শিরোনাম
মনিরুজ্জামান মনির
প্রকাশ: ১৫:১৭, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৫:১৮, ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ের কর্মকর্তা মোহাম্মদ সফিকুর রহমানকে ঘিরে ২০২২ সালের ২৬ জানুয়ারির একটি কথিত ডিও (D.O.) লেটার সামনে এনে তাঁর রাজনৈতিক পরিচয় ও পদায়ন নিয়ে নানা দাবি করা হয়েছে। কিন্তু প্রশ্ন হলো—যে নথিকে কেন্দ্র করে একজন সরকারি কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় ও পদায়ন নিয়ে আলোচনা হচ্ছে, সেই নথিটির সত্যতা কি যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে?
কথিত ডিও লেটারের দৃশ্যমান কপিতে সাবেক শিল্পমন্ত্রী নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন-এর নামের বানান, স্মারক নম্বর, নির্বাচনী এলাকার তথ্য, বিভিন্ন শব্দের বানান এবং স্বাক্ষর নিয়ে একাধিক প্রশ্ন উঠেছে।
তাই নথিটি সত্য কি না, তা নির্ধারণে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মূল নথি, ডিসপ্যাচ রেজিস্টার, ই-নথি, অফিস কপি এবং রেল মন্ত্রণালয়ের গ্রহণ-রেকর্ড যাচাই করা জরুরি।
“নথির ছবি নয়- মূল কপি, ডিসপ্যাচ রেজিস্টার ও সরকারি প্রশাসনিক ফাইলই বলবে, ২৬ জানুয়ারি ২০২২-এর কথিত ডিও লেটারটি আদৌ সরকারি নথি কি না।”
মন্ত্রীর নিজের নামেই ভুল—প্রশ্নটা সেখানেইঃ সাবেক শিল্পমন্ত্রীর সঠিক নাম নূরুল মজিদ মাহমুদ হুমায়ূন। কিন্তু কথিত ডিও লেটারে তাঁর নামের বানানে একাধিক পার্থক্য দেখা যাচ্ছে। নামের আগে “মোঃ” ব্যবহারের পাশাপাশি “নূরুল” ও “হুমায়ূন” লেখাতেও অসঙ্গতি রয়েছে বলে নথিটি পর্যালোচনায় দাবি করা হচ্ছে।
একজন মন্ত্রীর দপ্তর থেকে জারি করা সরকারি চিঠিতে মন্ত্রীর নিজের নামের বানান কেন সঠিক থাকবে না—এ প্রশ্ন উঠতেই পারে। তবে শুধু বানানগত ত্রুটি দিয়ে কোনো নথিকে জাল ঘোষণা করা যায় না। এর জন্য প্রয়োজন সরকারি রেকর্ডের যাচাই।
‘মনহরী উপজেলা’- ভুল, নাকি নথির উৎস নিয়ে প্রশ্ন?
কথিত চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে “নরসিংদী-৪ আসনের মনহরী উপজেলা”।
তবে নরসিংদী-৪ সংসদীয় আসন মনোহরদী ও বেলাব উপজেলা নিয়ে গঠিত।
“মনহরী” নামে কোনো উপজেলা নেই বলে সংশ্লিষ্ট তথ্য যাচাইয়ের দাবি উঠেছে।
এখানে প্রশ্ন—সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তর থেকে চিঠিটি সত্যিই জারি হয়ে থাকলে একটি মন্ত্রীর নিজের নির্বাচনী এলাকার উপজেলার নাম এভাবে ভুলভাবে উল্লেখ হলো কীভাবে?
স্মারক নম্বরেও অসঙ্গতির অভিযোগঃ কথিত ডিও লেটারে ব্যবহৃত স্মারক নম্বরের ধরন নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ করা হচ্ছে, সংশ্লিষ্ট সময়ের নথি ব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য যাচাই না করেই পুরোনো ধরনের এনালগ স্মারক নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে। এটি যাচাইয়ের জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের ডিসপ্যাচ রেজিস্টার, ই-নথি রেকর্ড, অফিস কপি এবং স্মারক নম্বরের ধারাবাহিকতা পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
‘প্রধানমন্ত্রী’সহ একাধিক বানান ভুলঃ কথিত ডিও লেটারে ‘প্রধানমন্ত্রী’ শব্দের বানানসহ ‘গণতান্ত্রিক’, ‘ব্যক্তি’, ‘আন্দোলন’ ও ‘ভূমিকা’ শব্দগুলো ভুলভাবে লেখা হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছে।
একই নথিতে মন্ত্রীর নিজের নাম, সরকারি পদবাচ্য এবং একাধিক প্রচলিত বাংলা শব্দে ভুল বানান থাকার বিষয়টি নথিটির উৎস ও প্রস্তুত প্রক্রিয়া সম্পর্কে প্রশ্ন তৈরি করছে।
তবে এসব অসঙ্গতি সর্বোচ্চ যা প্রমাণ করে তা হলো- নথিটি যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন। ফরেনসিক বা সরকারি রেকর্ড ছাড়া এটিকে চূড়ান্তভাবে জাল বলা যায় না।
স্বাক্ষরেও দৃশ্যমান অমিলের দাবিঃ কথিত ডিও লেটারে থাকা মন্ত্রীর স্বাক্ষরের সঙ্গে তাঁর পূর্ববর্তী সরকারি চিঠিপত্র ও পরবর্তী সরকারি নথিতে থাকা স্বাক্ষরের দৃশ্যমান মিল নেই বলে দাবি করা হচ্ছে।
বিশেষ করে ২০২৪ সালের ২৮ মে-র একটি সরকারি নথিতে থাকা স্বাক্ষরের সঙ্গে কথিত ২০২২ সালের ডিও লেটারের স্বাক্ষর তুলনা করে পার্থক্যের কথা বলা হচ্ছে।
স্বাক্ষরটি প্রকৃত কি না, তা নির্ধারণে মূল নথি সংগ্রহ করে প্রয়োজনীয় স্বাক্ষর বিশেষজ্ঞ বা ফরেনসিক পরীক্ষার মাধ্যমে যাচাই করাই হবে অধিকতর নির্ভরযোগ্য পদ্ধতি।
“মন্ত্রীর নাম ভুল, নির্বাচনী এলাকার উপজেলার নাম ভুল, একাধিক বানান ভুল- তবু নথিটি সত্য ধরে রাজনৈতিক পরিচয়ের সিদ্ধান্ত কতটা যুক্তিসঙ্গত?”
ডিও লেটার থাকলে পদায়নের ফাইলে থাকার কথাঃ কথিত ডিও লেটারটির সঙ্গে সফিকুর রহমানের পরবর্তী পদায়নের সম্পর্কের দাবি করা হয়েছে। কিন্তু একটি সুপারিশপত্র থাকলেই সেটি পদায়নের কারণ—এমন সিদ্ধান্তে যাওয়ার আগে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
যদি ওই ডিও লেটারের ভিত্তিতে পদায়ন হয়ে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট নোটশিট, প্রশাসনিক ফাইল, অনুমোদন, মতামত এবং পদায়ন আদেশে তার কোনো না কোনো দাপ্তরিক প্রতিফলন থাকার কথা।
সুতরাং অনুসন্ধানের মূল প্রশ্ন হওয়া উচিত- ডিও নম্বর কত? মূল কপি কোথায়?
ডিসপ্যাচ রেজিস্টারে এন্ট্রি আছে কি? রেল মন্ত্রণালয় চিঠিটি গ্রহণ করেছিল কি?
সংশ্লিষ্ট ফাইলে চিঠিটি সংযুক্ত আছে কি? পদায়নের নোটশিটে এর উল্লেখ আছে কি? রাজনৈতিক পরিচয়—একটি নথিই কি যথেষ্ট?
কথিত ডিও লেটারের পাশাপাশি সফিকুর রহমানের রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন দাবি করা হয়েছে।
এ ধরনের দাবি যাচাইয়ে কোনো একক নথি বা বক্তব্যের ওপর নির্ভর না করে সংশ্লিষ্ট সংগঠনের রেকর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়-সংক্রান্ত তথ্য, সমসাময়িক প্রকাশনা ও অন্যান্য স্বাধীন উৎস পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিচয়কে কোনো সরকারি কর্মকর্তার পদায়নের সঙ্গে যুক্ত করলে তারিখ, নথি ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের ধারাবাহিকতা প্রমাণ করা জরুরি।
সফিকুরের বক্তব্য কী?
প্রকাশিত প্রতিবেদনে উত্থাপিত কথিত ডিও লেটার সম্পর্কে মোহাম্মদ সফিকুর রহমান জানিয়েছেন, সাবেক শিল্পমন্ত্রীর পক্ষ থেকে এমন কোনো ডিও লেটারের বিষয়ে তিনি অবগত নন।
তাঁর এই বক্তব্যও অনুসন্ধানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে তাঁর বিরুদ্ধে উত্থাপিত অন্যান্য প্রশাসনিক অভিযোগ থাকলে সেগুলোও পৃথকভাবে নথি, তদন্ত প্রতিবেদন ও সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্যের ভিত্তিতে যাচাই করা উচিত।
“ডিও লেটার সত্য হলে সরকারি ফাইলে তার ছাপ থাকার কথা; আর সত্য না হলে প্রশ্ন- নথিটি কোথা থেকে এলো?”
নথিটি তৈরি বা প্রচারের উৎস কোথায়? যদি সরকারি রেকর্ড যাচাইয়ের পর দেখা যায় যে কথিত ডিও লেটারটির কোনো সরকারি অস্তিত্ব নেই, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই আরও প্রশ্ন সামনে আসবে- নথিটি কোথা থেকে এসেছে, কে এটি তৈরি বা প্রচার করেছে এবং কী উদ্দেশ্যে তা ব্যবহার করা হয়েছে?
একজন সরকারি কর্মকর্তাকে রাজনৈতিক পরিচয় ও পদায়ন নিয়ে জনসমক্ষে বিতর্কিত করার ক্ষেত্রে কোনো নথি ব্যবহার করা হলে সেই নথির উৎস ও সত্যতা যাচাই করা সাংবাদিকতা ও প্রশাসনিক স্বচ্ছতার উভয় দিক থেকেই গুরুত্বপূর্ণ।
তবে যাচাইয়ের আগে কাউকে নথি জাল করার জন্য দায়ী করা বা উদ্দেশ্য সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোও সমীচীন নয়।
এখন প্রয়োজন সরকারি রেকর্ডের মুখোমুখি যাচাই
কথিত ডিও লেটারের সত্যতা যাচাইয়ে সাবেক শিল্পমন্ত্রীর দপ্তর, শিল্প মন্ত্রণালয়, রেল মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ রেলওয়ের সংরক্ষিত সরকারি নথি পরীক্ষা করা যেতে পারে।
একই সঙ্গে- মূল ডিও লেটার; ডিও নম্বর; ডিসপ্যাচ রেজিস্টার; ই-নথি রেকর্ড;
প্রাপক দপ্তরের রিসিভ রেকর্ড; সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক ফাইল ও নোটশিট; পদায়ন আদেশ; এবং মন্ত্রীর প্রামাণিক স্বাক্ষরের নমুনা
-এসবের মধ্যে মিল-অমিল পরীক্ষা করলেই নথিটির প্রকৃত অবস্থান অনেকটাই স্পষ্ট হতে পারে।
কোনো কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পদায়ন নিয়ে প্রশ্ন উঠতেই পারে। কিন্তু সেই প্রশ্নের উত্তর হওয়া উচিত যাচাইযোগ্য নথি ও সরকারি রেকর্ডে- অনুমান, অসম্পূর্ণ তথ্য কিংবা অনিশ্চিত নথির ওপর নয়।
একটি নথির ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লেই সেটি সরকারি নথিতে পরিণত হয় না। আবার কোনো নথিতে ভুল থাকলেই সেটি স্বয়ংক্রিয়ভাবে জাল প্রমাণিত হয় না। সত্যতা নির্ধারণের জন্য প্রয়োজন উৎস, সংরক্ষণ, প্রেরণ, গ্রহণ এবং প্রশাসনিক ব্যবহারের ধারাবাহিকতা।
সাংবাদিকতার ক্ষেত্রেও একই নীতি প্রযোজ্য। কোনো সরকারি কর্মকর্তার রাজনৈতিক পরিচয় কিংবা পদায়ন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলতে হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য নেওয়ার পাশাপাশি নথির উৎস ও সরকারি রেকর্ড যাচাই করা প্রয়োজন।
কারণ একটি ভুল বা অযাচাইকৃত নথি শুধু একজন ব্যক্তির ভাবমূর্তিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করতে পারে না;
একই সঙ্গে প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সরকারি প্রতিষ্ঠান এবং সংবাদমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
সত্যতা যাচাইয়ের মূলনীতি একটাই- দাবির আগে নথি, নথির আগে উৎস এবং সিদ্ধান্তের আগে স্বাধীন যাচাই।