শিরোনাম
রেল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ১৪:৪২, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ১৪:৪২, ২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
সংগৃহীত ছবি
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক আফজাল হোসেনকে ঘিরে পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের অডিট আপত্তি নিয়ে ধারাবাহিক প্রচারণা এবং এর পেছনে স্বার্থান্বেষী মহলের কোনো ভূমিকা রয়েছে কি না—এ প্রশ্ন তুলেছেন সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির।
তিনি বলেছেন, অডিট আপত্তি থাকা আর দুর্নীতি প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। অভিযোগ থাকলে তা যথাযথ তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে অভিযোগের উৎস, উদ্দেশ্য এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের সম্ভাব্য স্বার্থও খতিয়ে দেখা উচিত।
এক বিবৃতিতে মনিরুজ্জামান মনির বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ে দীর্ঘদিন ধরে লোকসান, ইঞ্জিন ও কোচ সংকট, জনবল ঘাটতি, পুরোনো অবকাঠামো, রক্ষণাবেক্ষণের দুর্বলতা এবং প্রশাসনিক জটিলতার মতো নানা সমস্যার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় রেলওয়েকে দক্ষ ও লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে স্থিতিশীল প্রশাসন, কঠিন সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা এবং স্বার্থান্বেষী চাপমুক্ত পরিবেশ প্রয়োজন।
পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের অডিট আপত্তির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, সরকারি অর্থ ব্যয়ের ক্ষেত্রে অডিট আপত্তি একটি স্বাভাবিক জবাবদিহিমূলক প্রক্রিয়া। অডিট আপত্তির জবাব দেওয়া, নথিপত্র যাচাই এবং নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় তা নিষ্পত্তি করা হয়। তাই কোনো অডিট আপত্তিকে সরাসরি ব্যক্তিগত দুর্নীতির প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপনের আগে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার ভূমিকা, সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তিগত আর্থিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা প্রয়োজন।
মনিরুজ্জামান মনির বলেন, “অডিট একটি প্রশ্ন তুলতে পারে; অপরাধ প্রমাণ করে তদন্ত ও আইনগত প্রক্রিয়া।” তাঁর মতে, এই পার্থক্য ইচ্ছাকৃতভাবে মুছে দিলে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, রেলওয়ের বড় একটি অংশ ঠিকাদারি কার্যক্রমের সঙ্গে সম্পৃক্ত। প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রে সবাই কাজ পাবেন না। তবে কাজ না পাওয়ার পর কোনো ঠিকাদার বা সংশ্লিষ্ট পক্ষের অভিযোগের ক্ষেত্রে অভিযোগটি সত্য কি না, তার পাশাপাশি অভিযোগকারীর সম্ভাব্য স্বার্থও যাচাই করা প্রয়োজন।
এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি দরপত্রে অংশ নিয়েছিলেন কি না, কাজ না পাওয়ার পরই অভিযোগ এসেছে কি না, অভিযোগের পক্ষে নথিপত্র রয়েছে কি না এবং কোনো সিদ্ধান্ত পরিবর্তনের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে কি না—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।
বদলি ও পদায়ন প্রসঙ্গে মনিরুজ্জামান মনির বলেন, রেলওয়ের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বদলি-পদায়ন একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। তবে কোনো গোষ্ঠী যদি বদলি-পদায়নকে তদবির বা আর্থিক সুবিধা আদায়ের মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে, তা প্রতিষ্ঠানের জন্য গুরুতর হুমকি।
তিনি অভিযোগের বিষয়টি উল্লেখ করে বলেন, কোনো কর্মকর্তা প্রশাসনিক প্রয়োজন বা বিধি অনুযায়ী তদবিরে সম্মত না হলে তাঁর বিরুদ্ধে গণমাধ্যমে নেতিবাচক প্রচারণা চালানো হয় কি না, সেটিও খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালকের পদ ঘিরে কোনো অভ্যন্তরীণ প্রতিযোগিতা বা ব্যক্তিগত স্বার্থ থেকে বর্তমান নেতৃত্বকে দুর্বল করার চেষ্টা হচ্ছে কি না—সেটিও অনুসন্ধানের দাবি জানিয়েছেন তিনি। তবে প্রমাণ ছাড়া কোনো কর্মকর্তা বা ব্যক্তিকে এমন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত না করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
মনিরুজ্জামান মনিরের মতে, একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা যদি প্রতিটি সিদ্ধান্তের পর অভিযোগ ও অপপ্রচারের আশঙ্কায় থাকেন, তাহলে সিদ্ধান্ত গ্রহণের গতি ব্যাহত হতে পারে। এতে ফাইল ও প্রকল্পের কাজ বিলম্বিত হওয়ার পাশাপাশি সংস্কারমূলক উদ্যোগও বাধাগ্রস্ত হতে পারে। শেষ পর্যন্ত এর প্রভাব পড়বে রাষ্ট্র ও সাধারণ জনগণের ওপর।
গণমাধ্যমের ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দুর্নীতি অনুসন্ধান সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। তবে অভিযোগ এবং প্রমাণিত দুর্নীতিকে এক করে দেখা উচিত নয়। কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ উঠলে তার প্রমাণ, অভিযোগকারীর স্বার্থ, অভিযুক্তের বক্তব্য এবং সংশ্লিষ্ট নথিপত্র যাচাই করে সংবাদ প্রকাশ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, গণমাধ্যম কোনো পক্ষের ওপর চাপ তৈরির হাতিয়ার নয়; সত্য অনুসন্ধানই গণমাধ্যমের মূল দায়িত্ব।
মনিরুজ্জামান মনির পদ্মা রেল সেতু প্রকল্পের অডিট আপত্তির দ্রুত ও স্বচ্ছ নিষ্পত্তির দাবি জানিয়ে বলেন, দুর্নীতি থাকলে তদন্ত করতে হবে এবং প্রমাণিত হলে শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ঠিকাদারি কাজ, বদলি-পদায়ন এবং ধারাবাহিক গণমাধ্যম প্রচারণার মধ্যে কোনো যোগসূত্র রয়েছে কি না, প্রয়োজনে সেটিও তদন্ত করা উচিত।
তিনি আরও বলেন, কাজ না পাওয়া, বদলির তদবির প্রত্যাখ্যান কিংবা কোনো প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের পর নির্দিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অভিযোগ উঠলে অভিযোগের উৎস ও উদ্দেশ্যও তদন্তের আওতায় আসা প্রয়োজন।
সবশেষে তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রয়োজন দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসন, সিন্ডিকেটমুক্ত সিদ্ধান্ত এবং প্রমাণভিত্তিক জবাবদিহি। অডিট আপত্তি থাকলে তার জবাব দিতে হবে, দুর্নীতি থাকলে তদন্ত করতে হবে, অভিযোগ থাকলে প্রমাণ করতে হবে এবং কোনো সিন্ডিকেট থাকলে তা চিহ্নিত করে ব্যবস্থা নিতে হবে।
তাঁর ভাষায়, “একজন কর্মকর্তাকে প্রমাণ ছাড়া দুর্নীতিবাজ বানানো যেমন অন্যায়, তেমনি প্রকৃত দুর্নীতিকে আড়াল করাও অপরাধের সমান ক্ষতিকর।”
তিনি বলেন, বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক কে হবেন, তা নির্ধারিত হওয়া উচিত যোগ্যতা, অভিজ্ঞতা, দক্ষতা এবং সরকারের যথাযথ সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে। কোনো সিন্ডিকেট, তদবির বা অপপ্রচার সেই প্রক্রিয়ার বিকল্প হতে পারে না।
মনিরুজ্জামান মনিরের বক্তব্য অনুযায়ী, বিষয়টি কোনো ব্যক্তি বনাম তাঁর সমালোচকদের লড়াই নয়; বরং একটি রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে স্বার্থান্বেষী প্রভাবমুক্ত রেখে দক্ষ, স্বচ্ছ ও কার্যকর প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার প্রশ্ন। তিনি বলেন, “রেলওয়ের চেয়ার কোনো ব্যক্তি বা সিন্ডিকেটের নয়। রেলওয়ের চেয়ার রেলের—আর রেল জনগণের।”