শিরোনাম
প্রকাশ: ১২:২৭, ২১ জুলাই ২০২৬
নকশায় মারাত্মক ভুল, কালভার্টের চরম ঘাটতি আর প্রাকৃতিক খালের বুকে ইট-পাথরের দেয়াল। ফল যা হওয়ার তা-ই হলো-অল্প কদিনের বৃষ্টিতেই চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটের জানআলী হাট ও ষোলশহর স্টেশনের মধ্যবর্তী অংশ আক্ষরিক অর্থেই চলে গেল অন্তত দুই ফুট পানির নিচে।
স্বাভাবিক নিয়মে রেললাইনে চার ইঞ্চি পানি উঠলে সতর্কতার সাথে ট্রেন সচল রাখা যায়, কিন্তু সেখানে দু-দুটি যাত্রীবাহী ট্রেন আটকা পড়ল আড়াই ফুট জলে।
দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও ব্যয়বহুল এই রেলপথে ৭ থেকে ১১ জুলাই পর্যন্ত টানা পাঁচ দিন থামিয়ে দিতে হলো চাকা।
আপাতদৃষ্টিতে একে ‘প্রাকৃতিক দুর্যোগ’ বা অতিবৃষ্টি বলে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হলেও, সরেজমিন অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে ভিন্ন চিত্র-এটি প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, বরং রেলওয়ের কর্মকর্তা ও ঠিকাদার সিন্ডিকেটের দীর্ঘদিনের লুটপাট ও দুর্নীতিজাত এক কৃত্রিম সংকট।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ঘটনার ভয়াবহতা ঢাকতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসন শুধু টিকিটের টাকা ফেরতের অঙ্ক সামনে এনে ‘মহান’ সাজতে চাইছে। কিন্তু এই বিপর্যয়ের পেছনে মূল অনুঘটক ছিল অপরিকল্পিত অবকাঠামো।
পানি নিষ্কাশনের পর্যাপ্ত সুযোগ না রেখে উঁচু বাঁধের মতো করে রেললাইন তৈরি করায় লোকালয় ও রেললাইন জলমগ্ন হয়ে পড়ে।
স্টেশন সংলগ্ন প্রাকৃতিক জলাধার ও খাল ভরাট করে যেসব অবকাঠামো গড়ে তোলা হয়েছে, সেগুলোর পেছনে কাজ করেছে রেলের কতিপয় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের এক অশুভ সিন্ডিকেট।
বাংলাদেশ রেলওয়ে (পূর্ব)-এর তৎকালীন মহাব্যবস্থাপক (জিএম) মো. সুবক্তগীন অবশ্য গণমাধ্যমে দাবি করেছেন-৫০০ মিটার এলাকা প্লাবিত হলেও অবকাঠামোগত বড় কোনো ক্ষতি হয়নি।
কিন্তু বাস্তবতা হলো, রেলওয়ের এই নীতি নির্ধারকদের ব্যর্থতা ও তদারকির অভাবই আজ পুরো রুটটিকে ঝুঁকিতে ফেলেছে।
তৎকালীন জিএম কার্যালয়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে কিংবা পরোক্ষ আশকারায় বছরের পর বছর চট্টগ্রাম-কক্সবাজার রুটে চলেছে টিকিট কালোবাজারি, অতিরিক্ত অর্থ আদায় ও দুর্নীতি।
দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিক এনফোর্সমেন্ট অভিযান চালিয়ে জানআলী হাট ও ষোলশহর স্টেশনে বুকিং সহকারী ও নিরাপত্তা কর্মীদের হাতেনাতে ধরে বিভাগীয় শাস্তির সুপারিশ করলেও সিন্ডিকেটের মূলোৎপাটন হয়নি।
পরবর্তীতে দেখা গেছে, উন্নয়ন প্রকল্পের নামে কোটি কোটি টাকার অর্থ বরাদ্দ হলেও কাজের মান ও সঠিক তদারকিতে জিএম দপ্তর চরম ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে।
একটি পরিসংখ্যানের পেছনের সত্য: ট্রেন বন্ধ থাকায় রেবেকা ও দূরপাল্লার হাজারো যাত্রীর দুর্ভোগ তো ছিলই, কেবল টিকিট বাবদই রেলওয়েকে গুনে গুনে ফেরত দিতে হয়েছে ৮৭ লাখ ৮৫ হাজার ৩৪৪ টাকা। হাতছাড়া হয়েছে ১১ হাজার ৩৩৭টি টিকেট।
পরবর্তী দিনগুলোর অগ্রিম বিক্রি বন্ধ থাকায় এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ভ্রমণ বাতিল করায় পরোক্ষভাবে মারাত্মক আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে গোটা বাংলাদেশ রেলওয়ে।
তবে এই ভয়াবহ ক্ষতির পরও থেমে নেই সেই চতুর সিন্ডিকেট। উল্টো তারা এই দুর্যোগের মাঝেই খুঁজে পেয়েছে নতুন আয়ের রসদ।
রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত ঝুঁকিপূর্ণ অংশটি আরও পাঁচ ফুট উঁচু করে পুনর্নির্মাণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। আর এতেই চোখ চকচক করে উঠেছে পুরোনো ঠিকাদার ও কর্মকর্তা চক্রটির।
সংস্কারের নামে নতুন করে বরাদ্দ এনে ‘প্রকল্প লুটপাটের মহোৎসব’ করার স্বপ্ন বুনছে তারা। পাঁচ দিন ট্রেন বন্ধ রেখে ৮৮ লাখ টাকা ফেরতের খবর গণমাধ্যমে বড় করে প্রচারের পেছনেও রয়েছে নিজেদের ধোয়া তুলসী পাতা প্রমাণের চতুর কৌশল, যাতে মূল দুর্নীতির তদন্ত থেকে চোখ অন্যদিকে ঘুরিয়ে দেওয়া যায়।
রেললাইন ডুবলে যাত্রী ভোগান্তি বাড়ে, রাষ্ট্রের কোটি কোটি টাকার ক্ষতি হয়, কিন্তু ভাগ্য খোলে ওই চিহ্নিত সিন্ডিকেটের।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ড্রেনেজ ব্যবস্থার স্থায়ী সমাধান ও নিরপেক্ষ তদন্ত না করে কেবল লাইন উঁচু করার নতুন প্রকল্প নিলে তা শুধু টাকার শ্রাদ্ধই বাড়াবে।
এখন দেখার বিষয় শিকড় গাড়া এই অসাধু চক্রটির বিরুদ্ধে মন্ত্রণালয় কি কঠোর তদন্তের পথ হাঁটবে, নাকি নতুন প্রকল্পের মোড়কে ফের দুর্নীতিকেই পুরস্কৃত করা হবে?