ঢাকা, শুক্রবার, ০৯ অক্টোবর ২০২৬

২৩ আশ্বিন ১৪৩৩

উল্টো ঝুলন্ত ট্রেন থেকে সৌরচালিত কোচ: বিশ্বজুড়ে বিস্ময়কর ১০টি ব্যতিক্রমী রেলপথ

রেল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১১:১২, ৮ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১১:১৩, ৮ অক্টোবর ২০২৬

উল্টো ঝুলন্ত ট্রেন থেকে সৌরচালিত কোচ: বিশ্বজুড়ে বিস্ময়কর ১০টি ব্যতিক্রমী রেলপথ

ট্রেন ভ্রমণের ক্ষেত্রে দুর্গম কিংবা কঠিন ভূপ্রকৃতি কখনো মানুষের উদ্ভাবনী শক্তিকে আটকে রাখতে পারেনি। পাহাড়-পর্বত ডিঙানো, উপত্যকা পার হওয়া কিংবা শহরের ভিড় ঠেলে চলাচলের জন্য বিশ্বের প্রকৌশলীরা একের পর এক অদ্ভুত কিন্তু কার্যকর রেলপথ তৈরি করে গেছেন। এমনকি মাথার ওপর ঝুলন্ত উল্টো ট্রেন কিংবা রেললাইনে বাস চালিয়েও নিত্যদিনের যাতায়াতকে সহজ ও বিস্ময়কর করে তোলা হয়েছে। সম্প্রতি বিশিষ্ট ভ্রমণ লেখক অ্যাড্রিয়ান ব্রিজের এক প্রতিবেদনে বিশ্বজুড়ে ছড়িয়ে থাকা এমনই ১০টি অবিশ্বাস্য ও ব্যতিক্রমী ট্রেনের চিত্র উঠে এসেছে, যা যেকোনো ট্রেনপ্রেমীকে মুগ্ধ করতে বাধ্য।

এর মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকার আর্জেন্টিনায় চালু হওয়া সূর্যচালিত নতুন ট্রেন ‘ট্রেন সোলার দে লা কেব্রাদা’ বিশ্বজুড়ে দারুণ সাড়া ফেলেছে। ২০২৪ সালে চালু হওয়া সৌরশক্তির এই যানটি দেশটির ঐতিহ্যবাহী কেব্রাদা দে হুমাহুয়াকা অঞ্চল দিয়ে চলাচল করে। আন্দিজ পর্বতমালার ২৬ মাইল দীর্ঘ এই পথ জুড়ে স্থানীয় আদিবাসী সম্প্রদায়গুলোকে যুক্ত করেছে দুই বগির এই ট্রেনটি, যার ভেতরে রয়েছে লিথিয়াম ব্যাটারি এবং যা সম্পূর্ণ চার্জ হয় সোলার প্যানেলের মাধ্যমে। পরিবেশবান্ধব ও ধীরগতির এই যাত্রায় এখন পর্যটকদের জন্য রাতে তারা দেখার পাশাপাশি ওয়াইন আস্বাদনের আয়োজনও যুক্ত করা হয়েছে। এর টিকিট মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫ মার্কিন ডলার বা প্রায় ৩৪ পাউন্ড।

অন্যদিকে চিলি, বলিভিয়া ও কলম্বিয়ার পাহাড়ি অঞ্চলে দেখা যায় প্রকৌশলের আরেক কৌতূহলী রূপ ‘গন্ডোলা কারিল ফেরোবাস’। এগুলো মূলত পুরনো বাসের বডি, যেগুলোতে সাধারণ চাকার বদলে ট্রেনের লোহার চাকা লাগিয়ে রেললাইনে চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে। দেখতে বেশ ঝুঁকিপূর্ণ হলেও প্রত্যন্ত পাহাড়ি অঞ্চলের বাসিন্দাদের জন্য এটি এক দারুণ ভরসা। চিলির সান্টিয়াগো থেকে কিছুটা উত্তরের ২১ মাইল দীর্ঘ রুটে পর্যটকদের জন্য বিশেষ ‘গন্ডোলা কারিল’ সার্ভিস চালানো হয়, যার যাতায়াত ভাড়া ৫০ হাজার চিলিয়ান পেসো বা ৩৯ পাউন্ড।

প্রযুক্তির দিক থেকে আরও এক ধাপ এগিয়ে জাপান তৈরি করেছে 'ডিএমভি' বা ডুয়াল-মোড ভেহিক্যাল, যা সাধারণ রাস্তা এবং রেললাইন; উভয় স্থানেই সমান তালে চলতে পারে। দেশের শিকোকু দ্বীপের আসা কোস্ট রেলওয়ে পরিচালিত এই যানটি দূরবর্তী উপকূলীয় শহরের ৩০ মাইল দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে, যার মধ্যে ছয় মাইল থাকে ট্রেন ট্র্যাকিং। পাকা সড়ক থেকে রেললাইনে প্রবেশের সময় মাত্র ১৫ সেকেন্ডের মধ্যে এর সামনের রাবারের চাকাগুলো ওপরে উঠে যায় এবং নিচের স্টিলের চাকা নেমে আসে। এর টিকিটের দাম রাখা হয়েছে ২০০ থেকে ২৪০০ জাপানি ইয়েন বা ১ থেকে ১১.৫০ পাউন্ড।

শুধু প্রযুক্তিই নয়, জাপানের নিজস্ব সংস্কৃতি ও পাগলামির বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে তাদের ফ্যান্টাসি থিমযুক্ত 'পোকেমন উইথ ইউ ট্রেন'-এ। পুরো ট্রেনটির ভেতর-বাইরে জনপ্রিয় অ্যানিমে চরিত্র ‘পিকাতচু’-এর হলুদ রঙে সাজানো হয়েছে। মেঝে থেকে শুরু করে দেয়াল ও পর্দা; সবখানেই দৃশ্যমান পিকাতচুর ছোঁয়া। ছোট শিশুদের আনন্দ দিতে ট্রেনের ভেতরে রয়েছে একটি ডেডিকেটেড প্লে-রুম। তোহোকু অঞ্চলে চলা এই ট্রেনের দুটি ঘণ্টার ভ্রমণের মূল্য ১৭০০ জাপানি ইয়েন বা ৮ পাউন্ড।

ইউরোপীয় প্রযুক্তির এক অসামান্য উদাহরণ জার্মানির 'ভুহুফাল্টার শ্বেবেবান', যাকে বলা হয় ঝুলন্ত বা 'উড়ন্ত ট্রেন'। উত্তর রাইন-ওয়েস্টফেলিয়ার ভুহুফাল্টা শহরে পরিচালিত এই ঝুলন্ত মনোরেলটি আট মাইল দীর্ঘ পথ জুড়ে শহরের ওপর ঝুলে চলাচল করে। আপাতদৃষ্টিতে সায়েন্স-ফিকশন চলচ্চিত্রের দৃশ্য মনে হলেও শতাব্দী প্রাচীন এই ট্রেনটি ১৯০১ সালে চালু হয়। শহরের প্রতিদিনের যাতায়াতের অন্যতম প্রধান মাধ্যম এবং একটি বিখ্যাত পর্যটন আকর্ষণ এই ট্রেনের ২৪ ঘণ্টার টিকিটের মূল্য রাখা হয়েছে ৭.৬০ ইউরো বা ৬.৫০ পাউন্ড।

জার্মানির পথ ধরে চীনও তৈরি করেছে নিজস্ব ঝুলন্ত মনোরেল 'অপটিক্স ভ্যালি ফোটন' বা স্কাইরেল, যা দেশটির হুপেই প্রদেশের উহান শহরে চালু রয়েছে। তবে জার্মান ট্রেনের সাথে এর মূল পার্থক্য হলো এর মেঝেটি কাচের মতো সম্পূর্ণ স্বচ্ছ। ফলে যাত্রীরা নিচে শহরের দৃশ্য দেখতে দেখতে এক রোমাঞ্চকর অভিজ্ঞতা লাভ করেন। ড্রাইভারবিহীন এই মনোরেলটির একমুখী ভ্রমণের ভাড়া ৩০ চীনা ইউয়ান বা ৩.৪০ পাউন্ড। তাছাড়া দেশটির ছেংতুতেও এমন আরেকটি নতুন ঝুলন্ত ট্রেন সম্প্রতি চালু করা হয়েছে।

পাহাড়ে চড়ার ক্ষেত্রে সুইজারল্যান্ডের 'শ্বিজ-স্টুস ফিউনিকুলার' বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। ট্রেনটির বগিগুলো দেখতে হুবহু বিয়ারের পিপা বা ব্যারেলের মতো। এটি বিশ্বরে রেকর্ড পরিমাণ ১১০ শতাংশ ঢালু পথে প্রায় ২৪৫০ ফুট উঁচুতে আরোহণ করে। খাড়া ঢালে ওঠার সময় বগিগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে ঘোরে, যার ফলে ট্রেনের ভেতরে থাকা যাত্রীরা খাড়া বা সোজা হয়েই দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন। বিচ্ছিন্ন পাহাড়ি গ্রাম স্টুস-এর মানুষের যাতায়াতের এই প্রকৌশল বিস্ময়ের রাউন্ড ট্রিপ টিকিটের মূল্য ২৩.২০ সুইস ফ্রাঙ্ক বা ২১ পাউন্ড।

ইকুয়েডরের রহস্যময় 'ডেভিলস নোস' বা 'নারিজ দেল দিয়াবলো' রেলওয়ে ভয়াবহ এক ধসের পর আবারও চালু হয়েছে। আলৌসি এবং সিমবাম্বের মধ্যবর্তী স্থানে পাহাড়ের খাড়া দেয়ালে ওঠার জন্য ট্রেনটি একটি বিশেষ আঁকাবাঁকা বা 'জিগজ্যাগ' রুট অনুসরণ করে। মাত্র সাত মাইল দূরত্বে ১৬৪০ ফুটেরও বেশি উঁচুতে ওঠার জন্য ট্রেনটি একবার সামনে এবং পরক্ষণেই পেছনে গিয়ে খাড়া পাহাড় অতিক্রম করে। এর রোমাঞ্চকর রাউন্ড ট্রিপের ভাড়া রাখা হয়েছে ৩০ মার্কিন ডলার বা ২২.৫০ পাউন্ড।

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার দেশ কম্বোডিয়ায় গৃহযুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত রেললাইনে যাতায়াতের জন্য স্থানীয় লোকজন নিজস্ব কায়দায় উদ্ভাবন করেছে 'বাঁশের ট্রেন' বা 'নরি'। কাঠের ফ্রেম, বাতিল লোহা এবং বাঁশের পাতাতনের ওপর তৈরি এই প্ল্যাটফর্মটি মোটরবাইক, ঘাস কাটার যন্ত্র কিংবা ট্র্যাক্টরের ইঞ্জিনে চালিত হয়। ঘণ্টায় ৩০ মাইল বেগে ছুটতে পারা এই বাহনে চারজন যাত্রী বসতে পারেন। ব্যাটামবাং প্রদেশের ও দামবং গ্রাম থেকে শুরু হওয়া তিন মাইলের এই ভ্রমণের মূল্য মাত্র ৫ মার্কিন ডলার বা ৪ পাউন্ড।

তালিকায় সবশেষে থাকা অস্ট্রেলিয়ার 'গলফল্যান্ডার' ট্রেনটিকে রসিকতা করে বলা হয় “কোথাও না-যাওয়া ট্রেন”। দেশটির কুইন্সল্যান্ড প্রদেশের আউটব্যাক অঞ্চলের নরম্যানটন এবং ক্রয়ডন শহরের মধ্যবর্তী ৯৪ মাইলের একক ট্র্যাকে এটি চলে। উনিশ শতকের দিকে স্বর্ণ খোঁজার গুজবের ওপর ভিত্তি করে এই পথটি তৈরি করা হলেও শেষপর্যন্ত কোনো খনির সন্ধান পাওয়া যায়নি। ফলে মূল রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্ন এই পথটিতে এখন 'টিন হেয়ার' নামের একটি বাস-আকৃতির ট্রেন কুমিরসংকুল জলাভূমির মধ্য দিয়ে পাঁচ ঘণ্টার পথ অতিক্রম করে, যা রেলপ্রেমীদের কাছে চরম এক আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দু।

সূত্র: দ্য টেলিগ্রাফ

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন