প্রকাশ: ১২:২২, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ১২:২৩, ২ ফেব্রুয়ারি ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ের বিদ্যমান সম্পূর্ণ অনলাইনভিত্তিক টিকিটিং ব্যবস্থার পরিবর্তে একইসঙ্গে অনলাইন ও অফলাইনে টিকিট বিক্রয় চালু করা হবে না কেন—তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেছেন হাইকোর্ট। রোববার (১ ফেব্রুয়ারি) বিচারপতি ফাহমিদা কাদের ও বিচারপতি মো. আসিফ হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্ট বেঞ্চ এই রুল জারি করেন।
রুলে আইসিটি বিশেষজ্ঞ, নাগরিক সমাজের প্রতিনিধি ও সংশ্লিষ্ট স্টেকহোল্ডারদের সঙ্গে পরামর্শক্রমে অনলাইন ও অফলাইন—উভয় পদ্ধতিতে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থা চালু না করার কারণ জানতে চাওয়া হয়েছে। আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে ছিলেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল মুহাম্মদ শফিকুর রহমান এবং রিটের পক্ষে ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মিয়াজী আলমগীর আলম চৌধুরী।
আইনজীবী মিয়াজী আলমগীর আলম চৌধুরী জানান, সংবিধানের ৩৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নাগরিকদের বাংলাদেশের সর্বত্র অবাধে চলাচলের অধিকার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে জনস্বার্থে এই রিট করা হয়েছে। আবেদনের ওপর শুনানি শেষে হাইকোর্ট রুল জারি করেন।
এই রিটের পেছনে মূল প্রেক্ষাপট হিসেবে উঠে আসে সিলেটের জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার আলমের একটি মন্তব্য। গত ১৫ অক্টোবর সিলেট রেলস্টেশন পরিদর্শন শেষে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, “অনলাইনে দুই মিনিটে টিকিট শেষ হয়ে যাওয়া কোনো সিস্টেম হতে পারে না।” তিনি আরও বলেন, যার নামে টিকিট কাটা হচ্ছে, তিনি ভ্রমণ না করে অন্য কেউ ভ্রমণ করায় কালোবাজারিরা সুযোগ নিচ্ছে। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে গ্রহণযোগ্য সমাধান খোঁজা হচ্ছে বলেও জানান তিনি।
তবে এই পুরো আলোচনায় একটি মৌলিক বাস্তবতা প্রায় উপেক্ষিত থেকেই যাচ্ছে—তা হলো যাত্রী চাহিদা ও ট্রেনের সংখ্যার ভয়াবহ অসামঞ্জস্য।
এ বিষয়ে রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন,
“অনলাইন হোক বা অফলাইন—যে লাইনেই টিকিট বিক্রি করা হোক না কেন, টিকিটের সংকট থাকবেই। কারণ যাত্রী চাহিদার তুলনায় ট্রেনের সংখ্যা অত্যন্ত নগণ্য। যতদিন যাত্রী চাহিদা অনুযায়ী ট্রেনের সংখ্যা বাড়ানো হবে না, ততদিন টিকিট যেকোনো পদ্ধতিতেই দ্রুত শেষ হয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, টিকিট বিক্রির পদ্ধতি নিয়ে আলোচনার আগে রেলওয়ের সক্ষমতা ও কাঠামোগত সীমাবদ্ধতা স্বীকার করা জরুরি। প্রতিদিন লাখো মানুষ রেলে ভ্রমণের চেষ্টা করলেও সেই অনুপাতে কোচ, ইঞ্জিন ও ট্রেন সার্ভিস বাড়েনি। ফলে স্বাভাবিকভাবেই কয়েক মিনিটের মধ্যেই টিকিট শেষ হয়ে যায়, যা শুধু প্রযুক্তিগত সমস্যা নয়—বরং নীতিগত ও পরিকল্পনাগত ব্যর্থতার প্রতিফলন।
মনিরুজ্জামান মনির মনে করেন, অনলাইন ও অফলাইন টিকিটিং একসঙ্গে চালু করা হলে কিছু মানুষের ভোগান্তি সাময়িকভাবে কমতে পারে, কিন্তু মূল সংকটের সমাধান হবে না। বরং এতে নতুন করে অনিয়ম, দালালচক্র ও ব্যবস্থাপনাগত জটিলতা তৈরি হওয়ার আশঙ্কাও উড়িয়ে দেওয়া যায় না।
টিকিটিং ব্যবস্থা নিয়ে আদালতের নির্দেশনা গুরুত্বপূর্ণ হলেও, দীর্ঘমেয়াদি সমাধানের জন্য প্রয়োজন ট্রেন সংখ্যা বৃদ্ধি, রুট সম্প্রসারণ, কোচ ও ইঞ্জিন সংযোজন এবং যাত্রীবান্ধব সময়োপযোগী পরিকল্পনা। অন্যথায় টিকিট বিক্রির পদ্ধতি বদলালেও সংকট থেকেই যাবে—শুধু রূপ বদলাবে।
মনিরুজ্জামান মনির সাংবাদিক ও কলামিস্ট এবং সভাপতি বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি