ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৯ মে ২০২৬

৪ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩, ০২ জ্বিলহজ্জ ১৪৪৭

যুক্তরাষ্ট্রের ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড পেল বাংলাদেশ রেলওয়ে ও রেলপ্রকৌশলী বাবু

সেলিমুর রহমান

প্রকাশ: ১৫:৪৪, ১৮ মে ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৪৪, ১৮ মে ২০২৬

যুক্তরাষ্ট্রের ইনোভেশন অ্যাওয়ার্ড পেল বাংলাদেশ রেলওয়ে ও রেলপ্রকৌশলী বাবু

বাংলাদেশ রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের বিভাগীয় যান্ত্রিক প্রকৌশলী (ক্যারেজ অ্যান্ড ওয়াগন) তাসরুজ্জামান বাবু যুক্তরাষ্ট্রের গ্লোবাল ইনোভেশন ইনস্টিটিউট থেকে প্রদত্ত সম্মাজনক পদক ‘গ্লোবাল ডিস্টিংগুইশড ইনোভেটর অ্যাওয়ার্ড ২০২৫’ অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়েও পৃথকভাবে ‘ডিস্টিংগুইশড ইনোভেশন বাই পাবলিক সেক্টর’ পদক অর্জন করেছে।উদ্ভাবনের ধারণা, উন্নয়ন এবং বাস্তব প্রয়োগের মাধ্যমে বিশ্বে ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে সক্ষম একাধিক উদ্যোগের জন্য প্রকৌশলী তাসরুজ্জামান বাবু এবং তার কর্মক্ষেত্র হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়েকে এই সম্মাননা প্রদান করা হয়েছে।

বিশ্বের ২৬টি দেশ থেকে জমা পড়া ১৪৭৬টি উদ্ভাবন এর তালিকা থেকে বাছাই করে ৮টি ক্যাটাগরিতে ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান মিলিয়ে মোট ১০০ বিজয়ীর তালিকা চূড়ান্ত করে নিজেদের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করেছে গ্লোবাল ইনোভেশন ইনস্টিটিউট। এগুলোর মধ্যে ডিস্টিংগুইশড ইনোভেটর ক্যাটাগরিতে নির্বাচিত ৩০ জন উদ্ভাবকের মধ্যে তাসরুজ্জামান বাবু রয়েছেন।ডিস্টিংগুইশড ইনোভেশন বাই পাবলিক সেক্টর’ ক্যাটাগরিতে পদকজয়ী ১৩টি সরকারি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে স্থান পেয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। এই তালিকায় রয়েছে কিয়োটো ইউনিভার্সিটি, দুবাই মিউনিসিপ্যালিটি, কাতার মিনিস্ট্রি অব ইন্টেরিয়র-সহ বিভিন্ন দেশের আরও ১২টি সরকারি প্রতিষ্ঠান।

বাংলাদেশ থেকে ব্যক্তি হিসেবে প্রথম তাসরুজ্জামান বাবু এবং প্রতিষ্ঠান হিসেবে বাংলাদেশ রেলওয়ে এই পদক অর্জন করল। এই বছর ডিসেম্বর মাসে সৌদি আরবের রিয়াদে বিজয়ীদের হাতে এই পদক তুলে দেওয়ার কথা রয়েছে।উল্লেখ্য, গ্লোবাল ইনোভেশন ইনস্টিটিউট উদ্ভাবন ব্যবস্থাপনা, প্রশিক্ষণ ও সার্টিফিকেশন কার্যক্রম পরিচালনাকারী একটি আন্তর্জাতিক পেশাগত প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটি প্রতিবছর জিডিআই অ্যাওয়ার্ডস এর মাধ্যমে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও জনখাতে উদ্ভাবনী অবদানের জন্য এই পদক দিয়ে থাকে। পদকটি বিশ্বের উদ্ভাবনমুখী ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানগুলোর কাছে বেশ মর্যাদাপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হয়। বিশেষ করে আরব বিশ্বে সাম্প্রতিক সময়ে উদ্ভাবননীতির ব্যাপক চর্চা হওয়ার কারণে গালফভুক্ত দেশগুলোর সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এই পদক অর্জনের প্রতিযোগিতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়।তাসরুজ্জামান বাবু গত বছর বাংলাদেশ রেলওয়েতে কর্মরত অবস্থায় স্বল্পখরচে, দেশীয় প্রযুক্তি ও স্থানীয় কারিগরি দক্ষতা ব্যবহার করে একাধিক উদ্ভাবনী সমাধান বাস্তবায়ন করে আলোচনায় আসেন।তার উল্লেখযোগ্য উদ্ভাবনের মধ্যে রয়েছে: রেলের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানোর জন্য অটোমেটেড টার্নটেবিল, দীর্ঘস্থায়ী হুইলসেট গাইড, রেল দুর্ঘটনায় কোচ ও লোকোমোটিভ উদ্ধারকাজে ব্যবহারের জন্য রি-রেইলিং ইকুইপমেন্টস, এবং কোচের শিডিউল মেরামতের জন্য ইলেকট্রিক লিফটিং জ্যাক স্থাপনসহ বিভিন্ন প্রকৌশলভিত্তিক উন্নয়নমূলক উদ্যোগ।

তার এসব উদ্ভাবন আমদানি নির্ভরতা হ্রাস, ব্যয় সাশ্রয়, স্থানীয় সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং তুলনামূলক অনুন্নত লালমনিরহাট রেল বিভাগে কাজের পরিবেশ ও সেবার মান উন্নয়নে ভূমিকা রাখছে। বিশেষভাবে তার আলোচিত উদ্ভাবন অটোমেটেড টার্নটেবিল দেশের একমাত্র স্বয়ংক্রিয় টার্নটেবিল এবং এটির মাধ্যমে লালমনিরহাট রেলবিভাগের ট্রেনের ইঞ্জিন ও কোচ ঘোরানো হয়।

ব্রিটিশ আমলে নির্মিত লালমনিরহাটের টার্নটেবিলটি নব্বই এর দশকে বিলুপ্ত হয়ে যাওয়ার পর থেকে এযাবত লালমনিরহাট এর ট্রেনগুন উল্টোমুখী হয়ে (লংহুডে) চলাচল করত। এই টার্নটেবিলের ফলে প্রায় পঁয়ত্রিশ বছর পর সম্মুখবর্তী ইঞ্জিন দিয়ে (শর্টহুডে) ট্রেনগুলো চলাচল করতে পারছে। এতে দুর্ঘটনার ঝুঁকি কমেছে।

এছাড়াও এর মাধ্যমে নির্দিষ্ট সময় অন্তর অন্তর কোচ ঘোরানো হয় বলে কোচের চাকার ক্ষয় হ্রাস পায়। এতে সরকারি অর্থের সাশ্রয় হচ্ছে।
এই পদক ছাড়াও প্রকৌশলী তাসরুজ্জামান বাবু জাতীয় ও আন্তর্জাতিক আরও কিছু পদক ও স্বীকৃতি লাভ করেন। গত বছর তিনি যুক্তরাষ্ট্রের স্টেভি এওয়ার্ডস এর দুইটি ভিন্ন ভিন্ন আসরে একটি গোল্ড ও দুইটি সিলভার পদক বিজয়ী হন। স্টেভি এওয়ার্ড ফর টেকনোলজি এক্সিলেন্স আসরে তিনি জেনারেল মোটরস, ফোর্ড মোটর কোম্পানির মতো বেশ কিছু ফরচুন ৫০০ কোম্পানির উদ্ভাবকদের সাথে প্রতিযোগিতা করে ‘লাইফটাইম এচিভমেন্ট এওয়ার্ড’ ক্যাটাগরিতে গোল্ড জয় করেন এবং ‘বেস্ট এমপ্লয়ি অভ দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে সিলভার জয় করেন।

এর আগে একই বছর তিনি এশিয়া প্যাসিফিক স্টেভি এওয়ার্ডস আসরে ‘মোস্ট ইনোভেটিভ টেকনোলজি লিডার অভ দ্য ইয়ার’ ক্যাটাগরিতে গুগল, এমাজন এর মতো প্রতিষ্ঠানের উদ্ভাবকদের সাথে সহবিজয়ী হিসেবে সিলভার পদক লাভ করেছিলেন।

এছাড়াও জাতিসংঘ শিল্প উন্নয়ন সংস্থা (ইউএনআইডিও) থেকে এসডিজি ইনোভেশন এওয়ার্ড এর স্বীকৃতিসনদ লাভ করেন। তার উদ্ভাবিত অটোমেটেড টার্নটেবিল এর জন্য ২০২৪ সালে তিনি বাংলাদেশ সরকারের রেলপথ মন্ত্রণালয় থেকে শ্রেষ্ঠ উদ্ভাবক পদক পান।মো. তাসরুজ্জামান ৩৫তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৭ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সহকারী যান্ত্রিক প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন। এর আগে তিনি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে চাকরি করেন। তার জন্ম ও বেড়ে ওঠা চাঁপাইনবাবগঞ্জে। শিক্ষাজীবনে তিনি রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে স্নাতক এবং ঢাকা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে একই বিভাগে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি লাভ করেন।এ ছাড়া তিনি এশিয়ান ডেভেলমেন্ট ব্যাংকের অর্থায়নে প্রদত্ত এডিবি-জেএসপি স্কলারশি নিয়ে জাপানের ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজ (গ্রিপ্স) থেকে পাবলিক পলিসিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন। বর্তমানে তিনি প্রেষণে যুক্তরাষ্ট্রের লুইজিয়ানা টেক ইউনিভার্সিটিতে পিএইচডিতে অধ্যায়নরত।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন