প্রকাশ: ১৩:০৪, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১৩:০৪, ১৯ জানুয়ারি ২০২৬
মনিরুজ্জামান মনির:
বাংলাদেশ রেলওয়ের সুষ্ঠু পরিচালনা নিয়ে নতুন করে কিছু বলার অবকাশ আর নেই। কারণ এখানে অব্যবস্থাপনা কোনো সাময়িক ব্যর্থতা নয়—এটি দীর্ঘদিনের লালিত একটি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি। বছরের পর বছর ধরে যে অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে, তার কার্যকর সমাধান হয়নি; বরং সমস্যাগুলো আরও গভীর ও বিস্তৃত হয়েছে। বর্তমান বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট বোঝা যায়—বাংলাদেশ রেলওয়ের সামনে অপেক্ষা করছে আরও ভয়ংকর প্রশাসনিক স্থবিরতা ও ব্যবস্থাপনার ধস। কেউ তা স্বীকার করুক বা না-ই করুক, বাস্তবতা অনিবার্য।
এই চরম সংকটের দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও রেলপথ মন্ত্রণালয়—এই তিনটি মন্ত্রণালয়ের একতরফা সিদ্ধান্ত ও নিয়ন্ত্রণ প্রবণতা বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রশাসনিক সক্ষমতাকে কার্যত অকার্যকর করে ফেলেছে। মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা, অপারেশনাল চাহিদা ও পেশাগত অভিজ্ঞতাকে উপেক্ষা করে কাগুজে সিদ্ধান্ত চাপিয়ে দেওয়াই এখন নীতিতে পরিণত হয়েছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ রেলওয়ের অভ্যন্তরে কিছু দুর্নীতিবাজ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার হাতে নীতিনির্ধারণ ও পরিচালনার ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হওয়ায় প্রতিষ্ঠানটি আজ একটি সিন্ডিকেটনির্ভর ব্যবস্থায় বন্দি। নিয়োগ, বদলি, পদোন্নতি, প্রকল্প ও ক্রয়—সবখানেই স্বচ্ছতার বদলে প্রাধান্য পাচ্ছে লেনদেন, তদবির ও আনুগত্য।
ট্রেড ইউনিয়ন: অধিকার রক্ষক থেকে ক্ষমতার সহচরঃ
তবে এই সংকটের দায় শুধু আমলাতন্ত্র ও মন্ত্রণালয়ের ঘাড়ে চাপিয়ে দিলে সত্য অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। বাংলাদেশ রেলওয়ের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভূমিকাও আজ গভীরভাবে প্রশ্নবিদ্ধ। যে ট্রেড ইউনিয়নগুলো কর্মচারীদের ন্যায়সংগত অধিকার, সামাজিক অধিকার ও মানবাধিকার রক্ষার অগ্রভাগে থাকার কথা ছিল, সেগুলো আজ রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তিক সংগঠনে পরিণত হয়েছে।
রেলওয়ে কর্মচারীরা আজ আর নাগরিক ও শ্রমিক হিসেবে নয়, বরং ভোটের রাজনীতির উপকরণ হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ইউনিয়ন নেতৃত্ব নির্ধারিত হচ্ছে কর্মচারীদের আস্থা ও ত্যাগের ভিত্তিতে নয়, বরং রাজনৈতিক আনুগত্যের ভিত্তিতে। এর ফলে ট্রেড ইউনিয়ন কার্যত কর্মচারীদের প্রতিনিধিত্ব হারিয়েছে।
অধিকার প্রশ্নে নীরবতা, সুবিধা প্রশ্নে সক্রিয়তাঃ
বেতন–ভাতা, নিরাপদ কর্মপরিবেশ, স্বচ্ছ পদোন্নতি, চিকিৎসা, পেনশন ও আবাসন—এই মৌলিক অধিকার প্রশ্নে ট্রেড ইউনিয়নগুলোর ভূমিকা আজ প্রায় অনুপস্থিত। কিন্তু বদলি, পদোন্নতি ও নিয়োগে প্রভাব খাটানোর প্রশ্নে একটি অংশ অস্বাভাবিকভাবে সক্রিয়।
বাস্তবতা হলো—বদলি–পদোন্নতি–নিয়োগ বাণিজ্যে ট্রেড ইউনিয়নের একটি বড় অংশ সরাসরি বা পরোক্ষভাবে যুক্ত। প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতার মাধ্যমে ব্যক্তিগত সুবিধা আদায়ই হয়ে উঠেছে অনেক নেতার প্রধান লক্ষ্য। এর ফলে যোগ্যতা ও জ্যেষ্ঠতার পরিবর্তে সুপারিশ ও লেনদেনই ক্যারিয়ার নির্ধারণের মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে।
রাজনৈতিক ও পারিবারিক ঠিকাদারি: নীরব সহযোগিতাঃ
বাংলাদেশ রেলওয়ের আরেকটি বড় অভিশাপ রাজনৈতিক ও পারিবারিক ঠিকাদারি ব্যবস্থা। বহু প্রকল্প ও সেবামূলক কাজ এমন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের হাতে, যাদের যোগ্যতার চেয়ে রাজনৈতিক পরিচয় ও পারিবারিক সম্পর্কই মুখ্য। দুঃখজনক হলেও সত্য—এই অনিয়মের বিরুদ্ধে ট্রেড ইউনিয়নের শক্ত কোনো প্রতিবাদ নেই। কোথাও কোথাও ইউনিয়ন নেতাদের ঘনিষ্ঠজন বা পরিবারের সদস্যরাই এই ব্যবস্থার সুবিধাভোগী।
লোক দেখানো সংগঠন, হারানো আস্থাঃ
আজকের ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম অনেকটাই লোক দেখানো আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ। সভা, ব্যানার, বিবৃতি হয়—কিন্তু বাস্তব পরিবর্তন হয় না। ফলে সাধারণ রেলওয়ে কর্মচারীদের মধ্যে ইউনিয়নের প্রতি আস্থা ভেঙে পড়েছে। এই আস্থাহীনতা রেলওয়ের সামগ্রিক প্রশাসনিক সংকটকে আরও গভীর করছে।
উত্তরণের পথঃ
বাংলাদেশ রেলওয়েকে এই অচলাবস্থা থেকে রক্ষা করতে হলে এখনই প্রয়োজন—
প্রশাসনিক স্বাধীনতা পুনঃপ্রতিষ্ঠা, দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা ও সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক ব্যবস্থা,
রাজনীতিমুক্ত, গণতান্ত্রিক ও কর্মচারীবান্ধব ট্রেড ইউনিয়ন পুনর্গঠন, স্বচ্ছ বদলি–পদোন্নতি–নিয়োগ ব্যবস্থা, এবং রাজনৈতিক ও পারিবারিক ঠিকাদারি উচ্ছেদ।
বাংলাদেশ রেলওয়ে শুধু একটি পরিবহন সংস্থা নয়—এটি রাষ্ট্রের অর্থনীতি, সামাজিক সংযোগ ও জাতীয় সক্ষমতার প্রতীক। এই প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংসের মুখে ঠেলে দেওয়ার দায় শুধু মন্ত্রণালয় বা আমলাতন্ত্রের নয়; দায় আছে দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তা, সুবিধাবাদী ট্রেড ইউনিয়ন নেতৃত্ব এবং নৈতিকতাহীন রাজনৈতিক ব্যবস্থারও।
সত্য স্বীকার না করলে, দায় নির্ধারণ না করলে এবং কাঠামোগত সংস্কারে না গেলে—বাংলাদেশ রেলওয়ের সামনে অপেক্ষা করছে অচলাবস্থা নয়, প্রাতিষ্ঠানিক পতন।
লেখকঃ সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি