শিরোনাম
বিশেষ প্রতিবেদক
প্রকাশ: ১৫:২৯, ১৯ জুলাই ২০২৬ | আপডেট: ১৫:২৯, ১৯ জুলাই ২০২৬
কিশোরগঞ্জ রেলওয়েতে কর্মরত কিছু অস্থায়ী কর্মচারীকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে একটি সংঘবদ্ধ চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা ও সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, দায়িত্বে অবহেলা, অনিয়ম বা শৃঙ্খলাভঙ্গের কারণে কোনো কর্মকর্তা কঠোর ব্যবস্থা নিলে ওই চক্র সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মানববন্ধন, বিক্ষোভ, লিখিত অভিযোগ, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং আদালতে মামলা করে তাকে বিতর্কের মুখে ফেলার চেষ্টা করে। শেষ পর্যন্ত অনেক কর্মকর্তাকেই ওই এলাকা থেকে বদলি হতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
গত কয়েক বছরে কিশোরগঞ্জ রেলওয়ের পথ (ওয়ে) শাখায় কর্মরত ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলীদের দায়িত্বকাল পর্যালোচনা করলে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি দেখা যায়। ৬ মার্চ ২০১৯ থেকে ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন আনিসুজ্জামান। এরপর ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৩ থেকে ২১ জানুয়ারি ২০২৫ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন রেজাউল করিম। পরে ২২ জানুয়ারি ২০২৫ থেকে ১২ আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত আবারও দায়িত্বে ছিলেন আনিসুজ্জামান। বর্তমানে ১৩ আগস্ট ২০২৫ থেকে দায়িত্ব পালন করছেন মো. জুলহাস। রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তার দাবি, দায়িত্ব পালনকালে প্রায় প্রত্যেক কর্মকর্তাকেই বিভিন্ন অভিযোগ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং নানা কর্মসূচির মুখোমুখি হতে হয়েছে। তাদের অভিযোগ, একই কৌশল অনুসরণ করে কর্মকর্তাদের বদলির জন্য চাপ সৃষ্টি করা হয়েছে।
গত কয়েক বছরে কিশোরগঞ্জ রেলওয়েকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্যে আসা একাধিক ঘটনার বিশ্লেষণে দেখা যায়, বিভিন্ন সময়ে ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী, রেলওয়ে থানার ওসি এবং প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি, ঘুষ ও চাঁদাবাজির অভিযোগ এনে মানববন্ধন, বিক্ষোভ এবং আদালতে মামলার ঘটনা ঘটেছে। অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভিযুক্ত কর্মকর্তারা অভিযোগ অস্বীকার করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগ তোলা যে কোনো নাগরিকের অধিকার। তবে একই এলাকায় ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রায় একই ধরনের অভিযোগ, মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারণা ও আইনি পদক্ষেপের পুনরাবৃত্তি বিষয়টিকে গভীরভাবে তদন্তের প্রয়োজনীয়তা সামনে এনেছে।
রেলওয়ের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, কিশোরগঞ্জে কর্মরত কিছু অস্থায়ী কর্মচারী নিয়মিত দায়িত্ব পালন করেন না। অনেক সময় কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা, দায়িত্বে গাফিলতি কিংবা ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার নির্দেশ অমান্যের ঘটনায় শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হলে সেটিকে ব্যক্তিগত আক্রোশ হিসেবে প্রচার করা হয়। পরে বিভিন্ন সংগঠনের ব্যানারে মানববন্ধন, সংবাদ সম্মেলন, লিখিত অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার চালানো হয়।
বর্তমান ঊর্ধ্বতন উপ-সহকারী প্রকৌশলী (পথ) মো. জুলহাস বলেন, *"কিশোরগঞ্জে আসার পর থেকেই আমি রেলের স্বার্থে দিন-রাত কাজ করে যাচ্ছি। এখানে একটি স্থানীয় চক্র রয়েছে, যারা নিজেরা কাজ করে না; বরং বিভিন্ন প্রভাব খাটানোর চেষ্টা করে। তাদের অনিয়মে বাধা দিলে তারা আমার বিরুদ্ধে মিথ্যা অপবাদ দিয়ে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। এটা নতুন কিছু নয়। এর আগে কিশোরগঞ্জে কর্মরত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধেও একইভাবে মানববন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলন, মিথ্যা সংবাদ ও বিভিন্ন অপপ্রচার চালিয়ে বদলি করানো হয়েছে। এ কারণে অনেক কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জে পোস্টিং নিতে চান না। এমনকি অনেকেই আগে থেকেই অনুরোধ করেন যেন তাদের এই এলাকায় পদায়ন না দেওয়া হয়।"*
রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, এ ধরনের পরিস্থিতির কারণে অনেক কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জে পদায়ন নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করেন। কারণ, দায়িত্বশীলভাবে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিলেই একটি প্রভাবশালী চক্র সক্রিয় হয়ে ওঠে বলে তাদের অভিযোগ।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ে ঢাকা বিভাগের বিভাগীয় প্রকৌশলী আহসান হাবীব বলেন, "মো. জুলহাসের বিষয়টি সম্পর্কে আমরা অবগত আছি। একই জেলায় বারবার একই ধরনের ঘটনা ঘটার পেছনে কোনো চক্র কাজ করছে কি না, সেটিও গুরুত্বসহকারে দেখা প্রয়োজন। কিশোরগঞ্জে গিয়ে অনেক কর্মকর্তা স্বাভাবিকভাবে দায়িত্ব পালন করতে পারেন না। তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ তুলে মানববন্ধন, সাংবাদিক সম্মেলন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অপপ্রচার এবং মামলা করে হয়রানি করা হয়। ফলে মান-সম্মানের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে অনেক কর্মকর্তা সেখানে চাকরি করতে আগ্রহী হন না। অতীতেও একাধিক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে একই ধরনের কর্মসূচি হয়েছে এবং পরে তাদের বদলি করা হয়েছে।"
*তিনি আরও বলেন, "অভিযোগকারী অস্থায়ী গেটকিপার তৌফিকুর রহমান যেসব অভিযোগ বিভিন্ন গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুলে ধরছেন, সেগুলোর বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে এখন পর্যন্ত কোনো লিখিত অভিযোগ জমা পড়েনি। তিনি অফিসিয়ালভাবে কোনো অভিযোগ না দিয়েই গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তার সঙ্গে অনিয়ম ও অন্যায় হয়েছে বলে দাবি করছেন। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে রেলওয়ের প্রচলিত বিধি অনুযায়ী নিরপেক্ষভাবে বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"*
অন্যদিকে, অতীতে যেসব কর্মকর্তা বা পুলিশের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে, তাদের অনেকেই অভিযোগ অস্বীকার করে নিরপেক্ষ তদন্তের আহ্বান জানিয়েছেন। কারও বিরুদ্ধে আদালতে মামলা বিচারাধীন, আবার কোথাও তদন্তও চলমান রয়েছে। ফলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণে তদন্ত শেষ হওয়ার আগে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
সুশাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলওয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তার নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত হওয়া উচিত। একই সঙ্গে যদি কোনো সংঘবদ্ধ চক্র মিথ্যা বা ভিত্তিহীন অভিযোগের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের দায়িত্ব পালনে বাধা সৃষ্টি করে থাকে, সেই বিষয়টিও সমান গুরুত্ব দিয়ে তদন্ত করা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে রেলওয়ের উচ্চপর্যায়ের একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে কিশোরগঞ্জে গত কয়েক বছরে সংঘটিত অভিযোগ, মানববন্ধন, মামলা, শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র পর্যালোচনার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের মতে, প্রকৃত ঘটনা উদঘাটিত হলে একদিকে যেমন নির্দোষ ব্যক্তির সম্মান রক্ষা হবে, অন্যদিকে অভিযোগ প্রমাণিত হলে দোষীদের বিরুদ্ধেও প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে।