শিরোনাম
নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী
প্রকাশ: ০৯:৫০, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:২৪, ১৪ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলে ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের ক্ষেত্রে বড় ধরনের অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। সহজের সার্ভারে সংরক্ষিত রেজিস্ট্রেশন তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পশ্চিমাঞ্চলের চারটি স্টেশনের সংশ্লিষ্ট কার্ড ব্যবহার করে মোট ৪ হাজার ৭১৬ বার ডিউটি পাস ইস্যু করা হয়েছে। এসব পাসের বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯ টাকা। বিপুলসংখ্যক পাস ব্যবহারের বিষয়টি নিয়ে রেলওয়ের অভ্যন্তরে প্রশ্ন উঠেছে।
এদিকে, অস্বাভাবিক ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানিয়ে গত ১৩ জুলাই পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকের (সিসিএম) পক্ষে উপপ্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাবরক্ষণ কর্মকর্তার (এফএঅ্যান্ডসিএও, পশ্চিম) কাছে চিঠি দিয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে এ বিষয়ে বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে অবহিত করা হয়েছিল কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
চার স্টেশনের কার্ডে কোটি টাকার হিসাব
সহজের সার্ভারের রেজিস্ট্রেশন তথ্যের বরাতে পাওয়া হিসাব অনুযায়ী, চারটি স্টেশনের সংশ্লিষ্ট কার্ডে ডিউটি পাস ব্যবহারের চিত্র হলো—
১. দিনাজপুর: টি আই/এ দিনাজপুরের কার্ড পাস নম্বর সিপি ০৩৪১৬৭। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এ কার্ড ব্যবহার করে ১ হাজার ৯৫০ বার ডিউটি পাস ইস্যু করা হয়েছে। এসব পাসের বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ৪৪ লাখ ৮০ হাজার ৩০০ টাকা।
২. রাজশাহী: টি আই/এ রাজশাহীর কার্ড পাস নম্বর সিপি ০৩৪১৬৮। একই সময়ে এ কার্ডে ১ হাজার ৫০০ বার ডিউটি পাস ব্যবহার করা হয়েছে। এর বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ৩৫ লাখ ৭ হাজার ৮১৩ টাকা।
৩. ঈশ্বরদী: টি আই/এ ঈশ্বরদীর কার্ড পাস নম্বর সিপি ০৩৪১৬৯। এ কার্ড ব্যবহার করে ৯৬৫ বার ডিউটি পাস ইস্যু করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট পাসের বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ১৯ লাখ ৩৬ হাজার ১৪৪ টাকা। সার্ভারের রেজিস্ট্রেশন অনুযায়ী, কার্ডটি টি আই/এ জিএম আবুল কালাম আজাদের নামে নিবন্ধিত।
৪. পার্বতীপুর: টি আই/এ পার্বতীপুরের কার্ড পাস নম্বর সিপি ০৩৪১৬১। একই সময়ে এ কার্ড ব্যবহার করে ৩০১ বার ডিউটি পাস ইস্যু করা হয়েছে। এর বিপরীতে অর্থের পরিমাণ ৪ লাখ ১৪ হাজার ৮৪২ টাকা।
চারটি কার্ডের বিপরীতে নথিভুক্ত অর্থের পরিমাণ ১ কোটি ৩ লাখ ৮৯ হাজার ৯৯ টাকা। তবে এই অর্থের হিসাব কীভাবে নির্ধারিত হয়েছে, পাসগুলো কোন উদ্দেশ্যে ইস্যু করা হয়েছে এবং প্রতিটি পাস বিধি অনুযায়ী ব্যবহৃত হয়েছে কি না, তা নিরীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
অস্বাভাবিক ব্যবহারের বিষয়ে চিঠি, কিন্তু কতটা কার্যকর হলো ব্যবস্থা?
সূত্র জানায়, গত ১৩ জুলাই পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকের পক্ষে উপপ্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপক মো. আব্দুল্লাহ আল মামুন স্বাক্ষরিত একটি চিঠি এফএঅ্যান্ডসিএও (পশ্চিম) বরাবর পাঠানো হয়। এতে অস্বাভাবিক ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ জানানো হয়।
চিঠিটির অনুলিপি বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (অপারেশন) পর্যন্ত পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে। তবে রেলওয়ের মহাপরিচালক ও রেলপথ মন্ত্রণালয়ের সচিবকে বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে অবহিত করা হয়েছিল কি না, সে বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
বুকিং সহকারীদের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ
নির্ভরযোগ্য সূত্রের দাবি, রাজশাহী রেলস্টেশনের দুই বুকিং সহকারী কথিত টিকিট কালোবাজারি সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত থাকতে পারেন। অভিযোগ রয়েছে, তাঁদের মাধ্যমে একটি চক্র টিকিট সংগ্রহ করে থাকে। তাঁদের একজনের স্ত্রী রেলওয়ের পশ্চিমাঞ্চলের প্রধান বাণিজ্যিক ব্যবস্থাপকের (সিসিএম) দপ্তরে কর্মরত বলেও সূত্রটি দাবি করেছে।
মহাব্যবস্থাপকের বক্তব্য পাওয়া যায়নিঃ পুরো বিষয়টি নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল, রাজশাহীর বর্তমান মহাব্যবস্থাপক আহম্মেদ হোসেন মাসুমের সঙ্গে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগ এবং খুদে বার্তা পাঠানো হয়েছে বলে প্রতিবেদক জানিয়েছেন। তবে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা পর্যন্ত তাঁর কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। এ ব্যাপারে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে যুক্ত করা হবে।
তদন্ত ও জবাবদিহির দাবিঃ
ডিউটি কার্ড পাস ব্যবহারের বিপরীতে নথিভুক্ত বিপুল অঙ্কের অর্থ, পাস ইস্যুর পরিমান এবং প্রশাসনিক পর্যায়ে অভিযোগ উত্থাপনের বিষয়গুলো স্বচ্ছ তদন্তের দাবি রাখে। সহজের সার্ভারের মূল রেকর্ড, সংশ্লিষ্ট পাসের অনুমোদনপত্র, যাত্রী বা সুবিধাভোগীর তথ্য, হিসাব শাখার নথি এবং চিঠির পরবর্তী কার্যক্রম যাচাইয়ের মাধ্যমে প্রকৃত চিত্র নির্ধারণ করা সম্ভব। রেলওয়ের সুনাম ও রাজস্ব সুরক্ষায় অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ী ব্যক্তিদের শনাক্তকরণ এবং তদন্তের ফলাফল প্রকাশের দাবি উঠেছে। এ ব্যাপারে রেলনিউজের অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে।