শিরোনাম
সেলিমুর রহমান
প্রকাশ: ১৪:১৩, ১০ এপ্রিল ২০২৬
সিলেট-আখাউড়া রেলপথে উদ্বেগজনকভাবে দুর্ঘটনা বেড়েছে। ফলে গত ৮ বছরে ১৬টি ট্রেন দুর্ঘটনা ঘটেছে এই রেলপথে; যা যাত্রীদের আতঙ্কিত করে তুলেছে। ১৭৮ কিলোমিটার দৈর্ঘ্যের এ রেলপথে ঘন ঘন দুর্ঘটনার কারণে সেই আতঙ্ক বাড়ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, পাহাড়ি ও দুর্গম এলাকায় চলাচলকারী রেললাইনে পর্যাপ্ত নাট-বোল্ট, ফিসপ্লেট ও ক্লিপ, লাইনের পাথর, লেভেল ক্রসিংয়ের অধিকাংশ ক্লিপ চুরি, পুরোনো ইঞ্জিন ও কোচ সিডিউল বিপর্যয়, ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার মতো বিষয় এবং যাত্রীসেবার মান দিন দিন অবনতির কারণে রেল থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন যাত্রীরা। ১৮৯১ সালে ব্রিটিশ আমলে আসাম বেঙ্গল রেলওয়ের অধীনে সিলেটের সঙ্গে ঢাকা-চট্টগ্রামের যোগাযোগের জন্য রেলপথটি নির্মিত হয়। যাত্রীদের নিরাপদ ও আরামদায়ক ভ্রমণের কথা চিন্তা করে বাংলাদেশ রেলওয়ে ১৯৮৭ সালে আন্তঃনগর ট্রেন চালু করে। ঢাকা-সিলেট রুটে প্রতিদিন কালনি, জয়ন্তিকা, পারাবত, উপবন নামের চারটি আন্তঃনগর ট্রেন চালু রয়েছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য চট্টগ্রাম-সিলেটের মধ্যে পাহাড়িকা ও উদয়ন এক্সপ্রেস নামে দুটি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে আরও জানা যায়, রেলওয়ের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে চলাচলকারী ট্রেনগুলো নিয়ম অনুযায়ী গন্তব্যে পৌঁছার পর ইঞ্জিনগুলোর ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা বিশ্রামে থাকার কথা কিন্তু লোকো ইঞ্জিন সংকটে থাকায় গন্তব্যে পৌঁছার পর অন্য ট্রেনের সঙ্গে জুড়ে দিতে হচ্ছে। ফলে লোকো ইঞ্জিনের বাড়তি চাপ এবং তা প্রায়ই বিকল হয়ে পড়ছে। তাই সময় মতো ট্রেন স্টেশন ছাড়তে কিংবা পৌঁছাতে সিডিউল বিপর্যয়ের সম্মুখীন হচ্ছে। ২০১৯ সালের ২০ সেপ্টেম্বর রাত পৌনে ৪টার দিকে সিলেটগামী আন্তঃনগর উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি শ্রীমঙ্গলের কাছাকাছি আসার পর বিকট শব্দে কেঁপে ওঠে এবং বন্ধ হয়ে যায়। ওই বছরের ১৭ সেপ্টেম্বর ফেঞ্চুগঞ্জের মাইজগাঁও রেলস্টেশনের চট্টগ্রাম থেকে আসা যাত্রীবাহী লোকাল ট্রেনটির একটি বগি লাইনচ্যুত হয়। ৪ সেপ্টেম্বর বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ফেঞ্চুগঞ্জের মল্লিকপুরের কাছে লাইনচ্যুত হলে ৪ ঘণ্টা রেলযোগাযোগ বন্ধ থাকে। ১৬ আগস্ট রাতে মাইজগাঁও রেলস্টেশনে ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি দুর্ঘটনায় পড়লে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তাড়াহুড়ো করে নামতে গিয়ে ১৫ থেকে ২০ জন যাত্রী আহত হন।১৯ জুলাই সকালে ঢাকাগামী আন্তঃনগর জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনটির একটি কোচ কুলাউড়া রেলস্টেশনের কাছে লাইনচ্যুত হলে ট্রেন থেকে নামতে গিয়ে বেশ কিছু যাত্রী আহত হন। পরদিন ২০ জুলাই ঢাকাগামী আন্তঃনগর কালনী এক্সপ্রেস একই স্থানে দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। ৭ জুলাই কুলাউড়ার হাজীপুরের পালকি ও মনু সেতুর মাঝখানে একটি গরু ট্রেনটিকে ধাক্কা দিলে লোকো ইঞ্জিনের হুসপাইপ ভেঙে ট্রেন থেমে যায়। ২৮ জুন অতিবৃষ্টির কারণে চট্টগ্রামগামী পাহাড়িকা এক্সপ্রেস বরমচালের বড়ছড়া সেতু ঝুঁকিপূর্ণ হওয়ায় আটকা পড়ে। ২৩ জুন কুলাউড়ার বরমচাল এলাকায় ঢাকাগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটি বড় ধরনের দুর্ঘটনায় পড়ে। এ ঘটনায় ৪ যাত্রী নিহত ও অর্ধশতাধিক আহত হন। ২ জুন হবিগঞ্জের বাহুবলের রশিদপুর স্টেশনে কুশিয়ারা ট্রেন লাইনচ্যুত হলে বেশ কয়েক ঘণ্টা রেলযোগাযোগ বন্ধ থাকে। ২০২০ সালে কভিড-১৯-এর সময় প্রায় ২০ মাস ট্রেন চলাচল বন্ধ ছিল। ২৭ জুন বুধবার রাতে ফেঞ্চুগঞ্জের কটালপুর রেল দুর্ঘটনায় সারাদেশের সাথে সিলেটের রেল যোগাযোগ প্রায় ৮ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। সেই সঙ্গে বেঁচে যায় ওই ট্রেনের ৯ শতাধিক যাত্রীর প্রাণ। সন্ধ্যা সাড়ে ৬টায় পাহাড়িকা এক্সপ্রেস ট্রেনটি মাইজগাঁও রেলস্টেশনে যাত্রাবিরতি শেষে সিলেটের উদ্দেশে রওনা হলে ফেঞ্চুগঞ্জের কটালপুর মাঝপাড়ার কাছে রত্না নদী সেতুর ওপর ওঠার পর ট্রেনটির পেছনের দিকের ৫-৬টি বগি মূল ট্রেন থেকে আলাদা হলে চলতে থাকে। বিষয়টি ওই লোকো মাস্টারের নজরে এলে তিনি তৎক্ষণাৎ হার্ড ব্রেক কষে ট্রেনটি থামিয়ে দিলে পেছনের দিক থেকে ছুটে আসা ট্রেনের অন্য অংশটি লাইনের ওপর দাঁড়িয়ে থাকা ট্রেনের মূল অংশকে সজোরে ধাক্কা দিলে ট্রেনের তিটি কোচ লাইনচ্যুত হয়ে যায়। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান ট্রেনের ৯ শতাধিক যাত্রী। এ সময় ট্রেনের ভেতরে থাকা প্রায় অর্ধশত যাত্রী ভয়ে নেমে যাওয়ার সময় অল্পবিস্তর আহত হন। বিকট শব্দে ট্রেন থামতে দেখে পার্শ্ববর্তী কটালপুর বাজার থেকে অসংখ্য মানুষ ট্রেনযাত্রীদের সাহায্যার্থে ছুটে আসেন। রাত ২টার দিকে কুলাউড়া থেকে রিলিফ ট্রেনটি দুর্ঘটনাকবলিত ট্রেনটিকে পার্শ্ববর্তী মাইজগাঁও রেলস্টেশনে নিয়ে আসার সময় সেটির কোচ আবারও দুর্ঘটনায় পড়ে যায়। ২০২৪ সালে চট্টগ্রাম থেকে ছেড়ে আসা সিলেটগামী আন্তঃনগর উদয়ন এক্সপ্রেস ট্রেন দক্ষিণ সুরমা উপজেলার মোগলা বাজার রেল স্টেশনের কাছে তিনটি বগি লাইনচ্যুত হলে সিলেটের সঙ্গে ঢাকা ও চট্টগ্রামের সঙ্গে সিলেটের সরাসরি রেলযোগাযোগ ৩ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। ২৫ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সিলেট থেকে ছেড়ে আসা ঢাকাগামী জয়ন্তিকা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিন ফেঞ্চুগঞ্জ রেলসেতুর ওপর বিকল হয়ে পড়লে যাত্রীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। গত ৩১ মার্চ সকালে ঢাকা থেকে আসা সিলেটগামী উপবন এক্সপ্রেস ট্রেনটির ইঞ্জিন মৌলভীবাজারের ভানুগাছ ও শমশেরনগর রেলস্টেশনের মধ্যবর্তী পূর্ব কালিপুর এলাকা অতিক্রমকালে বিকল হয়ে পড়ে। পড়ায় সারাদেশের সাথে ৩ ঘণ্টা রেলযোগাযোগ বন্ধ থাকে। পরে শমশেরনগর রেলস্টেশনে আটকে পড়া ঢাকাগামী কালনি এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন দিয়ে ট্রেনটিকে শমশেরনগর রেলস্টেশনে আনা হয়। সর্বশেষ গত ২ এপ্রিল হবিগঞ্জের মনতলা এলাকায় চট্রগ্রাম থেকে সিলেটগামী ৯৫১ আপ তেলবাহী ট্রেনের ৬টি ট্যাঙ্কার ভয়াবহ দুর্ঘটনার শিকার হয়ে প্রায় ১১ ঘণ্টা রেলযোগাযোগ বন্ধ হয়ে পড়ে। ট্রেনযাত্রী মণিলাল ভৌমিক জানান, সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের বর্তমান অবস্থা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ব্রিটিশ আমলের পুরোনো ও ঝুঁকিপূর্ণ রেললাইন ব্যবহার করে ট্রেন চালানো হচ্ছে; যা যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে ভয়াবহ ঝুঁকি তৈরি করছে। একের পর এক রেল দুর্ঘটনার পরও গুরুত্বপূর্ণ এ রুটের রেলপথ সংস্কারের বড় কোনো দৃশ্যমান পদক্ষেপ নিতে দেখা যাচ্ছে না। সেকশনের প্রতি ক্ষেত্রেই সংকট
শত বছরের লাইনে ত্রুটি নিয়ে ঝুঁকিতে রয়েছে সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশন। ট্রেনে নিরাপদ ভ্রমণ থাকলেও সিলেট-আখাউড়া সেকশনে অন্তহীন ভোগান্তিতে রয়েছেন যাত্রীরা।
ত্রুটিযুক্ত ইঞ্জিন, টিকিট সংকট, জরাজীর্ণ অবকাঠামো ও ট্রেনের শিডিউল বিপর্যয় এই সেকশনের নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দীর্ঘদিনের এসব সমস্যা জিইয়ে থাকায় গত বছরে সিলেট, কুলাউড়া, শমশেরনগর, শ্রীমঙ্গল, ভানুগাছসহ বিভিন্ন স্টেশনে স্থানীয়রা আন্দোলন করেন। তার পরও কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে সমস্যা সমাধানে কোনো পদক্ষেপ চোখে পড়েনি। সিলেট-আখাউড়া রেল সেকশনের আওতাভুক্ত রেলপথের জয়েন্টগুলোতে নেই নাট-বোল্ট, ভেঙে গেছে স্লিপার। এমনকি কি লাইনের পাথরও চুরি হয়ে গেছে। সেকশনের অধিকাংশ সেতুর মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে ও ত্রুটিপূর্ণ।
গত এক মাসে এই রুটে ইঞ্জিন বিকল হয়ে বিলম্বে গন্তব্যে পৌঁছে অন্তত ৪০টি ট্রেন। ট্রেনে আসন সংকটসহ চরমভাবে ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে এই অঞ্চলের মানুষকে।
সর্বশেষ ১ এপ্রিল জ্বালানি তেলবাহী ট্রেনটি চট্টগ্রাম থেকে সিলেট যাচ্ছিল। রাত সাড়ে ৯টার দিকে মাধবপুরের মনতলা রেলস্টেশন অতিক্রমকালে এর ছয়টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এর মধ্যে একটি বগি লাইনের পাশে খাদে পড়ে যায়। এ ঘটনায় সিলেটের সঙ্গে সারা দেশের রেল যোগাযোগ ১৬ ঘণ্টা বন্ধ থাকে। বর্তমানে ঢাকা ও চট্টগ্রাম থেকে সিলেট রুটে প্রতিদিন ছয়টি আন্তঃনগর ট্রেন চলাচল করে। এর মধ্যে চারটি ট্রেন সিলেট-ঢাকা এবং দুটি সিলেট-চট্টগ্রাম লাইনে চলে। পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট-আখাউড়া সেকশনের জয়েন্টগুলোতে বয়সের ভারে ক্লিপ, হুক, নাট-বোল্ট, স্লিপার, ফিশপ্লেট, গার্ডার প্রায় অকেজো হয়ে গেছে। সেকশনের কমলগঞ্জ উপজেলার লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানের আট কিলোমিটার রেলপথে রয়েছে পাহাড়ি অংশ। ছোট-বড় ছয়টি কালভার্ট ব্রিজের বেশির ভাগই নাজুক।