে নীরব রয়েছেন রেলের প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা।
এদিকে, মেগা প্রকল্প ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় এমন নজিরবিহীন দুর্নীতির বিষয়ে অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।
এ প্রসঙ্গে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রশিদ জানিয়েছেন, রেলওয়ের মেগা প্রকল্পের দুর্নীতির বিষয়ে কিছু তথ্য আমার কাছে এসেছে। এটি তদন্ত সাপেক্ষে দোষী প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অন্যদিকে, পুরো প্রক্রিয়াটির শুরু থেকেই তদন্তের দাবি জানিয়েছেন নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে। তিনি বলেন, এখানে শুরু থেকেই অনিয়ম হয়েছে। তথ্য গোপন ও দরপত্রের শর্ত লঙ্ঘনসহ জাল-জালিয়াতির মাধ্যমে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও বিদেশি টিম লিডারকে যোগ্য বিবেচিত করে এত বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া বড় ধরনের অপরাধ। বৈদেশিক ঋণ ও জনগণের করের টাকার স্বচ্ছতা নিশ্চিতে তিনি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।