ঢাকা, মঙ্গলবার, ১৮ আগস্ট ২০২৬

৩ ভাদ্র ১৪৩৩

রেল পরিচালনায় নতুন সমীকরণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আরও ট্রেন, সামনে জবাবদিহির পরীক্ষা

স্বপন কুমার সিং, শ্রীমঙ্গল সংবাদ দাতা

প্রকাশ: ২৩:২৩, ১৭ আগস্ট ২০২৬

রেল পরিচালনায় নতুন সমীকরণ বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় আরও ট্রেন, সামনে জবাবদিহির পরীক্ষা

বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসান কমানো এবং রাজস্ব আদায় বাড়াতে ট্রেন পরিচালনার বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপনায় বেসরকারি অংশগ্রহণ আরও বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পূর্বাঞ্চলের পর এবার পশ্চিমাঞ্চলের লোকাল ও মেইল ট্রেনও ইজারা দেওয়ার পরিকল্পনা সামনে এসেছে।

রেলওয়ের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, পূর্বাঞ্চলের আরও ৬ টি ট্রেন বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে এ অঞ্চলে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা ট্রেনের সংখ্যা ১৪টিতে পৌঁছানোর কথা। একই সময়ে পশ্চিমাঞ্চলের আরও ১১টি মেইল ও লোকাল ট্রেন ইজারা দেওয়ার প্রস্তাব রেলওয়ে সদর দপ্তরে পাঠানো হয়েছে।

নতুন ব্যবস্থায় ট্রেনের মূল পরিচালনা, চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও নিরাপত্তার দায়িত্ব বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছেই থাকবে। অন্যদিকে টিকিট পরীক্ষা, ভাড়া আদায়, পরিচ্ছন্নতা ও যাত্রীসেবার মতো বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের হাতে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।


জনবল সংকটেই বাড়ছে বেসরকারি নির্ভরতা

রেলের পূর্বাঞ্চলে অনুমোদিত ২২ হাজার ৩৫৮টি পদের বিপরীতে কর্মরত রয়েছেন ১১ হাজার ৫২২ জন। অর্থাৎ বড় একটি জনবল ঘাটতি নিয়েই পরিচালন কার্যক্রম চালাতে হচ্ছে। বিশেষ করে টিকিট পরীক্ষক ও ভাড়া আদায়ের কাজে জনবল সংকট থাকায় লোকাল ও কমিউটার ট্রেনে টিকিটবিহীন যাত্রীর সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।

রেল কর্মকর্তাদের হিসাবে, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় যাওয়ার পর কয়েকটি ট্রেনের আয় উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। 

সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা ট্রেনগুলো সরকারি ব্যবস্থাপনার তুলনায় প্রায় ২৫ থেকে ৫০ শতাংশ বেশি রাজস্ব আয় করেছে।

এমনকি জামালপুর কমিউটার, দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার ও মহুয়া কমিউটারের মতো ট্রেনের আয়ও ব্যবস্থাপনা পরিবর্তনের পর উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে বলে রেলওয়ের তথ্য বলছে।


পশ্চিমাঞ্চলেও একই পথে হাঁটার প্রস্তুতি

পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের রাজস্ব ঘাটতিও নতুন সিদ্ধান্তের অন্যতম কারণ। 

২০২৩-২৪ অর্থবছরে ১ হাজার ১৭৭ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছিল প্রায় ৬৪৯ কোটি টাকা। পরের অর্থবছরে ১ হাজার ১৬০ কোটি টাকা লক্ষ্যের বিপরীতে আয় দাঁড়ায় প্রায় ৬২১ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ১০ মাসে ৮২৫ কোটি টাকা লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে আয় হয়েছে প্রায় ৫৬৬ কোটি টাকা।

রেলওয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, কম ভাড়া, পরিচালন ব্যয়, টিকিট ফাঁকি এবং প্রয়োজনীয় জনবলের ঘাটতির কারণে অনেক মেইল ও লোকাল ট্রেন কাঙ্ক্ষিত আয় করতে পারছে না। তাই অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের পরিবর্তে বেসরকারি ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে আয় বাড়ানোর পথকে তুলনামূলক কার্যকর মনে করছে কর্তৃপক্ষ।

জনমনে প্রশ্ন আয় বাড়লেই কি যাত্রীসেবা বাড়বে?

তবে বেসরকারি ব্যবস্থাপনা সম্প্রসারণের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নও সামনে এসেছে—রাজস্ব বাড়ার সুফল কতটা যাত্রীসেবায় প্রতিফলিত হবে?

টিকিট সংগ্রহ বাড়ানো সম্ভব হলেও ট্রেনের সময়ানুবর্তিতা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, আসন ব্যবস্থাপনা, যাত্রী হয়রানি বন্ধ এবং অভিযোগের দ্রুত নিষ্পত্তির মতো বিষয়েও একই ধরনের নজরদারি প্রয়োজন।

এর আগে বেসরকারি ব্যবস্থাপনায় থাকা ২৪টি ট্রেনের ইজারা বাতিল করে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের সিদ্ধান্ত নিয়েছিল রেলপথ মন্ত্রণালয়। চুক্তির শর্ত লঙ্ঘন ও দরপত্র প্রক্রিয়া নিয়ে অভিযোগের প্রেক্ষাপটে ওই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। ফলে নতুন ব্যবস্থায় স্বচ্ছ দরপত্র ও কঠোর চুক্তি বাস্তবায়ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।

সামনে রেলের জন্য নতুন পরীক্ষা
বেসরকারি ব্যবস্থাপনা রেলের রাজস্ব বাড়ানোর একটি হাতিয়ার হতে পারে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে এর সাফল্য নির্ভর করবে ব্যবস্থাপনার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির ওপর।

রেলওয়ের দায়িত্ব থাকবে কোন প্রতিষ্ঠানকে কী শর্তে দায়িত্ব দেওয়া হচ্ছে, তাঁরা কতটা আয় করছে, যাত্রীদের কাছ থেকে কী ধরনের অভিযোগ আসছে এবং চুক্তির শর্ত ঠিকভাবে মানা হচ্ছে কি না এসব নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা ।

কারণ শুধু লোকসানি ট্রেনকে লাভজনক করা নয়, কম খরচে নিরাপদ, সময়নিষ্ঠ ও হয়রানিমুক্ত যাত্রীসেবা নিশ্চিত করাই হবে এই নতুন ব্যবস্থাপনা নীতির সবচেয়ে বড় সাফল্যের মাপকাঠি।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন