ঢাকা, রোববার, ০৪ অক্টোবর ২০২৬

১৮ আশ্বিন ১৪৩৩

অব্যবস্থাপনায় যাত্রী দুর্ভোগ চরমে

রেল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫:১৪, ৩ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৫:১৪, ৩ অক্টোবর ২০২৬

অব্যবস্থাপনায় যাত্রী দুর্ভোগ চরমে

রাষ্ট্রের সম্পদ সুরক্ষার দায়িত্ব প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের। অর্থাৎ, জনগণের সম্পদ দেখাশোনার জন্য বছর বছর যারা বেতন-ভাতাসহ সরকারের নানা সুযোগ-সুবিধা ভোগ করেন, মূলত দায়িত্বটা তাদেরই। কিন্তু ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলরুটে চলাচলে যাত্রীদের নেই কোনো নিরাপত্তা। ট্রেনে নেই টিকিট তদারকি। এভাবেই চলছে ট্রেন বছরের পর বছর। সেই সঙ্গে পুরোনো ইঞ্জিন (লোকোমোটিভ), ভাঙাচোরা বগি বা কোচে নষ্ট ফ্যান, অস্বাস্থ্যকর টয়লেট এবং নষ্ট বৈদ্যুতিক বাতিসহ নানা ধরনের যাত্রী দুর্ভোগ। শুধু বগির দুরবস্থাই নয়, এ রুটে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি), রেলপুলিশ, টিটিই, মহিলা বগি প্রহরী, স্টেশন ও প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তাকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি নেই বললেই চলে। ফলে টিকিটবিহীন যাত্রী চলাচল, হকার ও ভিক্ষুকের আনাগোনার পাশাপাশি চলন্ত ট্রেনে নিয়মিত মাদক বিক্রির মতো গুরুতর অভিযোগ রয়েছে।

গত এক সপ্তাহে একাধিকবার কমলাপুরস্থ নারায়ণগঞ্জ প্ল্যাটফর্মে সরেজমিন দেখা যায়, একটি কাউন্টার থেকে টিকিট বিক্রি করা হলেও অধিকাংশ যাত্রী টিকিট সংগ্রহ না করেই ট্রেনে উঠছেন। মূল ফটক থেকে বগি (কোচ) পর্যন্ত কোনো নিরাপত্তা তল্লাশি (চেকিং) বা সন্দেহজনক যাত্রীদের ক্ষেত্রে নিরাপত্তা তদারকি চোখে পড়েনি। প্ল্যাটফর্মের পাশেই প্রকাশ্যে মূত্র ত্যাগ এবং মাদক সেবনও চলছে। ভবঘুরে মানুষের পাশাপাশি স্টেশন এলাকায় মাদকসেবীদের যত্রতত্র ঘুমিয়ে থাকা স্টেশন এলাকার নিয়মিত চিত্র।

এ ছাড়া ট্রেনে করে যেসব যাত্রী গন্তব্যের উদ্দেশে যাচ্ছেন, তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, টিটিই (ভ্রাম্যমাণ টিকিট পরীক্ষক) না থাকায় নিয়মিত টিকিট সংগ্রহের প্রয়োজন পড়ে না। তাদের দাবি, এ পথে মাঝেমধ্যে গেন্ডারিয়া স্টেশন থেকে টিটিই দেখা যায়, তবে নিয়মিত নয়। তখন হয়তো কিছু যাত্রীর কাছ থেকে ভাড়া আদায় করা হয়, তবে জরিমানা আদায়ের ঘটনা খুবই কম।

যাত্রীদের অভিযোগ, এ পথে সর্বশেষ কবে নিয়মিত দায়িত্বরত আরএনবি, রেলপুলিশ, মহিলা বগি প্রহরী, গার্ড (কন্ডাক্টর) বা প্ল্যাটফর্মের নিরাপত্তা সদস্যরা চলন্ত বা প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনে (নারায়ণগঞ্জ কমিউটার) দায়িত্ব পালন করেছেন, তা একমাত্র তারাই বলতে পারবেন। এ ছাড়া গেন্ডারিয়া, শ্যামপুর, পাগলা, ফতুল্লা ও চাষাড়া স্টেশন থেকে যাত্রী উঠলেও তল্লাশি বা টিকিট সংগ্রহের ব্যবস্থা একদমই চোখে পড়েনি।

সেই সঙ্গে নারায়ণগঞ্জ থেকে ছেড়ে আসা কমিউটারের যাত্রীদের প্রায় নিয়মিত আরএনবি সদস্যসহ অন্যান্য দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মচারীদের দ্বারা টিকিট তল্লাশির শিকার হতে হয়। অথচ এই দায়িত্বটি পালন করার কথা টিসির (টিকিট কালেক্টর)।

বিআর কর্মচারী মাহিন নারায়ণগঞ্জ কমিউটারের যাত্রী হয়ে গেন্ডারিয়া থেকে কমলাপুর স্টেশনে আসেন। ট্রেনটি প্ল্যাটফর্মে আসার সঙ্গে সঙ্গেই দৌড়ে নিজের অবস্থান প্রধান গেটের সামনে নিশ্চিত করেন। তার ঠিক ৫ ফুট দূরত্বে দুজন আরএনবি (রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী) সদস্যকেও এ সময় যাত্রীদের কাছ থেকে টিকিট তল্লাশির নামে ভাড়া এবং টিকিট সংগ্রহ করতে দেখা যায়। এ সময় বিষয়টি মোবাইল ফোনে রেকর্ড হচ্ছে বুঝতে পেরে তাদের একপ্রকার দৌড়ে ঘটনাস্থল ত্যাগ করতে দেখা যায়।

এ সময় বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মচারী মাহিনের সঙ্গে কথা হয় কালবেলার। তার দাবি, নিয়মিত বাসা থেকে এ পথেই কর্মস্থলে যাতায়াত করি, তাই নিজের দায়িত্ববোধের জায়গা থেকে যাত্রীদের টিকিট আছে কি না দেখছিলাম। তবে সংগ্রহ করা টাকা জমা না দেওয়ার বিষয়ে স্ক্যানারের দায়িত্বে থাকা এই ব্যক্তির কাছ থেকে কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।

জিআরপি পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রেলরুটে গড়ে প্রতি বছর ৩০ থেকে ৪০ জন মানুষ ট্রেনে কাটা পড়ে মারা যান। অসচেতনতা, রেললাইন দিয়ে হাঁটা এবং অবৈধ লেভেল ক্রসিং পারাপারই এসব দুর্ঘটনার প্রধান কারণ।

নারায়ণগঞ্জ মহিলা কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী খুশি বলেন, বগি কম থাকায় যাত্রীদের অনেক চাপ থাকে। তদারকি না থাকায় টিকিট না কাটার প্রবণতাও রয়েছে। সেই সঙ্গে এ পথে ভিক্ষুক, হকার, চোর ও বিকৃত মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের বেশি দেখা যায়। কথা হয় ষাটোর্ধ্ব ময়না বেগমের সঙ্গে। তিনি বলেন, বয়স্ক যাত্রীদের জন্য নির্ধারিত আসন না থাকায় বাধ্য হয়ে আধা ঘণ্টার বেশি সময় এ পথে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়। তার ওপরে নেই বাথরুম বা সব বগিতে হাতল ধরে দাঁড়িয়ে থাকার ব্যবস্থা।

পোশাক ব্যবসায়ী নাজমুল হাসান বলেন, ব্যবসার প্রয়োজনে এ পথ ব্যবহার করি। কিন্তু মালামাল নিয়ে সতর্ক না থাকলে চোখের পলকে চুরি হয়ে যায়।

সব মিলিয়ে একটি মাত্র ইঞ্জিন ব্যবহার করে উভয় দিকে (যাতায়াত) কমিউটার ট্রেন ব্যবহার করে যাত্রী পরিবহন চালু থাকলেও নিরাপত্তা, টিকিট তদারকি, স্টেশন অবকাঠামো, বগির সংখ্যা, পরিচ্ছন্নতা ও নির্মাণকাজের ব্যবস্থাপনা নিয়ে যাত্রীদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক অসন্তোষ।

বিআর ও আরএনবি কর্মকর্তারা কালবেলাকে জানান, ২০১৬ সালের পর থেকে নিয়োগ বন্ধ থাকায় ঢাকার গুরুত্বপূর্ণ এ পথে নিয়মিত তদারকির জন্য প্রয়োজনীয় লোকবল নেই বললেই চলে। ফলে জোড়াতালি দিয়ে চলছে নিরাপত্তা ব্যবস্থা।

সাম্প্রতিক দুটি ঘটনায় কমলাপুর রেলস্টেশনের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। চলতি মাসের ১৯ সেপ্টেম্বর রাতে স্টেশনের ২ নম্বর প্ল্যাটফর্মে ককটেল বিস্ফোরণ ঘটে। ২০ সেপ্টেম্বর একই প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে থাকা হাওর এক্সপ্রেসের একটি বগিতে আগুন লাগে। হাওর এক্সপ্রেসে আগুনের ঘটনায় পরে তদন্ত কমিটি গঠন করে রেলওয়ে। রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কমান্ড্যান্ট শহীদ উল্লাহ এবং ঢাকা আরএনবির (অস্ত্র শাখা) ওসি মেহেদী হাসান কালবেলাকে জানান, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে প্রতিটি ট্রেন দিনে আটবার এ পথে যাতায়াত করে। তারা জানান, প্রতি যাত্রায় সাধারণত ২-৩ জন আরএনবি সদস্য নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকেন। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী এই সংখ্যা কম-বেশি হয়।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন