থানায় বসে কাঁদছিলেন ক্রিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিও দেখে এগিয়ে এলেন মুক্তি মাহমুদ। নিজের ছেলের কথা মনে করে নতুন ম্যাকবুক উপহার দিলেন এই বাংলাদেশি।
শিরোনাম
রেল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১০:৫২, ১১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৪, ১১ অক্টোবর ২০২৬
থানায় বসে কাঁদছিলেন ক্রিল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সেই ভিডিও দেখে এগিয়ে এলেন মুক্তি মাহমুদ। নিজের ছেলের কথা মনে করে নতুন ম্যাকবুক উপহার দিলেন এই বাংলাদেশি।
বিদেশ বিভুঁইয়ে বেড়াতে এসে হঠাৎ সব এলোমেলো হয়ে গেলে কেমন লাগে? তার ওপর বয়স মাত্র ১৮ বছর।
জার্মান পর্যটক ক্রিল ল্যান্ডারের জীবনে ঘটে যাওয়া এই ঘটনা যেমন চুরির নির্মমতা সামনে এনেছে, তেমনি অপরিচিত মানুষের প্রতি সহমর্মিতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্তও হয়ে উঠেছে।
শনিবার (১০ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর হাজারীবাগ থানায় পুলিশের উপস্থিতিতে ক্রিলের হাতে নতুন ম্যাকবুকটি তুলে দেন মুক্তি মাহমুদ। তার চাওয়া, চুরি যাওয়া জিনিসপত্র উদ্ধার না হলেও বাংলাদেশ থেকে যেন তিক্ত অভিজ্ঞতার পাশাপাশি কিছুটা ভালো স্মৃতিও নিয়ে ফিরতে পারেন এই তরুণ।
মুক্তি মাহমুদ জানান, কয়েক দিন ধরেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্রিলের ল্যাপটপ ও ক্যামেরা চুরির খবর দেখছিলেন তিনি। পরে থানায় বসে ক্রিলের কান্নার একটি ভিডিও তার চোখে পড়ে। ভিডিওটি দেখে মন খারাপ হয়ে যায় তার। মনে পড়ে নিজের ছেলের কথা, যে বিদেশে পড়াশোনা করে।
মুক্তি বলেন, ‘বাংলাদেশে এসে ১৮ বছর বয়সী এক বিদেশি পর্যটকের জিনিসপত্র চুরি হয়ে যাওয়াটা আমাদের জন্য লজ্জার। বিষয়টি আমার খুব খারাপ লেগেছে। ওর বয়সী আমারও একটা ছেলে আছে। সে বিদেশে পড়াশোনা করে। ছেলের কথা মনে হওয়ায় ঘটনাটি আমাকে আরও নাড়া দেয়।’
এরপরই ক্রিলের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা শুরু করেন তিনি। পরে শাওন নামের একজনের মাধ্যমে যোগাযোগ করে দেখা করেন তরুণ পর্যটকের সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত নিজের উদ্যোগে ক্রিলের হাতে তুলে দেন নতুন ম্যাকবুক।
মুক্তি মাহমুদের ভাষায়, ‘সবার পক্ষ থেকে একটি ম্যাকবুক উপহার দিয়েছি। বাংলাদেশ ছাড়ার আগে ছেলেটা একটু হলেও যেন ভালো স্মৃতি নিয়ে ফিরতে পারে।’
রাজধানীর জিগাতলা এলাকায় বসবাস করেন মুক্তি মাহমুদ। দীর্ঘদিন লন্ডনে থাকার পর বর্তমানে আনজুমান ডিজাইনারস লিমিটেডে মানবসম্পদ বিভাগের জ্যেষ্ঠ ব্যবস্থাপক হিসেবে কাজ করছেন তিনি। তার বিদেশি বন্ধুদের অনেকেও ক্রিলের জিনিসপত্র চুরির ঘটনায় বিব্রত হয়েছেন বলে জানান তিনি। মুক্তির মতে, বিদেশি পর্যটকের সঙ্গে এমন ঘটনা দেশের ভাবমূর্তির ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। সেই ভাবনা থেকেই ক্রিলের পাশে দাঁড়ানোর সিদ্ধান্ত নেন তিনি।
নতুন ম্যাকবুক হাতে পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন ক্রিল ল্যান্ডার। তিনি জানান, জিনিসপত্র হারানোর পর অনেকেই তাকে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন এবং সহানুভূতি জানিয়েছেন। এমন সহযোগিতা তাঁর কাছে প্রশংসনীয়।
ক্রিল বলেন, ‘আজ একটি ম্যাকবুক পেলাম। ধন্যবাদ জানাচ্ছি। এটা ব্যবহার করে আবার কাজ করতে পারব। এ ঘটনা আমার জীবনের অভিজ্ঞতার অংশ হয়ে থাকবে।’
নতুন ম্যাকবুক পেয়ে আবার কাজ শুরু করার সুযোগ তৈরি হলেও ক্রিলের হারানো জিনিসপত্রের অপেক্ষা এখনো শেষ হয়নি। তাঁর ল্যাপটপ ও ক্যামেরা এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
যেভাবে হারালেন ল্যাপটপ ও ক্যামেরা
গত বুধবার (৭ অক্টোবর) বিকেলে নাটোর রেলওয়ে স্টেশনে ট্রেনের টিকিট কেনার জন্য এটিএম বুথ থেকে টাকা তুলতে যাচ্ছিলেন ক্রিল। এ সময় রেলওয়ের কর্মকর্তা পরিচয় দেওয়া এক ব্যক্তির কাছে নিজের ল্যাপটপ ও ক্যামেরার ব্যাগ রেখে যান তিনি। টাকা তুলে ফিরে এসে দেখেন, ওই ব্যক্তি নেই, ব্যাগটিও উধাও। পরে জানতে পারেন, ওই ব্যক্তি রেলওয়ের কর্মী নন।
এরপর নাটোর সদর থানায় গিয়ে অভিযোগ জানান ক্রিল। চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারের আশায় বুধবার দিবাগত রাতে রাজশাহীতে যান তিনি। সেখানে পুলিশ তার থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করে। পরদিন বৃহস্পতিবার বিকেলে পদ্মা এক্সপ্রেস ট্রেনে ঢাকায় আসেন এই জার্মান তরুণ।
নাটোর রেলওয়ে স্টেশনের সিসিটিভি ফুটেজে এক ব্যক্তিকে ক্রিলের ল্যাপটপ ও ক্যামেরার ব্যাগ নিয়ে যেতে দেখা গেছে। ওই ব্যক্তিকে শনাক্ত ও গ্রেপ্তার এবং চুরি যাওয়া মালামাল উদ্ধারে পুলিশের বিভিন্ন ইউনিট কাজ করছে।
হাজারীবাগ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোশাররফ হোসেন বলেন, ক্রিল পড়াশোনার পাশাপাশি খণ্ডকালীন চাকরি করে নিজের ল্যাপটপটি কিনেছিলেন। সেটি চুরি হয়ে যাওয়ার ঘটনা দুঃখজনক।
ওসি বলেন, ‘ল্যাপটপ ও ক্যামেরা হারানোর ঘটনাটি আমাদের জন্য লজ্জার। পুলিশ চুরি হওয়া মালামাল উদ্ধারের চেষ্টা করছে। একজন নিজের উদ্যোগে তাকে ম্যাকবুক উপহার দিয়েছেন। এতে কিছুটা হলেও দেশের সম্মান ফিরবে।’
ক্রিলের হারানো ল্যাপটপ ও ক্যামেরা এখনো ফেরত পাওয়া যায়নি। তবে বিপদের মুহূর্তে সম্পূর্ণ অপরিচিত একজন মানুষের এগিয়ে আসা তার বাংলাদেশ সফরের গল্পে যোগ করেছে নতুন এক অধ্যায়। চুরির ঘটনায় যে কষ্ট নিয়ে শুরু হয়েছিল সেই অধ্যায়, মুক্তি মাহমুদের মানবিক উদ্যোগে তার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছে কৃতজ্ঞতা আর মানুষের প্রতি আস্থা।