ঢাকা, শুক্রবার, ০২ অক্টোবর ২০২৬

১৬ আশ্বিন ১৪৩৩

মালয়েশিয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই চালু হচ্ছে ইসিআরএল ট্রেন সেবা

রেল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১২:২৪, ১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৪, ১ অক্টোবর ২০২৬

মালয়েশিয়ায় নির্ধারিত সময়ের আগেই চালু হচ্ছে ইসিআরএল ট্রেন সেবা

মালয়েশিয়ার বহুল প্রতীক্ষিত পূর্ব উপকূলীয় রেল সংযোগ (ইসিআরএল) আগামী ডিসেম্বরের মাঝামাঝি সময়ে যাত্রী পরিবহন শুরু করতে পারে। প্রকল্পটির যাত্রীসেবা শুরুর মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৭ সালের জানুয়ারি। তবে নির্ধারিত সময়ের আগেই প্রথম ধাপে ট্রেন চলাচল শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

গত ২৩ সেপ্টেম্বর মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী দাতুক সেরি আনোয়ার ইব্রাহিম বলেছেন, দেশে নতুন কোনো দ্রুতগতির রেল প্রকল্পে যাওয়ার আগে সরকার ইসিআরএল প্রকল্পের কাজ সম্পন্ন করতে চায়।

 

৬৬৫ কিলোমিটার দীর্ঘ বিদ্যুৎচালিত এই রেলপথ মালয়েশিয়ার পূর্ব উপকূলীয় রাজ্যগুলোর সঙ্গে ক্লাং উপত্যকার যোগাযোগে বড় পরিবর্তন আনবে। ইসিআরএল কেলান্তানের কোটা ভারু থেকে তেরেংগানু ও পাহাং হয়ে সেলাঙ্গরের পোর্ট ক্লাং পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।

ইসিআরএল প্রকল্পটি দুটি ধাপে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রথম ধাপে কেলান্তানের কোটা ভারু থেকে গোমবাক পর্যন্ত রেলপথ চালু হবে। এ অংশে যাত্রীসেবা শুরুর মূল লক্ষ্য ছিল ২০২৭ সালের জানুয়ারি। দ্বিতীয় ধাপে গোমবাক থেকে পোর্ট ক্লাং পর্যন্ত অংশ ২০২৮ সালের জানুয়ারিতে চালুর কথা রয়েছে।

 

পরিবহনমন্ত্রী অ্যান্থনি লোক আগস্টে জানিয়েছিলেন, প্রথম ধাপের কাজ ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। সরকার ডিসেম্বরের মাঝামাঝি থেকে যাত্রীসেবা চালুর জন্যও চাপ দিচ্ছে।

প্রথম ধাপে যাত্রী পরিবহনে ছয় কোচের ১১টি বৈদ্যুতিক ট্রেন ব্যবহার করা হবে। এসব ট্রেন তৈরি করেছে চায়না রেলওয়ে রোলিং স্টক করপোরেশন (সিআরআরসি) দালিয়ান।

মালয়েশিয়া রেল লিংক (এমআরএল) এসডিএন বিএইচডির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা দাতুক সেরি দারউইস আবদুল রাজাক সেপ্টেম্বরে বার্নামাকে জানান, ইসিআরএল চালু হলে কোটা ভারু থেকে গোমবাক পর্যন্ত সড়কপথে প্রায় সাত ঘণ্টার যাত্রা কমে প্রায় চার ঘণ্টায় নেমে আসবে।

অ্যান্থনি লোকের তথ্য অনুযায়ী, গোমবাক থেকে কুয়ালার তেরেংগানু যেতে প্রায় তিন ঘণ্টা এবং দ্রুতগতির সেবায় গোমবাক থেকে কুয়ান্তান যেতে সময় লাগবে মাত্র ১ ঘণ্টা ৩৫ মিনিট।

 

পুরো ইসিআরএল নেটওয়ার্কে থাকবে ২০টি স্টেশন। এর মধ্যে ১০টি শুধু যাত্রীসেবার জন্য এবং বাকি ১০টি যাত্রী ও পণ্য উভয় পরিবহনের জন্য ব্যবহৃত হবে।

 

ছয় কোচের প্রতিটি বৈদ্যুতিক ট্রেনে সর্বোচ্চ ৪২৫ জন যাত্রী বহন করা যাবে। সব আসন অর্থনৈতিক শ্রেণির হিসেবে বিন্যাস করা হলে এই সক্ষমতা পাওয়া যাবে।

ইসিআরএল ট্রেন সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। ট্রেনে থাকবে শৌচাগার, লাগেজ রাখার ব্যবস্থা, খাবার ও পানীয় বিক্রির কাউন্টার, নামাজের কক্ষ ও অজুর ব্যবস্থা। প্রতিবন্ধী যাত্রীদের জন্যও থাকবে বিশেষ সুবিধা।

 

অ্যান্থনি লোক জানিয়েছেন, ট্রেনের চলাচলের সংখ্যা বাড়ানো হলে ভবিষ্যতে ইসিআরএল প্রতিদিন সর্বোচ্চ ১০ হাজার যাত্রী পরিবহন করতে পারবে।

ইসিআরএল চালুর আগে রেলপথের সম্ভাব্য ত্রুটি শনাক্ত করতে এরই মধ্যে ব্যাপক পরিদর্শন ও পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল শুরু হয়েছে।

১৮ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ৪০টির বেশি সমন্বিত পরিদর্শন ট্রেনের পরীক্ষামূলক চলাচল এবং ১২টি পণ্যবাহী ট্রেনের পরীক্ষা সম্পন্ন হয়েছে বলে সম্প্রতি দ্য এজ মালয়েশিয়াকে জানিয়েছেন সিসিসিইসিআরএলের প্রকল্প পরিচালক ও জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা কং চি।

পরীক্ষামূলক চলাচলের সময় ট্রেনের সর্বোচ্চ গতি ঘণ্টায় ১৭৬ কিলোমিটার পর্যন্ত তোলা হয়েছে। যাত্রীবাহী ট্রেনের নির্ধারিত সর্বোচ্চ পরিচালনগত গতি ঘণ্টায় ১৬০ কিলোমিটার।

সেপ্টেম্বরের শেষ নাগাদ কোটা ভারু থেকে গোমবাক পর্যন্ত পুরো পথে পরীক্ষামূলক ট্রেন চলাচল শেষ করার লক্ষ্য রয়েছে। এরপর অক্টোবর থেকে শুরু হওয়ার কথা বাধ্যতামূলক ‘ফল্ট-ফ্রি রান’ বা ত্রুটিমুক্ত চলাচল পরীক্ষা।
এদিকে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসিআরএলের ভাড়া ঘোষণা করতে পারে পরিবহন মন্ত্রণালয়।

ইসিআরএল শুধু যাত্রী পরিবহনের জন্য নয়, পণ্য পরিবহনের জন্যও ব্যবহৃত হবে। এজন্য রেলপথে বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনচালিত পণ্যবাহী ট্রেন পরিচালনা করা হবে।

নিউ স্ট্রেইটস টাইমসের গত বছরের ডিসেম্বরের এক প্রতিবেদনের তথ্য অনুযায়ী, পণ্যবাহী ট্রেন সর্বোচ্চ ঘণ্টায় ৮০ কিলোমিটার গতিতে চলতে পারবে। প্রতিটি ট্রেনে সর্বোচ্চ ৪৫টি ওয়াগন বা পণ্যবাহী বগি যুক্ত করা যাবে। একবারে সর্বোচ্চ ৩ হাজার ৫০০ টন পণ্য পরিবহন করা সম্ভব হবে।

বৈদ্যুতিক ইঞ্জিনগুলোতে বুদ্ধিমান মানব-মেশিন যোগাযোগ ব্যবস্থা এবং মিলিসেকেন্ড পর্যায়ের নিরাপত্তা পর্যবেক্ষণ প্রযুক্তি রয়েছে। এতে ব্রেক ব্যবস্থা, অগ্নিনিরাপত্তা এবং উচ্চ ভোল্টেজের বৈদ্যুতিক নিরোধকসহ গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করা হবে।

ইসিআরএল কেলান্তানের অর্থনৈতিক রূপান্তরের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে বলে মন্তব্য করেছেন রাজ্যের সুলতান সুলতান মুহাম্মদ পঞ্চম। নতুন এই রেল যোগাযোগ কাজে লাগিয়ে বাজার সম্প্রসারণ, পণ্য পরিবহনে দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নতুন বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ তৈরির ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।

মঙ্গলবার কোটা ভারুর ইস্তানা বালাই বেসারে নিজের ৫৭তম জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে দেওয়া ভাষণে তিনি এ আহ্বান জানান।

সুলতান মুহাম্মদ পঞ্চম বলেন, ২০২৭ সালের জানুয়ারি থেকে ইসিআরএল চালুর কথা রয়েছে। তাই শুরু থেকেই এ অবকাঠামোর সর্বোচ্চ সুবিধা নিশ্চিত করতে রাজ্য ও কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, রাজ্য সরকারকে কেন্দ্রীয় সরকারের সহযোগিতায় এই অবকাঠামো কাজে লাগাতে হবে। এর মাধ্যমে লজিস্টিক ব্যবস্থার দক্ষতা বাড়ানো, বাজারে প্রবেশাধিকার সম্প্রসারণ এবং প্রতিযোগিতামূলক নতুন বিনিয়োগ গন্তব্য হিসেবে কেলান্তানের আকর্ষণ আরও শক্তিশালী করা সম্ভব।

ইসিআরএলকে ঘিরে সংশ্লিষ্ট সড়ক অবকাঠামো উন্নয়নের ওপরও গুরুত্ব দেন সুলতান। বিশেষ করে বান্দার বাহারু তুনজংয়ের ট্রানজিটভিত্তিক উন্নয়নকেন্দ্র এবং পাসির পুতেহের চেরাং তুলি কার্গোভিত্তিক উন্নয়নকেন্দ্রের সঙ্গে সংযোগকারী প্রধান সড়কগুলো উন্নীত করার জন্য কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

সুলতান মুহাম্মদ পঞ্চম বলেন, অবকাঠামোগত উন্নয়নের এ সুযোগ এমন সময়ে এসেছে, যখন কেলান্তানের অর্থনীতি স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। ২০২৫ সালে রাজ্যের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৪ দশমিক ১ শতাংশে উন্নীত হয়েছে, যা ২০২৪ সালের ৩ দশমিক ৩ শতাংশের তুলনায় বেশি।

রাজ্যের অর্থনীতিতে সবচেয়ে বড় অবদান রাখছে সেবা খাত। মোট অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ৭১ দশমিক ৮ শতাংশ এ খাত থেকে এসেছে। এরপর কৃষি খাতের অবদান ১৯ দশমিক ৮ শতাংশ।

তিনি জানান, মাচাং ও তোক বালিতে দুটি নতুন শিল্পাঞ্চলের কার্যক্রম আগামী বছর শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। বড় উন্নয়ন প্রকল্পের মাধ্যমে নির্মাণ খাত এবং বিদ্যমান প্রাকৃতিক সম্পদভিত্তিক খনিজ খাতেও প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে।

কেলান্তানকে পূর্ব উপকূলীয় অঞ্চলের ‘নীল অর্থনীতির’ অন্যতম নেতৃত্বদানকারী রাজ্যে পরিণত করার সম্ভাবনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। উপকূলীয় সম্পদ, সামুদ্রিক প্রতিবেশ, মৎস্য ও লজিস্টিক খাতকে টেকসইভাবে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্ব দেন সুলতান।

এক্ষেত্রে পূর্ব উপকূলীয় অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন পরিষদকে তোক বালি শিল্পপার্ককে কেন্দ্র করে অর্থনৈতিক উন্নয়নের ভিত্তি শক্তিশালী করার ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান তিনি।

পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ সবুজ অর্থনীতির সম্ভাবনা কাজে লাগানোর উদ্যোগকেও স্বাগত জানান সুলতান। তার মতে, এ ধরনের উদ্যোগ কেলান্তানের জন্য নতুন রাজস্বের উৎস তৈরি করতে পারে।

কেলান্তানকে দেশের অন্যতম খাদ্যকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন সুলতান মুহাম্মদ পঞ্চম। বিশেষ করে রানতাউ পাঞ্জাংকে কৃষি, পশুপালন, কৃষিভিত্তিক পর্যটন ও কৃষিপণ্যের মূল্য সংযোজনকারী শিল্পের মাধ্যমে কৃষি-খাদ্য খাতের রূপান্তরের কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার সম্ভাবনার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

পর্যটন খাত নিয়েও আশাবাদ ব্যক্ত করেন সুলতান। তার দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে কেলান্তানে ১ কোটি ২০ লাখ দেশীয় দর্শনার্থী এবং ৬৬ লাখ পর্যটক ভ্রমণ করেছেন।

কেলান্তানের সঙ্গে জাকার্তা ও সিঙ্গাপুরের আন্তর্জাতিক আকাশপথ চালুর উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়ে ভবিষ্যতে আরও নতুন আন্তর্জাতিক রুট চালুর প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন তিনি।

একই সঙ্গে স্টং জিওপার্কের জাতীয় জিওপার্কের মর্যাদা ধরে রাখার পাশাপাশি ভবিষ্যতে এটিকে ইউনেসকো গ্লোবাল জিওপার্ক হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান।

সুলতান মুহাম্মদ পঞ্চম মানবসম্পদ উন্নয়নের ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন। ধর্মীয় শিক্ষা, সাধারণ শিক্ষা এবং কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি। জাতীয় তাহফিজ কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাবকেও স্বাগত জানান।

২০২৮ সালের মালয়েশিয়ান গেমস (সুকমা) সামনে রেখে রাজ্যের ক্রীড়া উন্নয়ন আরও জোরদার করার আহ্বান জানান তিনি।

জনকল্যাণের ক্ষেত্রে পরিবেশের পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে স্থানীয় কর্তৃপক্ষকে জনসেবা ও পরিচ্ছন্নতার মান আরও উন্নত করার আহ্বান জানান সুলতান।

কেলান্তানে ২০০৭ সালের কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনপরিচ্ছন্নতা আইন (আইন ৬৭২) বাস্তবায়নের পক্ষেও মত দেন তিনি। এর মাধ্যমে কঠিন বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও জনপরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম আরও সুশৃঙ্খল ও কার্যকর হবে বলে আশা প্রকাশ করেন।

শেষে কেলান্তানের জনগণকে রাজ্যের সমৃদ্ধি ও শান্তির জন্য সম্মিলিতভাবে প্রার্থনা করার আহ্বান জানান সুলতান মুহাম্মদ পঞ্চম। একই সঙ্গে সব ধরনের দুর্যোগ ও বিপদ থেকে কেলান্তানকে রক্ষার জন্য প্রার্থনা করারও আহ্বান জানান তিনি।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন