ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ০৫ নভেম্বর ২০২৬

২১ কার্তিক ১৪৩৩

মৃত্যুর হাতছানি দেখে আসলাম: 

মেট্রোরেলের মানবতার কাছে ঋণী হয়ে রইলাম

◾এবিএম সোহেল রশিদ 

প্রকাশ: ০৬:৪০, ৫ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০৬:৪১, ৫ নভেম্বর ২০২৬

মেট্রোরেলের মানবতার কাছে ঋণী হয়ে রইলাম

মেট্রোরেলের ফার্মগেট স্টেশন। মাঝদুপুর। আমার ভীষণ তাড়া। প্রেসক্লাবে যেতে হবে। জরুরি কাজ। সেখানে আমার জন্য অপেক্ষা করছেন বাংলাদেশের একজন বর্ষীয়ান সংস্কৃতিজন। সময়মতো পৌঁছাতে হবে—এই তাগিদেই দ্রুত স্টেশনে ঢুকলাম।
লিফটে উঠে নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে প্ল্যাটফর্মে গেলাম। ট্রেনের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে আছি। হঠাৎ কেমন যেন অস্বস্তি বোধ করতে শুরু করলাম। চারপাশটা ঘোলাটে লাগছে। ভাবলাম, চশমার কাচে হয়তো ধুলো জমেছে। চশমা খুলে মুছলাম। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। মাথাটা ঝিমঝিম করছে। চোখের সামনে সবকিছু ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছে।
উত্তরাগামী ট্রেন এল। যাত্রীরা উঠলেন, নামলেন। ট্রেনটি চলেও গেল। কিন্তু আমার চারপাশের পৃথিবীটা যেন আরও ঝাপসা হয়ে উঠল।
এবার মতিঝিলগামী ট্রেন আসছে। মনে হলো, স্টেশনটা দুলছে। নাকি আমিই দুলছি, বুঝতে পারছিলাম না। ট্রেনটাকে আর ঠিকমতো দেখতেও পাচ্ছিলাম না। এর মধ্যেই কেউ একজন আমাকে জাপটে ধরলেন। তারপর আর কিছু মনে নেই।
যখন চোখ খুললাম, দেখলাম কয়েকজন মানুষ আমাকে ঘিরে আছেন। কেউ পা ঘষে দিচ্ছেন, কেউ মাথায় পানি ঢালছেন, কেউ বাতাস করছেন। একজন আশ্বস্ত করে বলছেন, —আপনার সঙ্গে কেউ না থাকলেও চিন্তা করবেন না। আমরা আপনাকে পৌঁছে দেব।
আমাকে আগলে রেখেছেন মেট্রোরেলের নিরাপত্তাকর্মীরা। আমার মোবাইল ফোন, ব্যাগ, এমনকি ক্যাটস চশমাটিও তাঁদের হেফাজতে নিরাপদে রাখা হয়েছে। তাঁদেরই দুজন সহকর্মী আমাকে চিকিৎসার জন্য পরিচর্যাকক্ষে নেওয়ার ব্যবস্থা করতে ছুটোছুটি করছেন।
এরই মধ্যে এক অচেনা সহযাত্রী নিজের সময় ও অর্থ ব্যয় করে আমার জন্য কিছু কিনতে বেরিয়েছেন। 'ঘরের বাজারে' চকলেট না পেয়ে মধু কিনে নিয়ে এসেছেন। তারপর আপন ভাইয়ের মতো স্নেহভরে আমার মুখে তুলে দিয়েছেন। কেউ টিসু দিচ্ছেন, কেউ খাবার পানি দিচ্ছে। মানুষের প্রতি মানুষের এমন মমতা সত্যিই আমাকে আবেগাপ্লুত করেছে। বিপদের মুহূর্তে অপরিচিত একজন মানুষের এই ভালোবাসা, এই দায়িত্ববোধ কোনো দিন ভুলব না।
মেট্রোরেলের নিরাপত্তাকর্মীদের আন্তরিক সেবা ও মানবিক আচরণের জন্য তাঁদের কাছে আমি কৃতজ্ঞ। তাঁদের পেশাগত দায়িত্বের বাইরেও যে আন্তরিকতা ও মমতার পরিচয় পেয়েছি, তা আমাকে ঋণী করে রাখবে।
পরে সেই দুজন নিরাপত্তাকর্মী আমাকে মেট্রোরেলে তুলে দিলেন। বসার ব্যবস্থা করে নিশ্চিত হলেন, আমি ঠিক আছি। তারপর বিদায় জানালেন।
একটা ছোট্ট আফসোস রয়ে গেল। এত কিছুর মধ্যে তাঁদের নাম জিজ্ঞেস করার কথা মনেই আসেনি। অথচ তাঁদের নাম দুটি জেনে রাখা উচিত ছিল। অন্তত কৃতজ্ঞতাটুকু নাম ধরে জানাতে পারতাম।
সেদিন বুঝেছি, বিপদের সময় মানুষই মানুষের সবচেয়ে বড় আশ্রয়। কখনো কখনো সম্পূর্ণ অপরিচিত কিছু মানুষ এমনভাবে পাশে দাঁড়ান, যেন তাঁরা বহুদিনের আপনজন।
সেই সহযাত্রী, মেট্রোরেলের সেই দুই নিরাপত্তাকর্মী এবং সেদিন যাঁরা আমার পাশে দাঁড়িয়েছিলেন, সবার প্রতি রইল গভীর কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসা। আলহামদুলিল্লাহ, এখন ভালো আছি। 
মানুষের কাছে এমন ঋণ থাকুক। এই ঋণ শোধ করার নয়, হৃদয়ে আগলে রাখার।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন