ঢাকা, শুক্রবার, ০৬ নভেম্বর ২০২৬

২১ কার্তিক ১৪৩৩

রেল ভবনে সাংবাদিকদের পুলিশের ভয় দেখানো অফিস সহকারী-সহায়কদের ক্ষমতার উৎস কোথায়?

রেল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ২২:৪৫, ৫ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২২:৪৫, ৫ নভেম্বর ২০২৬

রেল ভবনে সাংবাদিকদের পুলিশের ভয় দেখানো অফিস সহকারী-সহায়কদের ক্ষমতার উৎস কোথায়?

বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রশাসনিক প্রাণকেন্দ্র রেল ভবন। এখান থেকেই পরিচালিত হয় দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নীতিনির্ধারণী ও প্রশাসনিক কার্যক্রম। অথচ সেই রেল ভবনেই যদি সাংবাদিকদের পুলিশের ভয় দেখানো হয়, হুমকিমূলক কথা বলা হয় কিংবা পেশাগত দায়িত্ব পালনে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করা হয়, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—রেল ভবন কি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের প্রশাসনিক কার্যালয়, নাকি কিছু কর্মচারীর ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের জায়গা?

গত ৫ নভেম্বর ২০২৬, বৃহস্পতিবার, আনুমানিক দুপুর ১২টা ২৯ মিনিটে রেল ভবনে নিজের উপস্থিতিতে এমনই একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়েছি। সংশ্লিষ্ট অফিস সহকারী ও অফিস সহায়কের কথাবার্তা ও আচরণে হুমকির সুর এবং পুলিশের ভয় দেখানোর মতো বক্তব্য আমার নজরে এসেছে। ঘটনার সিসিটিভির ভিডিও ফুটেজও দেখলেই বুঝতে পারবেন।

আপাতত সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের নাম প্রকাশ করছি না। তবে নাম প্রকাশ না করার অর্থ এই নয় যে, তাঁদের আচরণকে স্বাভাবিকভাবে মেনে নিয়েছি।

এখন রেলওয়ে প্রশাসনের কাছে আমার কয়েকটি সরাসরি প্রশ্ন।

প্রথম প্রশ্ন: অফিস সহকারী ও অফিস সহায়কদের ক্ষমতার উৎস কোথায়?

তাঁরা কি দাপ্তরিক কাজে সহযোগিতা করার দায়িত্ব পালন করছেন, নাকি নিজেদের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মনে করে সাংবাদিকদের সঙ্গে ক্ষমতার দাপট দেখাচ্ছেন? একজন অফিস সহকারী কিংবা অফিস সহায়ক কোন কর্তৃত্বে একজন সাংবাদিককে পুলিশের ভয় দেখানোর সাহস পান?

দ্বিতীয় প্রশ্ন: পুলিশের ভয় দেখানোর নির্দেশ বা সাহস তাঁরা কার কাছ থেকে পান?

তাঁরা কি নিজেদের উদ্যোগেই এমন আচরণ করেন, নাকি কোনো প্রভাবশালী কর্মকর্তার নাম ও পরিচয় ব্যবহার করেন? তাঁদের কথাবার্তা ও আচরণ দেখে স্বাভাবিকভাবেই সন্দেহ তৈরি হয়—ঊর্ধ্বতন কোনো কর্মকর্তা কি তাঁদের দিয়ে সাংবাদিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করান? যদি তা না হয়, তাহলে এসব কর্মচারী নিজেদের এত ক্ষমতাবান মনে করেন কেন? অবশ্যই এই প্রশ্নের উত্তর তদন্তের মাধ্যমেই স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

তৃতীয় প্রশ্ন: রেল ভবনে কি সাংবাদিকদেরও শ্রেণিবিভাগ করা হয়েছে?

যাঁরা কর্মকর্তাদের প্রশংসা করেন, তোষামোদ করেন কিংবা ব্যক্তিগত সম্পর্ক বজায় রেখে চলেন, তাঁদের সঙ্গে কিছু কর্মচারীর সম্পর্ক ভালো। অথচ যাঁরা রেলওয়ের অনিয়ম, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা ও প্রশাসনিক দুর্বলতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন, তাঁদের সঙ্গে অসহযোগিতা কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণের অভিযোগ কেন ওঠে?

তাহলে কি রেল ভবনে সাংবাদিকদের পেশাগত সততার চেয়ে তোষামোদ করার যোগ্যতাই বেশি মূল্যায়িত হয়? হলুদ সাংবাদিকতা কিংবা উদ্দেশ্যপ্রণোদিত সংবাদচর্চার সঙ্গে সুসম্পর্ক বজায় রাখাই কি কিছু কর্মচারীর কাছে গ্রহণযোগ্যতার মাপকাঠি?

চতুর্থ প্রশ্ন: মহাপরিচালক, এডিজি ও জেডিজিরা কি এসব আচরণ সম্পর্কে অবগত?

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক, অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি), যুগ্ম মহাপরিচালক (জেডিজি)সহ বিভিন্ন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দাপ্তরিক কাজে সহযোগিতা করেন এসব অফিস সহকারী ও অফিস সহায়ক। তাঁদের কারও অনাকাঙ্ক্ষিত আচরণের কারণে যদি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়, তাহলে সেই দায় কে নেবে?

কর্মচারীরা কি ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নাম ব্যবহার করে নিজেদের প্রভাব বিস্তার করছেন? নাকি কর্মকর্তাদের অজান্তেই তাঁদের দপ্তরের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন?

পঞ্চম প্রশ্ন: সাংবাদিকদের সঙ্গে পেশাদার আচরণ নিশ্চিত করার দায়িত্ব কার?

একজন সাংবাদিক তথ্য চাইবেন, প্রশ্ন করবেন, প্রয়োজনে অনিয়মের সমালোচনা করবেন—এটাই তাঁর পেশাগত দায়িত্ব। কোনো তথ্য দেওয়া সম্ভব না হলে তা নিয়ম অনুযায়ী জানানো যেতে পারে। কিন্তু পুলিশের ভয় দেখানো, হুমকিমূলক কথা বলা কিংবা ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শনের অধিকার কোনো কর্মচারীর নেই।

রেলওয়ে কি মনে করে, সাংবাদিকদের ভয় দেখিয়ে প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম-অব্যবস্থাপনা আড়াল করা সম্ভব?

প্রশ্নের উত্তর চাই, প্রতিশোধ নয়

আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, সাংবাদিকতা কারও তোষামোদ করার পেশা নয়। আবার ব্যক্তিগত বিরোধের জায়গাও নয়। জনস্বার্থে প্রশ্ন করা, তথ্য অনুসন্ধান করা এবং সত্য তুলে ধরাই সাংবাদিকতার দায়িত্ব।

৫ নভেম্বরের ঘটনাটি আমার প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে তুলে ধরছি। কিছু ভিডিও ফুটেজ সংরক্ষিত রয়েছে। প্রয়োজনে তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করব। আমি চাই, ঘটনাটি নিরপেক্ষভাবে যাচাই করা হোক। সংশ্লিষ্ট কর্মচারীদের বক্তব্যও নেওয়া হোক এবং অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক।

রেলওয়ের মহাপরিচালক, এডিজি ও জেডিজিসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রতি আমার অনুরোধ—আপনারা নিজ নিজ দপ্তরের কর্মচারীদের আচরণের বিষয়ে নজর দিন। কয়েকজন কর্মচারীর ব্যক্তিগত ক্ষমতা প্রদর্শন ও অসৌজন্যমূলক আচরণের কারণে যেন পুরো বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রশাসনিক ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ না হয়।

সবশেষে একটি প্রশ্ন রেখে যেতে চাই—

রেল ভবনে একজন অফিস সহকারী কিংবা অফিস সহায়ক যদি সাংবাদিককে পুলিশের ভয় দেখানোর সাহস পান, তাহলে সাধারণ রেলওয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারী কিংবা সেবাপ্রত্যাশী জনগণের সঙ্গে তাঁদের আচরণ কেমন হতে পারে?

এই প্রশ্নের উত্তর শুধু আমার প্রয়োজন নয়; রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার স্বার্থেই রেলওয়ে প্রশাসনের কাছ থেকে এর জবাব প্রত্যাশা করছি।

সাংবাদিকের কলম থামানোর জন্য ভয় দেখানোর প্রয়োজন হয় না; বরং স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা থাকলে কোনো প্রশ্নকেই ভয় পাওয়ার কারণ থাকে না।

ক্ষমতার দম্ভ নয়, জনগণের সেবা ও দায়িত্বশীল আচরণই হোক রেল ভবনের পরিচয়।


লেখক :মনিরুজ্জামান মনির 
সাংবাদিক ও কলামিস্ট

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন