ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ১৫ অক্টোবর ২০২৬

২৯ আশ্বিন ১৪৩৩

দেশের একমাত্র রেলপথ যেখানে চলন্ত ট্রেনে মানুষ ওঠেন, নামেন

রেল নিউজ ডেস্ক

প্রকাশ: ১৫:০৯, ১৪ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১৫:১০, ১৪ অক্টোবর ২০২৬

দেশের একমাত্র রেলপথ যেখানে চলন্ত ট্রেনে মানুষ ওঠেন, নামেন

বাংলাদেশের একমাত্র রেলপথ, যেখানে চলন্ত ট্রেন থেকে নামা যায়, আবার চলন্ত ট্রেনেই ওঠাও যায়। শুনতে অবিশ্বাস্য মনে হলেও কুড়িগ্রামের চিলমারীর রমনা বাজারগামী ট্রেন নিয়ে স্থানীয়দের মুখে এমন কথাই শোনা যায়।

চিলমারীগামী ট্রেনকে ঘিরে স্থানীয় অঞ্চলে একটি গল্পও বেশ প্রচলিত। আঞ্চলিক ভাষায় বলা সেই গল্পে এক বৃদ্ধা মাথায় কিছু জিনিসপত্র নিয়ে হেঁটে যাচ্ছিলেন। পাশ দিয়ে ধীরগতিতে একটি ট্রেন যাচ্ছিল। ট্রেনের এক যাত্রী তাকে দেখে চিৎকার করে বললেন, ‘দাদি, হেঁটে যাচ্ছেন কেন? ট্রেনে উঠে আসেন।’

জবাবে বৃদ্ধা নাকি বলেছিলেন, ‘না, আজ ট্রেনে যাব না। আমার একটু তাড়া আছে, তাড়াতাড়ি যেতে হবে।’

গল্পটি রসিকতা হলেও এর ভেতরে লুকিয়ে আছে চিলমারী রেলপথের বাস্তব চিত্র। এমন ধীরগতির কারণে স্থানীয়দের কেউ কেউ মজা করে বলেন, এই ট্রেনের চেয়ে হেঁটেই দ্রুত যাওয়া যায়।

সামাজিক মাধ্যমে এমন অসংখ্য ভিডিও ঘুরে বেড়ায়। যেখানে দেখা যাচ্ছে অনেকেই ট্রেন থেকে নেমে পড়ছেন, আবার অনেকেই উঠছেন। পার্বতীপুর-রংপুর-কাউনিয়া হয়ে কুড়িগ্রামের চিলমারী রমনা বাজার পর্যন্ত চলাচলকারী ট্রেনটি দীর্ঘদিন ধরেই রেলপথের দুরবস্থার কারণে ধীরগতিতে চলছে। বিশেষ করে উলিপুর থেকে রমনা বাজার পর্যন্ত রেললাইনের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। পুরনো ও মেয়াদোত্তীর্ণ স্লিপার, নড়বড়ে অবকাঠামো এবং রেলপথের বিভিন্ন সমস্যার কারণে ট্রেনটি কোথাও কোথাও ঘণ্টায় মাত্র ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে চালাতে হচ্ছে।

ফলে এ পথে ট্রেনযাত্রা অনেকটা ধৈর্যের পরীক্ষায় পরিণত হয়েছে। একদিকে ধীরগতির কারণে সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছাতে পারছেন না যাত্রীরা, অন্যদিকে এই কম গতিই তৈরি করছে নতুন বিপদের আশঙ্কা।

স্থানীয়দের অভিযোগ, ট্রেনের গতি কম থাকায় শিশু-কিশোরসহ অনেকেই চলন্ত ট্রেনে ওঠানামাকে সহজ ও নিরাপদ মনে করছেন। কেউ কেউ আবার সামাজিক মাধ্যমে রিলস বা টিকটক ভিডিও তৈরির জন্য চলন্ত ট্রেনে লাফিয়ে ওঠানামার মতো ঝুঁকিপূর্ণ কর্মকাণ্ডেও জড়াচ্ছেন। অনেক সময় নিছক বিনোদনের অংশ হিসেবেও এমন ঘটনা ঘটছে।

রেললাইনের পাশের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন জানালেন, ট্রেনের গতি কম হওয়ায় অনেকেই বিষয়টিকে স্বাভাবিকভাবে নিচ্ছেন। কিন্তু চলন্ত ট্রেনে ওঠানামা কখনোই নিরাপদ নয়। সামান্য অসাবধানতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এমন ঝুঁকিপূর্ণ ‘স্টান্ট’ বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।

জোব্বার আলী বলছেন, ‘বড়দের চলন্ত ট্রেনে ওঠা ও নামা দেখে ছোটরাও এসব কাজে উৎসাহিত হচ্ছে। ফলে একসময় যে বিষয়টি শুধু রসিকতা বা স্থানীয় গল্পের অংশ ছিল, সেটিই এখন বাস্তবে দুর্ঘটনার কারণ হয়ে উঠতে পারে।’

রেলপথের দুরবস্থার কারণে ট্রেনের গতি কমিয়ে চালানোর বিষয়টি স্বীকার করেছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। রমনা বাজার স্টেশন কার্যালয়ের বুকিং সহকারী মো. নাজমুল হাসান বলেন, ‘উলিপুর থেকে রমনা বাজার পর্যন্ত রেললাইনে প্রযুক্তিগত ও কাঠামোগত নানা জটিলতা রয়েছে। যাত্রী ও ট্রেনের নিরাপত্তার স্বার্থেই বাধ্য হয়ে ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার গতিতে ট্রেন চালাতে হচ্ছে।’

তিনি বলেন, ‘যাত্রীদের চলন্ত ট্রেনে ঝুঁকিপূর্ণভাবে ওঠানামার বিষয়টিও কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে।’

নাজমুল হাসান আরও জানান, রেলপথ সংস্কার ও আধুনিকায়নের কাজ চলছে। এরই মধ্যে উলিপুর অংশ পর্যন্ত সংস্কারকাজ দৃশ্যমান হয়েছে। আশা করা হচ্ছে, দ্রুত চিলমারী অংশের কাজও সম্পন্ন হবে। সংস্কারকাজ শেষ হলে রেলপথের গতি ও ট্রেনসেবার মান স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন