শিরোনাম
রেল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২৩:৫৭, ২৬ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ১০:২৯, ২৭ অক্টোবর ২০২৬
বাংলাদেশ রেলওয়ের ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অভিযুক্তদের মধ্যে রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের (চসিক) তিন কর্মকর্তা এবং সীমান্ত ব্যাংকের তিন কর্মকর্তা রয়েছেন। ভুয়া বিল তৈরি, জাল স্বাক্ষর, সরকারি হিসাব ব্যবস্থায় অনিয়ম এবং ভুয়া পরিচয়ে ব্যাংক হিসাব খোলার মাধ্যমে এ অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) চট্টগ্রাম দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এ মামলাটি করেন সংস্থাটির উপ-পরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন।
দুদকের এজাহার অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর রেলওয়ের স্টোর শাখার নামে একটি ভুয়া বিল তৈরি করে ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা উত্তোলনের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পরে ওই অর্থ সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় দি কসমোপলিটন করপোরেশন নামের একটি হিসাবে জমা দেওয়া হয়। ২০২৪ সালের ২ থেকে ৮ জানুয়ারির মধ্যে বিভিন্ন শাখা থেকে টাকা তুলে নেওয়া হয়। তবে প্রকৃত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানটির মালিক ওই অর্থ গ্রহণের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিকে চেনেন না বলে দুদককে জানিয়েছে।
মামলার আসামিরা হলেন- রেলওয়ের সাবেক অডিটর পবন কুমার পালিত, জুনিয়র অডিটর মোহাম্মদ মেহেদী হাসান ও খোকন চন্দ্র দে, হিসাব কর্মকর্তা মোহাম্মদ মামুন হোসেন, হিসাবরক্ষক সৈয়দ মোহাম্মদ সাইফুর রহমান, হিসাব কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবু নাছের, অফিস সহায়ক মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান ও অস্থায়ী কর্মচারী মোহাম্মদ হাবিবুল্লা খান। এছাড়া চসিকের লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপন পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপকর কর্মকর্তা এম. মনজুর উদ্দিন চৌধুরী ও সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিন এবং সীমান্ত ব্যাংকের কর্মকর্তা মোহাম্মদ পারভেজ, বিদেশ বড়ুয়া ও গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ারকে আসামি করা হয়েছে।
দুদকের অনুসন্ধানে বলা হয়েছে, কথিত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির নামে চসিক থেকে ট্রেড লাইসেন্স নেওয়া এবং সীমান্ত ব্যাংকে হিসাব খোলার ক্ষেত্রে পরিচয় ও নথিপত্র যাচাইয়ে গুরুতর অনিয়ম করা হয়। পরে রেলওয়ের বিল পরিশোধের প্রক্রিয়ায় জাল নথি ও স্বাক্ষর ব্যবহার করে অর্থ ছাড় করানো হয়। এজাহারে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, প্রতারণা, জালিয়াতি ও অপরাধজনক বিশ্বাস ভঙ্গের অভিযোগ আনা হয়েছে।
যেভাবে তৈরি হয় ভুয়া বিল
দুদকের এজাহারে উল্লেখ করা হয়, রেলওয়ের অর্থ উপদেষ্টা ও প্রধান হিসাব অধিকর্তা (পূর্ব) কার্যালয়ের বাজেট ও ব্যয়ের হিসাব মিলিয়ে দেখার সময় ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার বিলটি নিয়ে অসংগতি ধরা পড়ে। ২০২৪ সালের ৭ ফেব্রুয়ারি সংশ্লিষ্ট দপ্তরের হিসাব পর্যালোচনায় দেখা যায়, দি কসমোপলিটন কর্পোরেশনের চারটি প্রকৃত বিলের বাইরে অতিরিক্ত একটি বিলের মাধ্যমে অর্থ পরিশোধ করা হয়েছে।
রেলওয়ের স্টোর শাখার ক্যাশ অর্ডার-৬ (সিও-৬) রেজিস্ট্রার, বিল রেজিস্ট্রার, আয়কর ও ভ্যাট কর্তনের রেজিস্টার এবং অন্যান্য নথি পরীক্ষা করে ওই ভুয়া বিলের কোনো বৈধ এন্ট্রি পাওয়া যায়নি। বিলটি প্রধান সরঞ্জাম নিয়ন্ত্রক কার্যালয় থেকেও পাঠানো হয়নি বলে অনুসন্ধানে উঠে আসে। অথচ বিলটির পক্ষে অনুমোদিত কর্তৃপক্ষের স্বাক্ষর ও প্রয়োজনীয় নথি থাকার কথা।
এজাহারে বলা হয়েছে, ভুয়া বিল তৈরির ক্ষেত্রে রেলওয়ের অস্থায়ী কর্মচারী হাবিবুল্লা খান এবং অন্যদের ভূমিকা খতিয়ে দেখা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর অফিস সময়ের শেষ দিকে বিলটি পিয়ন বুকের নিয়মিত এন্ট্রি ছাড়াই বুকস অ্যান্ড বাজেট শাখায় পৌঁছে দেওয়া হয়। পরবর্তী কার্যদিবসে পিয়ন বুকে এন্ট্রি ও স্বাক্ষর নেওয়ার কথা বলা হলেও তা করা হয়নি।
সংশ্লিষ্ট পিয়ন বুকের স্বাক্ষর বুকস অ্যান্ড বাজেট শাখার কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীর নয় বলেও দুদকের অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুয়া বিলের সঙ্গে থাকা সিও-৭ নম্বর, এনফেসমেন্ট সিল, স্বাক্ষর, অডিট নম্বর এবং ভ্যাটের হিসাবেও একাধিক অসংগতি পাওয়া যায়। প্রকৃত বিলগুলোর সঙ্গে তুলনা করে এসব পার্থক্য শনাক্ত করা হয়।
আইবাস++ ব্যবস্থায় অন্যের পরিচয় ব্যবহারের অভিযোগ
দুদকের অনুসন্ধানে সরকারি আর্থিক ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার আইবাস++ তথ্যও পর্যালোচনা করা হয়েছে। এজাহার অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ ডিসেম্বর দুপুর ১টা ৭ মিনিটে ভুয়া বিলটির টোকেন এন্ট্রি এবং বিকেল ৩টা ১৯ মিনিটে বিল এন্ট্রি করা হয়। এসব কাজে রেলওয়ের অডিটর পবন কুমার পালিতের আইবাস++ পরিচয় ব্যবহার করা হয়েছিল। পরে একই দিন বিকেল ৩টা ৫৪ মিনিটে হিসাব কর্মকর্তা মামুন হোসেনের আইডি ব্যবহার করে বিলটি অনুমোদন করা হয়। এরপর ৩১ ডিসেম্বর হিসাবরক্ষক সৈয়দ মোহাম্মদ সাইফুর রহমানের আইডি ব্যবহার করে ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার চেক ইস্যু করা হয়। হিসাব কর্মকর্তা আবু নাছের বিল, সিও-৭ ও অন্যান্য কাগজপত্রের ভিত্তিতে চেকে স্বাক্ষর করে অনুমোদন দেন বলে এজাহারে উল্লেখ রয়েছে। তবে মূল সরবরাহকারীর পরিচয় ও তথ্য যাচাই না করেই চেক অনুমোদন ও হস্তান্তরের অভিযোগ আনা হয়েছে।
চেকটি নিয়ম অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট জুনিয়র অডিটরের কাছে হস্তান্তর না করে অফিস সহায়ক মাকসুদুর রহমানের হাতে দেওয়া হয় বলে দুদকের অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। পরে তিনি কথিত সোহাগ আলীর কাছে চেকটি দেন। তবে প্রকৃত সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানটির মালিক নাবিল আহসান দুদককে জানিয়েছেন, সোহাগ আলী নামে কাউকে তিনি চেনেন না এবং ওই ব্যক্তি তাদের প্রতিষ্ঠানের অনুমোদিত প্রতিনিধি নন।
ভুয়া পরিচয়ে ট্রেড লাইসেন্স ও ব্যাংক হিসাব
এজাহার অনুযায়ী, দি কসমোপলিটন কর্পোরেশনের সরবরাহকারী হিসেবে পরিচয় দিয়ে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে চসিকের ১৬ নম্বর চকবাজার ওয়ার্ডে কোহিনুর আক্তার নাম ব্যবহার করে ট্রেড লাইসেন্সের আবেদন করা হয়। আবেদনে সংযুক্ত ছবি ও জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবির মধ্যে মিল ছিল না। দুদকের অনুসন্ধানে প্রকৃত কোহিনুর আক্তারকে একজন শ্রমজীবী নারী হিসেবে শনাক্ত করা হয়। তিনি তৃতীয় শ্রেণি পর্যন্ত পড়াশোনা করেছেন এবং তার নিজের নামে কোনো ব্যাংক হিসাব নেই বলে জানিয়েছেন। তিনি কখনো চসিক কার্যালয়ে যাননি বলেও দাবি করেন।
ট্রেড লাইসেন্সে উল্লেখ করা ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানের ঠিকানারও বাস্তবে অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি বলে এজাহারে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ঘটনায় চসিকের লাইসেন্স ও বিজ্ঞাপন পরিদর্শক মুহাম্মদ ইকবাল, সাবেক উপকর কর্মকর্তা এম. মনজুর উদ্দিন চৌধুরী এবং সাবেক ভারপ্রাপ্ত কর কর্মকর্তা মুহাম্মদ জসিম উদ্দিনের বিরুদ্ধে যাচাই-বাছাই না করে লাইসেন্স দেওয়ার অভিযোগ আনা হয়েছে।
পরে ওই ট্রেড লাইসেন্স ও জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি ব্যবহার করে ২০২৩ সালের ৩০ নভেম্বর সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় দি কসমোপলিটন কর্পোরেশনের নামে একটি এসএনডি হিসাব খোলা হয়। হিসাব খোলার নথিতে প্রতিষ্ঠানের বার্ষিক লেনদেন এক কোটি ৮০ লাখ টাকা দেখানো হয়েছিল। অথচ জাতীয় পরিচয়পত্রে কোহিনুর আক্তারের পেশা শ্রমিক উল্লেখ ছিল এবং আবেদনপত্রের ছবির সঙ্গেও পরিচয়পত্রের ছবির অমিল ছিল। দুদকের অভিযোগ, এসব অসংগতি থাকা সত্ত্বেও ব্যাংকের কর্মকর্তা পারভেজ, রিলেশনশিপ ম্যানেজার বিদেশ বড়ুয়া ও তৎকালীন শাখা ব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ ফরহাদ সরওয়ার যথাযথ যাচাই ছাড়াই হিসাবটি খুলতে সহায়তা করেন।
যেভাবে উত্তোলন করা হয় টাকা
দুদকের এজাহারে বলা হয়েছে, ২০২৩ সালের ৩১ ডিসেম্বর ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকার চেকটি ইস্যু করা হয়। পরদিন, ২০২৪ সালের ১ জানুয়ারি, কথিত সোহাগ আলী চেকটি সীমান্ত ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখায় দি কসমোপলিটন কর্পোরেশনের হিসাবে জমা দেন।
এরপর ওই হিসাব থেকে ২০২৪ সালের ২ জানুয়ারি ঢাকার মতিঝিল শাখা থেকে ৮০ লাখ টাকা, ৮ জানুয়ারি একই শাখা থেকে ৮ লাখ টাকা এবং সেদিনই ধানমন্ডির প্রিন্সিপাল শাখা থেকে ৫ লাখ টাকা উত্তোলন করা হয়। এভাবে মোট ৯৬ লাখ ৯০ হাজার টাকা তুলে নেওয়া হয় বলে দুদকের অনুসন্ধানে উল্লেখ করা হয়েছে।
দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়, চট্টগ্রাম-২-এর উপপরিচালক মো. রিয়াজ উদ্দিন বলেন, দুদকের প্রধান কার্যালয় ২০২৬ সালের ৫ অক্টোবর ১৪ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরের অনুমোদন দেয়। পরে আমি এজাহার দায়ের করি।
তিনি বলেন, দণ্ডবিধির ৪০৯, ৪৬৭, ৪৬৮, ৪৭১ ও ১০৯ ধারা এবং ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। তবে অনুসন্ধানে ভুয়া কোহিনুর আক্তার ও কথিত সোহাগ আলীকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি। তাদের পরিচয় এবং ঘটনায় অন্য কারও সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা তদন্তে খতিয়ে দেখা হবে।
এ বিষয়ে ভুক্তোভোগী মেসার্স দ্য কসমোপলিটন কর্পোরেশনের স্বত্বাধিকারী নাবিল আহসান জানান:
অবশেষে দীর্ঘ তিন বছর পর দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্যের বিজয় হয়েছে।
এ ধরনের দেশবিরোধী ও দুর্নীতিমূলক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে আমার বা আমার প্রতিষ্ঠানের কখনোই কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না, এখনো নেই এবং ভবিষ্যতেও থাকার কোনো সুযোগ নেই। বরং রেলওয়ের বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে মুখ খোলা ও শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ জানানোর কারণে আমি ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছি।
আমি মাননীয় রেলপথ মন্ত্রণালয়ের কাছে আমার ও আমার প্রতিষ্ঠানের ব্যবসায়িক সুনাম ক্ষুণ্ন করার অপচেষ্টার বিরুদ্ধে যথাযথ প্রতিকার ও ক্ষতিপূরণ দাবি করছি। দুদকের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে মামলার মাধ্যমে আসামিগণ চিহ্নিত হয়েছেন। কিন্তু এর পাশাপাশি, এই চেক জালিয়াতি ও দুর্নীতির পেছনের ষড়যন্ত্রকারীদেরও মুখোশ উন্মোচন এবং দোষী প্রমাণিত ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। রেলের উন্নয়নই দেশের প্রকৃত উন্নয়ন।"