শিরোনাম
মনিরুজ্জামান মনির
প্রকাশ: ১৩:২০, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৩:২০, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
মনিরুজ্জামান মনির: সাংবাদিক ও কলামিস্ট
তবে এই উদ্যোগের মধ্যেই সামনে এসেছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—বাংলাদেশ রেলওয়ের ঐতিহ্য কি শুধু বইয়ের পাতা, পুরোনো ছবি আর ইতিহাসের বর্ণনায় সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি এই প্রতিষ্ঠানের ঐতিহ্য, সম্পদ, কর্মসংস্কৃতি এবং কর্মরত ও অবসরপ্রাপ্ত কর্মচারীদের অধিকারও যথাযথভাবে সংরক্ষিত হবে?
রেলওয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অধিকার উপেক্ষা করে বাংলাদেশ রেলওয়ের ঐতিহ্য কীভাবে অটুট থাকে? যে কর্মচারীদের শ্রম, ঘাম, ত্যাগ ও নিষ্ঠায় রেলওয়ের চাকা সচল থাকে, তাঁদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদাকে উপেক্ষা করে ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হলে সেই উদ্যোগের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
ঐতিহ্য ধ্বংস করে ঐতিহ্যের স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ—এ যেন বাস্তবতার সঙ্গে নির্মম পরিহাস! রেলওয়ের ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে স্মারক গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ অবশ্যই ইতিবাচক হতে পারে। কিন্তু ঐতিহ্য সংরক্ষণ বলতে শুধু অতীতের গৌরবগাথা লিখে রাখা বোঝায় না। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে ঐতিহাসিক স্থাপনা, পুরোনো রেলসম্পদ, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি, কর্মচারীদের অবদান এবং তাঁদের ন্যায্য অধিকার রক্ষার প্রশ্নও।
বাংলাদেশ রেলওয়ের শতবর্ষের ইতিহাস গড়ে উঠেছে শুধু নীতিনির্ধারক কিংবা উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের হাত ধরে নয়; এর পেছনে রয়েছে অসংখ্য তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীর নিরলস শ্রম। রেললাইনের নিরাপত্তা, ট্রেন পরিচালনায় সহায়তা, স্টেশনের দৈনন্দিন কার্যক্রম, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি কাজ এবং যাত্রীসেবাসহ রেলওয়ের বহুমুখী কার্যক্রমে এসব কর্মচারীর অবদান অনস্বীকার্য। তাঁদের শ্রম ও অবদান বাদ দিয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের ইতিহাস কখনো পূর্ণাঙ্গ হতে পারে না।
অথচ কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, পদোন্নতি, শূন্য পদে নিয়োগ, জনবলসংকট এবং দীর্ঘদিন ধরে অস্থায়ী বা প্রকল্পভিত্তিক ব্যবস্থায় কাজ করা কর্মীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বিভিন্ন সময় প্রশ্ন উঠেছে। বিশেষ করে প্রকল্পের আওতায় কিংবা অস্থায়ীভাবে নিয়োজিত গেটকিপার ও টিএলআর কর্মীদের চাকরির স্থায়িত্ব এবং তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দীর্ঘদিনের উদ্বেগ রয়েছে। এসব বিষয়ে প্রযোজ্য বিধিবিধান, কর্মীদের যোগ্যতা এবং সরকারি সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে কার্যকর সমাধান জরুরি।
আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, বাংলাদেশ রেলওয়ের তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের সন্তানদের নিয়োগের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য পোষ্য-সুবিধা ও নিয়োগবিধি নিয়ে দীর্ঘদিনের বিতর্ক এবং আইনি প্রশ্ন রয়েছে। সংশ্লিষ্ট নিয়োগবিধি, আদালতের নির্দেশনা ও বিচারাধীন বিষয়গুলোর যথাযথ নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কর্মচারীদের পরিবার ও তাঁদের সন্তানদের ন্যায্য অধিকার নিয়ে প্রশ্ন থাকলে তা উপেক্ষা না করে আইন ও বিধিবিধান অনুযায়ী সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে।
যে প্রতিষ্ঠানের কর্মচারীদের শ্রমে ঐতিহ্য সৃষ্টি হয়েছে, সেই কর্মচারীদের অধিকার ও মর্যাদা রক্ষা না করে ঐতিহ্য সংরক্ষণের দাবি কতটা পূর্ণতা পায়—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ঐতিহ্য কেবল পুরোনো ছবি, ঐতিহাসিক তথ্য কিংবা স্মারক গ্রন্থের পাতায় সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে শতবর্ষী রেলস্টেশন, ঐতিহাসিক ভবন, পুরোনো লোকোমোটিভ ও কোচ, রেলসেতু, রেলপথ, কর্মচারীদের শ্রম-ঘাম এবং দেশের যোগাযোগব্যবস্থায় রেলের দীর্ঘ অবদান। এসব ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি রেলওয়ের মানবসম্পদ, কর্মসংস্কৃতি এবং কর্মীদের অবদানও যথাযথভাবে নথিবদ্ধ করা প্রয়োজন।
একটি স্মারক গ্রন্থের মাধ্যমে রেলওয়ের গৌরবময় ইতিহাস, ঐতিহাসিক অর্জন এবং গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের অবদান নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা সম্ভব। কিন্তু সেই ইতিহাসের বাস্তব নিদর্শনগুলো যদি অবহেলা ও যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, আর ইতিহাস নির্মাণে অবদান রাখা কর্মচারীদের অধিকার ও মর্যাদা নিয়ে প্রশ্ন অমীমাংসিত থেকে যায়, তাহলে ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ অসম্পূর্ণই থেকে যাবে।
এ কারণে রেলপথ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনার দাবি রাখে। প্রথমত, রেলওয়ের ঐতিহাসিক স্থাপনা, পুরোনো লোকোমোটিভ, কোচ ও অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ নিদর্শন সংরক্ষণে সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দ্বিতীয়ত, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার, চাকরির নিরাপত্তা, পদোন্নতি এবং জনবলসংকটের বিষয়গুলো বিধিবিধান অনুযায়ী সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। তৃতীয়ত, পোষ্য-সুবিধা ও নিয়োগসংক্রান্ত বিরোধগুলো প্রযোজ্য আইন, নিয়োগবিধি এবং আদালতের নির্দেশনার আলোকে নিষ্পত্তির উদ্যোগ নিতে হবে। চতুর্থত, রেলওয়ের ইতিহাস রচনার ক্ষেত্রে মাঠপর্যায়ের কর্মচারীদের অবদান, তাঁদের সংগ্রাম, অভিজ্ঞতা ও কর্মজীবনের বাস্তবতাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে।
স্মারক গ্রন্থ প্রকাশনা কমিটির উদ্যোগের প্রতি সম্মান রেখেই বলা যায়, ইতিহাস সংরক্ষণকে কেবল প্রকাশনাকেন্দ্রিক আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ রাখা উচিত নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে একই সূত্রে গাঁথতে হলে ঐতিহাসিক সম্পদ সংরক্ষণ, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার বিষয়গুলোকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
বাংলাদেশ রেলওয়ের ঐতিহ্য কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর একক সম্পদ নয়; এটি জাতীয় ইতিহাসের অংশ। এই ঐতিহ্যের প্রকৃত নির্মাতা ও রক্ষকদের অবদান স্বীকার করা এবং তাঁদের ন্যায্য অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করা ছাড়া ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ পূর্ণতা পেতে পারে না।
ঐতিহ্য শুধু স্থাপনায় নয়, ঐতিহ্য মানুষের শ্রমে, ত্যাগে, অধিকার ও মর্যাদায়। তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারীদের অবদান ও অধিকার উপেক্ষা করে রেলওয়ের ঐতিহ্য সংরক্ষণের কথা বলা হলে সেই সংরক্ষণের দর্শন নিয়েই প্রশ্ন উঠবে।
স্মারক গ্রন্থ প্রকাশ হোক, রেলওয়ের গৌরবময় ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে পৌঁছে যাক। একই সঙ্গে ঐতিহাসিক স্থাপনা ও সম্পদ রক্ষা করা হোক, কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা হোক এবং রেলওয়ের প্রকৃত ইতিহাসে তাঁদের অবদান যথাযথভাবে স্থান পাক।
ঐতিহ্যকে শুধু বইয়ের পাতায় বন্দি নয়, বাস্তবেও সংরক্ষণ করুন। রেলওয়ের ঐতিহ্য রক্ষার অর্থ হোক—সম্পদ সংরক্ষণ, কর্মসংস্কৃতির মর্যাদা প্রতিষ্ঠা এবং কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করা।
লেখক :
মনিরুজ্জামান মনির
সাংবাদিক ও কলামিস্ট
সভাপতি, বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি