ঢাকা, রোববার, ০৮ নভেম্বর ২০২৬

২৪ কার্তিক ১৪৩৩

ঢাকা থেকে স্বল্প দূরত্বে চালু হবে তিন কমিউটার ট্রেন

রেল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১০:৫৯, ৭ নভেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১০:৫৯, ৭ নভেম্বর ২০২৬

ঢাকা থেকে স্বল্প দূরত্বে চালু হবে তিন কমিউটার ট্রেন

নতুন লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ (বগি) পেলে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ, ঢাকা-জয়দেবপুর (গাজীপুর) এবং ঢাকা-নরসিংদী রুটে নতুন কমিউটার ট্রেন সার্ভিস চালু করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট কার্যালয় থেকে গত ২৮ অক্টোবর এই চাহিদার কথা জানিয়ে রেলওয়ের মহাপরিচালককে চিঠি লেখা হয়েছে। সেই চিঠির অনুলিপি পেয়েছে খবরের কাগজ।

গত ৯ সেপ্টেম্বর রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জাতীয় সংসদে এক প্রশ্নোত্তর পর্বে জানিয়েছেন, রেলসেবা আধুনিক, যুগোপযোগী ও যাত্রীবান্ধব করতে ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ সংগ্রহ করবে বাংলাদেশ রেলওয়ে।

পরে পরিকল্পনা কমিশনের ভৌত অবকাঠামো বিভাগের একটি সভার কার্যবিবরণী থেকে জানা গেছে, দেশের অভ্যন্তরীণ ও আঞ্চলিক রেল যোগাযোগ জোরদারে ৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকার প্রকল্প প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। প্রকল্পের আওতায় ২০০টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ, চারটি রিলিফ ক্রেন ও চারটি আন্ডারফ্লোর হুইল লেদ মেশিন কেনার পরিকল্পনা রয়েছে।

এমন প্রস্তাবের পর বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল নতুন তিন কমিউটার ট্রেন পরিচালনার প্রস্তাব দিয়েছে বলে জানা গেছে। ঢাকা থেকে উত্তরাঞ্চল ও পূর্বাঞ্চলের রুটে আন্তনগর ট্রেনে যাত্রীর চাপ কমাতে বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল এমন প্রস্তাব দিয়েছে। বিশেষ করে নরসিংদী থেকে ঢাকার পথে রেলযাত্রা নিয়ে অভিযোগের অন্ত নেই। এই জেলার যাত্রীদের অধিকাংশ টিকিট না কেটে যাত্রা করেন বলে অভিযোগ এনেছেন রেল কর্মকর্তারা। টিকিটবিহীন যাত্রীরা এসি কামরায় উঠে যাত্রী-স্টুয়ার্ডদের মারধর করছেন–এমন অভিযোগ রয়েছে বিস্তর। একাধিকবার ট্রেন আটকে লোকোমোটিভ ভাঙচুর ও চালককে মারধরের ঘটনা ঘটেছে নরসিংদীতে। এমন প্রেক্ষাপটে এই জেলায় নতুন ট্রেনের দাবি উঠেছে বারবার। ঢাকা-সিলেট মহাসড়ক নির্মাণ প্রকল্প চলছে, তাই তীব্র যানজটের কারণে নরসিংদী ও কিশোরগঞ্জের যাত্রীদের এখন বড় ভরসা হয়ে উঠেছে ট্রেন।

অন্যদিকে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটে ডুয়েলগেজ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প চলমান রয়েছে। এই রুট বর্ধিত করে ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-জয়দেবপুর করার পরিকল্পনা রেলওয়ের রয়েছে। নারায়ণগঞ্জ থেকে ঢাকার তেজগাঁও, বনানী ও ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট স্টেশনে অফিসগামী যাত্রীদের চাহিদার তুঙ্গে রয়েছে ট্রেন। এ পথে কমিউটার ট্রেন চললে রেলওয়ে লাভবান হতে পারে বলে ধারণা করছেন কর্মকর্তারা।

ঢাকা-জয়দেবপুর রেল রুটে তুরাগ কমিউটারও প্রচুর যাত্রী পাচ্ছে প্রতিদিন। এমন প্রেক্ষাপটে রেলের আয় বাড়াতেই নতুন কমিউটার ট্রেনের পরিকল্পনা করা হচ্ছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের চিফ অপারেটিং সুপারিনটেনডেন্ট কার্যালয় জানিয়েছে, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ-ঢাকা রুটে ৮ জোড়া কমিউটার ট্রেন চলছে ‘নারায়ণগঞ্জ কমিউটার’ নামে। ঢাকা-জয়দেবপুর-ঢাকা রুটে মিটারগেজ (এমজি) লোকো ও ক্যারেজ নিয়ে ২ জোড়া কমিউটার, ব্রডগেজ লোকো (বিজি) ও ক্যারেজ নিয়ে আরও ২ জোড়া কমিউটার ট্রেন চলছে। ঢাকা-নরসিংদী রুটে এমজি ক্যারেজ ও লোকো নিয়ে দুই জোড়া ট্রেন চলাচলের কথা থাকলেও এখন চলছে এক জোড়া।

নতুন কমিউটার কোন ব্যবস্থাপনায় চলবে, জানেন না কেউ

রেলওয়ের পূর্বাঞ্চল কার্যালয় নতুন তিনটি কমিউটার ট্রেনের প্রস্তাব আনার পর সেগুলো কি নিজস্ব ব্যবস্থাপনা চলবে, না বেসরকারি খাতে দেওয়া হবে, সে প্রশ্নে অনেক জটিলতা দেখা দিয়েছে। কারণ এর আগে ময়মনসিংহ-জারিয়াঝাঞ্জাইল রুটের জারিয়া লোকাল, ঢাকা-নারায়ণগঞ্জ রুটের নারায়ণগঞ্জ কমিউটার ও ঢাকা-নরসিংদী রুটের নরসিংদী কমিউটার ট্রেনগুলো বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে। পূর্বাঞ্চলের ১১টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় চলাচল করছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক রেলের অপারেশন বিভাগের দুজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা খবরের কাগজকে বলেন, কমিউটার ট্রেনগুলো বেসরকারি ব্যবস্থায় চালাতে চায় রেলওয়ে। কারণ সরকারি ব্যবস্থাপনা থেকে বেসরকারি ব্যবস্থাপনা চললে রেলের আয় বাড়ে দ্বিগুণ।

তবে সব ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দিয়ে দেওয়ার বিরোধিতাও করছেন রেলের অনেকেই। এতে রেলের সক্ষমতা প্রশ্নবিদ্ধ হয়–এমন যুক্তি দেখিয়ে তারা রেলের অপারেশনস ও রোলিং স্টক বিভাগকে ডিপিপি সংশোধনের প্রস্তাব দিয়েছেন।

লোকো ও ক্যারেজের তীব্র সংকট, কেনাকাটার মহাপরিকল্পনা

রেলওয়ের তথ্য বলছে, এখন ১ হাজার ২৮২টি মিটারগেজ যাত্রীবাহী ক্যারেজ রয়েছে। এর মধ্যে ৬৯৫টির বয়স ৩০ বছরের বেশি। বিভিন্ন ধরনের ত্রুটি নিয়ে চলাচল করছে ৬৮১টি ক্যারেজ। একটি ক্যারেজের অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল ৩৫ বছর হওয়ায় পুরোনো বগিগুলো বদলে নতুন ক্যারেজ সংগ্রহের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। ইঞ্জিন, কোচ ও ক্রুর অভাবে বর্তমানে বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ১৯টি মেইল বা কমিউটার, ২১টি লোকাল ট্রেনসহ মোট ৪০টি ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া পর্যাপ্ত সক্ষমতার অভাবে প্রতিদিন ৭ থেকে ৮টি মালবাহী ট্রেন ফিরিয়ে দিতে হচ্ছে।

তাই নতুন লোকোমোটিভ ও ক্যারেজ কিনতে রেলওয়ে ৩ হাজার ৭৭৯ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে নতুন কয়েকটি প্রকল্পের প্রস্তাব করেছে। এর মধ্যে একটি সরকারি অর্থায়ন ১ হাজার ১২১ কোটি ৪ লাখ টাকার এবং এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঋণে ২ হাজার ৬৫৮ কোটি ২১ লাখ টাকার প্রকল্প।

দুটি পৃথক প্রকল্পের মাধ্যমে বাংলাদেশ রেলওয়ের জন্য ২০০টি মিটারগেজ ক্যারেজ এবং ৩০টি মিটারগেজ লোকোমোটিভ সংগ্রহের জন্য ডিপিপি (উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব) প্রণয়ন করা হচ্ছে।

রেলপথ মন্ত্রণালয় সারা দেশে ব্রডগেজ রেলপথ স্থাপনের পরিকল্পনা করলেও কেন মিটারগেজ লোকো বা ক্যারেজ কেনা হবে–এ নিয়ে জানতে চাইলে রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক ফকির মো. মহিউদ্দিন খবরের কাগজকে বলেন, ‘মিটারগেজ ট্র্যাক উঠিয়ে সারা দেশ ব্রডগেজ ট্র্যাক স্থাপন করতে বহু বছর সময় লাগবে। আগামী ২০৫০ সালের মধ্যে ব্রডগেজ নেটওয়ার্কের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু তার আগে তো মিটারগেজ সেকশন অপারেট করতে হবে। মিটারগেজ সেকশনেই যাত্রী বেশি। তাই মিটারগেজ লোকো ও ক্যারেজ আমাদের আনতে হবে।’

পরে রেলওয়ে ও পরিকল্পনা কমিশন সূত্রে জানা গেছে, ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বর থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদ প্রস্তাব করা হয়েছিল। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশনের পিইসি সভায় তা পরিবর্তন করে ২০২৬ সালের ১ ডিসেম্বর থেকে ২০৩০ সালের ৩১ মার্চ পর্যন্ত নির্ধারণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, দেশের রেলওয়ের সক্ষমতা বাড়াতে নতুন করে ৮০টি লোকোমোটিভ আনার উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। এর মধ্যে ৩০টি লোকোমোটিভ ক্রয়ের প্রস্তাব জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটিতে (একনেক) অনুমোদিত হয়েছে। এসব লোকোমোটিভ দেশে আসতে দুই থেকে আড়াই বছর সময় লাগতে পারে।

তবে রেলপথ মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি যাত্রীবাহী ক্যারেজের তুলনায় মালবাহী ক্যারেজ বাড়ানোর নির্দেশ দিয়েছে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন