ঢাকা, শুক্রবার, ২৭ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

১৪ ফাল্গুন ১৪৩২, ০৯ রমজান ১৪৪৭

রেল সংস্কারে আবেগ নয়, কাঠামোগত শুদ্ধি ও জবাবদিহিই হোক অগ্রাধিকার

প্রকাশ: ১৬:৪৩, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ | আপডেট: ২১:১২, ২৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

রেল সংস্কারে আবেগ নয়, কাঠামোগত শুদ্ধি ও জবাবদিহিই হোক অগ্রাধিকার

বাংলাদেশ রেলের সাম্প্রতিক উন্নয়ন, প্রকল্প ব্যয় ও প্রশাসনিক কাঠামো নিয়ে জনপরিসরে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, তা স্বাগত। সাবেক অতিরিক্ত সচিব মোঃ মাহবুব কবীর (মিলন) সাহেবের প্রস্তাবনায় কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক আছে—আবার কিছু বক্তব্য রয়েছে, যা নীতিগত ও প্রমাণভিত্তিক দৃষ্টিকোণ থেকে পুনর্বিবেচ্য। 
১) “দুর্নীতিই রেলের চালিকাশক্তি”—এই বক্তব্য সমর্থনযোগ্য নয়
রেলের মতো একটি ঐতিহ্যবাহী রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে “দুর্নীতি অন্যতম চালিকাশক্তি” বলা অতিরঞ্জিত এবং প্রাতিষ্ঠানিক মনোবল ভাঙার শামিল। Bangladesh Railway-এ বহু সৎ ও পেশাদার কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্মরত আছেন।
দুর্নীতি একটি বাস্তব সমস্যা হতে পারে, কিন্তু সেটিকে প্রাতিষ্ঠানিক বৈশিষ্ট্য বলে চিহ্নিত করলে সংস্কারের পথ সংকুচিত হয়।
সমর্থনযোগ্য অবস্থান: দুর্নীতির বিরুদ্ধে শূন্য-সহনশীলতা।
অসমর্থনযোগ্য অবস্থান: পুরো প্রতিষ্ঠানকে “দুর্নীতিনির্ভর” আখ্যা দেওয়া।
২) অডিট আপত্তি মানেই দুর্নীতি নয়
বড় প্রকল্পে অডিট আপত্তি ওঠা অস্বাভাবিক নয়। অডিট আপত্তি অনেক সময় প্রক্রিয়াগত ত্রুটি, ডকুমেন্টেশন ঘাটতি বা ব্যাখ্যার অসঙ্গতি থেকে আসে—যা নিষ্পত্তিযোগ্য।
সুতরাং “অডিট আপত্তি = দুর্নীতি” সমীকরণটি আইনসম্মত নয়।
তবে যেখানে তদন্ত সংস্থা মামলা করেছে, সেখানে প্রভাবমুক্ত তদন্ত নিশ্চিত করা জরুরি—এটাই নীতিগত অবস্থান হওয়া উচিত।
৩) মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তর একই ভবনে—সমস্যা কি কাঠামো, না হস্তক্ষেপ?
Ministry of Railways এবং Bangladesh Railway একই ভবনে থাকলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সুশাসন ব্যাহত হয়—এ দাবির পক্ষে সুস্পষ্ট প্রমাণ নেই।
বাস্তব সমস্যা যদি হয় রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক হস্তক্ষেপ, তবে সমাধান হবে কার্যকর চেইন অব কমান্ড, দায়বদ্ধতা ও প্রাতিষ্ঠানিক স্বায়ত্তশাসন নিশ্চিত করা; শুধু ভবন আলাদা করলেই সুশাসন নিশ্চিত হবে না।
সমর্থনযোগ্য অবস্থান: হস্তক্ষেপমুক্ত পেশাদার সিদ্ধান্ত।
অসমর্থনযোগ্য অবস্থান: কেবল সহাবস্থানকেই মূল সমস্যা বলা।
৪) গতি কম—প্রযুক্তিগত, নাকি পরিচালনাগত?
ঢাকা–খুলনা বা ঢাকা–চট্টগ্রাম রুটে প্রত্যাশিত গতির চেয়ে কম গড় গতি—এ প্রশ্ন যৌক্তিক। কিন্তু এর পেছনে সিগন্যালিং, ক্রসিং কনফিগারেশন, সেফটি মার্জিন, স্টেশন স্টপেজ, ট্র্যাক মেইনটেন্যান্স ব্লক—এসব কারিগরি বিষয়ও জড়িত।
১৯৮৬ সালের তুলনায় আজ ট্রেনের সংখ্যা, লোড ও সেফটি প্রটোকল ভিন্ন।
প্রস্তাব: স্বতন্ত্র টেকনিক্যাল অডিট করে রুটভিত্তিক “ডিজাইন স্পিড বনাম অপারেশনাল স্পিড” বিশ্লেষণ প্রকাশ করা।
৫) আরএনবি—আইন আছে, বাস্তবায়ন কতদূর?
২০১৬ সালের আইন অনুযায়ী রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীকে আধুনিকীকরণ জরুরি—এ কথা সঙ্গত। তবে বাহিনীর কাঠামো, বাজেট, নিয়োগবিধি ও কমান্ড স্ট্রাকচার স্পষ্ট না হলে কেবল সমালোচনা ফলপ্রসূ হবে না।
সমর্থনযোগ্য অবস্থান: আইনসম্মত কাঠামো, প্রশিক্ষণ ও সরঞ্জাম নিশ্চিত করা।
অসমর্থনযোগ্য অবস্থান: প্রমাণ ছাড়া “নামসর্বস্ব” আখ্যা।
৬) টিকিট কালোবাজারি—নীতিমালা আছে, প্রয়োগ দুর্বল
“টিকিট যার, ভ্রমণ তার”—নীতি কার্যকর করতে অনবোর্ড এনআইডি ভেরিফিকেশন জোরদার করা যায়। একই সঙ্গে ডেটা অ্যানালিটিক্স ব্যবহার করে সন্দেহজনক একাউন্ট শনাক্ত করা সম্ভব।
সমর্থনযোগ্য অবস্থান: প্রযুক্তিনির্ভর কড়া প্রয়োগ।
সংযোজন: যাত্রীবান্ধব ব্যবস্থা বজায় রেখে প্রয়োগ বাড়ানো।
৭) স্ট্যান্ডিং টিকিট—আইনি ও মানবিক ভারসাম্য
স্ট্যান্ডিং টিকিট নিয়ে বিতর্ক আছে। ইন্টারসিটি ট্রেনে অতিরিক্ত ভিড় মানবিক সংকট তৈরি করে—এ অভিযোগ গুরুত্বের দাবিদার। তবে চাহিদা-সরবরাহ ব্যবধান, উৎসবকালীন চাপ ও রাজস্ব বাস্তবতা বিবেচ্য।
প্রস্তাব: অকার্যকর লাগেজ ভ্যান পুনঃনকশা করে সীমিত “রিজার্ভড স্ট্যান্ডিং কোচ” পাইলট চালু করা যেতে পারে—কারিগরি যাচাই সাপেক্ষে।
৮) অনলাইন চার্জ—টিকিট প্রতি, না যাত্রী প্রতি?
প্রতি যাত্রী ২০ টাকা চার্জ যৌক্তিক কি না—পুনর্মূল্যায়ন দরকার। স্কেল ইকোনমি বিবেচনায় “প্রতি টিকিট” ভিত্তিক চার্জ অধিক ন্যায্য হতে পারে।
সমর্থনযোগ্য অবস্থান: ব্যয়-ভিত্তিক স্বচ্ছ ফি কাঠামো।
৯) মানবসম্পদ, রিসার্চ ও আইসিটি
রেলে শক্তিশালী মানবসম্পদ উন্নয়ন (HRD) ও রিসার্চ ইউনিট প্রয়োজন—এ প্রস্তাব বাস্তবসম্মত। আধুনিক রেলওয়ে ডেটা-চালিত সিদ্ধান্তে চলে। থার্ড-পার্টি সার্ভার থাকলেও ইন-হাউস আইসিটি গভর্ন্যান্স অপরিহার্য।
সমর্থনযোগ্য অবস্থান: স্থায়ী টেকনিক্যাল সেল ও প্রজেক্ট অডিট টিম গঠন।
১০) অডিট ও চেক-অ্যান্ড-ব্যালান্স
প্রকল্প-পরবর্তী টেকনিক্যাল ও ফাইন্যান্সিয়াল অডিট বাধ্যতামূলক করা উচিত। এতে জবাবদিহি বাড়বে এবং ভবিষ্যৎ প্রকল্পে ব্যয় সাশ্রয় সম্ভব হবে।
সমর্থনযোগ্য অবস্থান: প্রাতিষ্ঠানিক অডিট কাঠামো গঠন।
১১) ইঞ্জিন সংকট, কোচ বৃদ্ধি ও লাইন রক্ষণাবেক্ষণ—অগ্রাধিকারভিত্তিক বাস্তবতা
গতি, সময়ানুবর্তিতা ও সেবার মান উন্নত করতে—ইঞ্জিন সংকট নিরসন,কোচ সংখ্যা বৃদ্ধি,সার্বক্ষণিক ট্র্যাক মেইনটেন্যান্স—এই তিনটিই অবিলম্বে অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত। অবকাঠামো উন্নয়নের সুফল পেতে হলে অপারেশনাল সক্ষমতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।

মনিরুজ্জামান মনির আরও বলেন, রেল সংস্কার আবেগ বা পারস্পরিক দোষারোপে নয়; প্রমাণভিত্তিক নীতি, পেশাদার স্বায়ত্তশাসন ও প্রযুক্তিনির্ভর জবাবদিহিতায় সম্ভব।
যেখানে প্রস্তাব যুক্তিযুক্ত—সেগুলো দৃঢ়ভাবে সমর্থন করা উচিত। আর যেখানে অতিরঞ্জন বা কাঠামোগত বিশ্লেষণের ঘাটতি আছে—সেগুলো সংশোধন করে বাস্তবমুখী রূপরেখা প্রণয়নই হবে সবার জন্য মঙ্গলজনক পথ।
রেল জনগণের সম্পদ—একে শক্তিশালী করতে সমালোচনা হোক দায়িত্বশীল, আর সংস্কার হোক তথ্যনির্ভর।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন