শিরোনাম
প্রকাশ: ২০:৫১, ২৫ জুলাই ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ে নতুন করে আরও ১৭ জোড়া যাত্রীবাহী ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এর আগে ১৩ জোড়া ট্রেন ইজারায় চলছিল। অর্থাৎ মোট ৩০ জোড়া ট্রেন বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে। রেলওয়ের যুক্তি—কম দূরত্বের ট্রেন সরকারি ব্যবস্থাপনায় পরিচালনা করলে ব্যাপক লোকসান হয়, জনবলও পর্যাপ্ত নেই; তাই ইজারাই আপাতত কার্যকর সমাধান।
কিন্তু এই সিদ্ধান্ত স্বাভাবিকভাবেই একটি বড় প্রশ্ন সামনে এনেছে: যেখানে যাত্রীর অভাব নেই, আসনের চেয়ে বেশি যাত্রী পরিবহন করা হয়, টিকিটের জন্য হাহাকার থাকে—সেখানে লোকসান কেন? যদি একই রেললাইন, একই কোচ, একই ভাড়া এবং একই যাত্রী নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান লাভ করতে পারে, তবে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কেন পারে না? এই প্রশ্ন কেবল রেলওয়ের নয়; এটি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনার দক্ষতা ও জবাবদিহির প্রশ্ন।
টিকিট বিক্রি হয়, তবু লোকসান কেন?
রেলওয়ের তথ্য অনুযায়ী গত দুই অর্থবছরে গড়ে প্রায় পৌনে তিন হাজার কোটি টাকা করে লোকসান হয়েছে। অথচ ট্রেনে যাত্রীসংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। বিশেষ করে আন্তঃনগর ট্রেনগুলোর অধিকাংশ টিকিট অনলাইনে বা কাউন্টারে প্রকাশের কয়েক ঘণ্টা কিংবা কয়েক দিনের মধ্যেই বিক্রি হয়ে যায়। বর্তমানে টিকিট বিক্রি ১০ দিন আগে শুরু হয়; ১১ দিন আগে শুরু হলেও চাহিদার বাস্তবতা বদলাবে না—টিকিট দ্রুতই বিক্রি হয়ে যাবে। ফলে প্রশ্নটি আরও জোরালো হয়— যখন আসন পূর্ণ, তখন লোকসান কীভাবে?
এর উত্তর খুঁজতে হলে আয় ও ব্যয়ের কাঠামো বিশ্লেষণ করতে হবে।
সম্ভাব্য কারণ
রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ স্বীকার করছে, লোকাল, মেইল ও কমিউটার ট্রেনে বিপুলসংখ্যক যাত্রী টিকিট ছাড়া ভ্রমণ করে এবং অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের অর্থ দিয়ে যাতায়াতের অভিযোগ রয়েছে। যদি এমন পরিস্থিতি সত্য হয়, তবে সমস্যার মূল চাহিদার অভাব নয়, বরং রাজস্ব সংগ্রহে ব্যর্থতা।
ইজারায় লাভের হিসাব কী বলে?
রেলওয়ের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, সরকারি ব্যবস্থাপনায় ১৩ জোড়া ট্রেন থেকে বার্ষিক আয় প্রায় ২১ দশমিক ১৭ কোটি টাকা। বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় একই সংখ্যক ট্রেন থেকে আয় প্রায় ৫৮ দশমিক ২৭ কোটি টাকা।
এই ব্যবধান বিস্ময়কর। তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে—ইজারাদাররা ট্রেনচালক, গার্ড ও জ্বালানি সরকারের কাছ থেকেই পাচ্ছে; তারা মূলত টিকিট বিক্রি ও যাত্রী ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব পালন করছে। অর্থাৎ বেসরকারি প্রতিষ্ঠান পুরো অবকাঠামোগত ব্যয় বহন করছে না। ফলে সরাসরি ‘সরকার লোকসান, বেসরকারি লাভ’ বলা কিছুটা সরলীকরণ হতে পারে। বরং বলা যায়, সরকারের বর্তমান রাজস্ব আহরণ ও পরিচালন কাঠামো অকার্যকর।
তাহলে কি রাষ্ট্রও ইজারা দেওয়া হবে?
‘সরকার চালালে লোকসান, বেসরকারিতে লাভ—তবে কি রাষ্ট্রও ইজারা দেওয়া হবে?’—এটি অবশ্যই একটি অলঙ্কারমূলক প্রশ্ন, কিন্তু এর মধ্যে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেবল লাভ করা নয়; জনসেবা নিশ্চিত করাও তার কাজ। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, রেল, বিদ্যুৎ বা পানি—এসব খাতে সামাজিক দায়বদ্ধতা রয়েছে। তবে সামাজিক সেবার অজুহাতে অদক্ষতা, দুর্নীতি ও অপচয়কে বৈধতা দেওয়া যায় না।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান লোকসান করলে প্রথম কাজ হওয়া উচিত:
ইজারা দেওয়া হতে পারে একটি অস্থায়ী ব্যবস্থাপনা কৌশল, কিন্তু এটি স্থায়ী সমাধান নয়।
আন্তর্জাতিক অভিজ্ঞতা কী বলে?
ভারতের রেলওয়ে বিশ্বের বৃহত্তম রাষ্ট্রীয় রেলব্যবস্থাগুলোর একটি। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তাদের পরিচালন অনুপাত প্রায় ৯৮ দশমিক ৩২ শতাংশ। অর্থাৎ ১ রুপি আয় করতে ব্যয় হয়েছে ৯৮ দশমিক ৩২ পয়সা। এটি খুব বেশি লাভজনক না হলেও কার্যত ভারসাম্যপূর্ণ অবস্থান নির্দেশ করে।
কানাডার রেলব্যবস্থা আরও দক্ষ; প্রতি ১ ডলার আয় করতে ব্যয় হয়েছে প্রায় ৬৩ সেন্ট।
এই উদাহরণগুলো দেখায়, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন রেলওয়ে লাভজনক বা অন্তত টেকসইভাবে পরিচালিত হওয়া অসম্ভব নয়। পার্থক্য তৈরি করে ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তি, জবাবদিহি ও বাণিজ্যিক কৌশল।
রেলের প্রকৃত শক্তি কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, রেলের সবচেয়ে বড় আয়ের উৎস হওয়া উচিত মালামাল ও কনটেইনার পরিবহন। বাংলাদেশে একসময় সিমেন্ট, সার, পাট, জ্বালানি ও খাদ্যপণ্য পরিবহনে রেল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখত। সড়ক পরিবহনের সম্প্রসারণ, নীতিগত অগ্রাধিকারহীনতা এবং লজিস্টিক সীমাবদ্ধতার কারণে সেই আয় কমে গেছে।
এ ছাড়া রেলের রয়েছে হাজার হাজার একর জমি, যার একটি বড় অংশ বেদখলে বা অপ্রয়োজনীয়ভাবে পড়ে আছে। এই সম্পদ সুষ্ঠুভাবে ব্যবস্থাপনা করা গেলে উল্লেখযোগ্য আয় সম্ভব।
টিকিট ব্যবস্থার প্রশ্ন
বর্তমান ডিজিটাল টিকিটিং ব্যবস্থা চালুর পরও যদি ব্যাপক টিকিট ফাঁকি থাকে, তবে সেটি প্রযুক্তির ব্যর্থতা নয়; বরং প্রয়োগ ও তদারকির ব্যর্থতা।
এ সমস্যার সমাধান আসতে পারে প্রতিটি কোচে বাধ্যতামূলক টিকিট স্ক্যানিং, মোবাইল টিকিট যাচাইয়ের জন্য হ্যান্ডহেল্ড ডিভাইস, স্টেশন প্রবেশে স্বয়ংক্রিয় গেট ব্যবস্থা, টিকিটবিহীন যাত্রীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক জরিমানা ও দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মীদের কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক মূল্যায়নের মাধ্যমে
যদি ৩ দিনের মধ্যে সব টিকিট বিক্রি হয়ে যায়, তবে অন্তত আসনভিত্তিক রাজস্ব নিশ্চিত হওয়ার কথা। সেক্ষেত্রে লোকসানের বড় অংশ অন্যত্র নিহিত—বিশেষ করে ব্যয় নিয়ন্ত্রণ ও ফাঁকি রোধে।
জনবল সংকট নাকি জনবল ব্যবস্থাপনার সংকট?
রেলওয়ে বলছে চালক, গার্ড, টিটিই ও মাঠপর্যায়ের কর্মীর ঘাটতি রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে বহু ট্রেন দীর্ঘদিন বন্ধ পড়ে আছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বিদ্যমান জনবল কি দক্ষভাবে ব্যবহার হচ্ছে? আধুনিক রেলব্যবস্থায় প্রযুক্তিনির্ভর পরিচালনার মাধ্যমে জনবল প্রয়োজন অনেকাংশে কমানো সম্ভব।
সম্ভাব্য সংস্কারপথ
রেলকে লাভজনক ও জনবান্ধব করতে কিছু পদক্ষেপ বিবেচনা করা যেতে পারে। তা হলো:
১. রাজস্ব ফাঁকি শূন্যে নামানোর কর্মসূচি: ডিজিটাল টিকিট যাচাই, স্টেশন গেট নিয়ন্ত্রণ এবং মোবাইল চেকিং জোরদার করতে হবে।
২. ব্যয় নিরীক্ষা: জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ, ক্রয় ও প্রশাসনিক ব্যয়ের স্বাধীন অডিট প্রয়োজন।
৩. মালবাহী পরিবহন পুনরুজ্জীবন: কনটেইনার টার্মিনাল, শিল্পাঞ্চল সংযোগ এবং দ্রুত পণ্যবাহী করিডর গড়ে তুলতে হবে।
৪. রেলের জমির বাণিজ্যিক ব্যবহার: স্বচ্ছ নিলামের মাধ্যমে বাণিজ্যিক উন্নয়ন, গুদাম, লজিস্টিক পার্ক ও ট্রানজিট সুবিধা গড়ে তোলা যেতে পারে।
৫. শহরকেন্দ্রিক কমিউটার নেটওয়ার্ক: ঢাকা ও অন্যান্য বড় শহরে উচ্চ ফ্রিকোয়েন্সির কমিউটার ট্রেন চালু করলে বিপুল যাত্রী ও আয় পাওয়া সম্ভব।
৬. কর্মক্ষমতা-ভিত্তিক ব্যবস্থাপনা: প্রতিটি ট্রেনের আয়, ব্যয় ও যাত্রীসংখ্যা প্রকাশ করে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
রেলওয়ের বর্তমান পরিস্থিতি আমাদের সামনে একটি অস্বস্তিকর বাস্তবতা তুলে ধরে। সমস্যা যাত্রীর অভাব নয়, ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। ইজারাদার লাভ করছে মানেই বেসরকারিকরণই একমাত্র পথ—এ সিদ্ধান্তে পৌঁছানো তড়িঘড়ি হবে। বরং এটি প্রমাণ করে যে একই সম্পদ থেকে আরও বেশি আয় করা সম্ভব।
রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ব্যর্থতার সমাধান রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব পরিত্যাগ নয়; বরং দক্ষতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানকে পুনর্গঠন করা। বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো একটি কৌশলগত জনপরিবহন ব্যবস্থাকে দীর্ঘমেয়াদে লাভজনক ও টেকসই করতে হলে দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, রাজস্ব আহরণে কঠোরতা, মালবাহী পরিবহন সম্প্রসারণ এবং আধুনিক ব্যবস্থাপনা সংস্কার—এই চারটি ক্ষেত্রেই একযোগে কাজ করতে হবে।
রেল যদি পর্যাপ্ত যাত্রী নিয়েও লোকসান করে, তবে সেটি বাজারের ব্যর্থতা নয়; সেটি ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতা। আর ব্যবস্থাপনার ব্যর্থতার চিকিৎসা ইজারা নয়, সংস্কার।
লেখক : শহিদুল ইসলাম কবির মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্ম কাউন্সিলের সভাপতি।