শিরোনাম
মেহেদী হাসান , সম্পাদক ও প্রকাশক
প্রকাশ: ২৩:১৮, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ২৩:২৩, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬
মেহেদী হাসান , সম্পাদক ও প্রকাশক
কোনো অন্যায়ের প্রতিবাদ করার অধিকার মানুষের আছে। অন্যায়ের বিরুদ্ধে আওয়াজ তোলা নাগরিক অধিকার। কিন্তু সেই প্রতিবাদের ভাষা যদি পরিণত হয় সরকারি সম্পদ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ, আতঙ্ক সৃষ্টি কিংবা সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা বিঘ্নিত করার ঘটনায়—তখন প্রশ্ন উঠতেই পারে, এই প্রতিবাদের শেষ পরিণতি কোথায়?
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থীকে মারধরের প্রতিবাদে মধ্যরাতে রাজশাহী রেলওয়ে স্টেশনে বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের ভাঙচুরের ঘটনা সেই প্রশ্নই সামনে নিয়ে এসেছে।
প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহী রেলওয়ে থানা, পার্সেল অফিস, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর কার্যালয়সহ স্টেশনের বিভিন্ন স্থানে ভাঙচুর চালানো হয়েছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য অনুযায়ী, গাছের ডাল, বাঁশ, লাঠি ও ইটপাটকেল দিয়ে স্টেশনের কাচের জানালা, ডাস্টবিন, দোকানপাট, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কক্ষ, সাইনবোর্ড ও সিসিটিভি ক্যামেরাসহ বিভিন্ন স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত করা হয়। আতঙ্কে স্টেশন ছেড়ে যান অনেক যাত্রী।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন—রেল স্টেশন কি শুধু রেলওয়ের সম্পদ? নাকি এটি জনগণের সম্পদ?
রেলওয়ে একটি সরকারি প্রতিষ্ঠান। এর অবকাঠামো নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ ও মেরামতের অর্থ আসে মূলত রাষ্ট্রীয় অর্থ থেকে। আর রাষ্ট্রীয় অর্থের উৎস জনগণের অর্থ। অর্থাৎ একটি স্টেশনের ভাঙা জানালা, নষ্ট সিসিটিভি ক্যামেরা, ক্ষতিগ্রস্ত অফিস কিংবা ভাঙচুর করা স্থাপনা মেরামতের ব্যয় শেষ পর্যন্ত বহন করতে হয় জনগণকেই।
যে অর্থ দিয়ে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ করা যেত, যাত্রীসেবা বাড়ানো যেত, স্টেশনের নিরাপত্তা উন্নত করা যেত—সেই অর্থ যদি ভাঙচুরের ক্ষতি পূরণে ব্যয় করতে হয়, তাহলে প্রকৃত ক্ষতিটা কার?
প্রতিবাদকারীদের দাবি বা ক্ষোভের বিষয়টি সত্য ও ন্যায়সঙ্গত হলেও, সরকারি সম্পদ ধ্বংসের মাধ্যমে সেই দাবি আদায় হলে তার দায় ও ক্ষতির পরিধি আরও বড় হয়ে যায়।
বিশেষ করে রেলস্টেশন কোনো নির্জন সরকারি ভবন নয়। এটি প্রতিদিন হাজারো মানুষের চলাচলের জায়গা। সেখানে শিশু, নারী, বৃদ্ধ, অসুস্থ মানুষ, দূরপাল্লার যাত্রী, শ্রমজীবী মানুষ—সবাই থাকেন। মধ্যরাতে ভাঙচুর ও আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি হলে সাধারণ যাত্রীদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ সৃষ্টি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আরেকটি বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে ভাবা দরকার—ভাঙচুরের মাধ্যমে কি মূল সমস্যার সমাধান হয়েছে?
যে শিক্ষার্থীকে মারধরের অভিযোগকে কেন্দ্র করে প্রতিবাদ হয়েছে, সেই ঘটনার তদন্ত, দায়ীদের শনাক্তকরণ এবং আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণই কি হওয়া উচিত ছিল না? যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে অপরাধের অভিযোগ থাকে, তার বিচার দাবি করা যেতে পারে। প্রশাসনের কাছে স্মারকলিপি দেওয়া যেতে পারে, মানববন্ধন করা যেতে পারে, শান্তিপূর্ণ কর্মসূচি দেওয়া যেতে পারে, আইনি পদক্ষেপ নেওয়া যেতে পারে।
কিন্তু রেলস্টেশনের জানালা, সিসিটিভি ক্যামেরা কিংবা কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অফিস ভাঙলে সেই ঘটনার সঙ্গে মূল অভিযোগের সম্পর্ক কোথায়?
বরং এতে নতুন করে আরও একটি সমস্যা তৈরি হয়—জনগণের সম্পদ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সমস্যা।
রেলওয়ের অবকাঠামো দেশের মানুষের। কোনো রাজনৈতিক দল, সংগঠন, আন্দোলনকারী কিংবা নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর একক সম্পত্তি নয়। তাই ক্ষোভ যত বড়ই হোক, জনগণের সম্পদ ধ্বংস করার অধিকার কারও নেই।
একই সঙ্গে প্রশাসনের প্রতিও আমাদের প্রশ্ন আছে। কোনো আন্দোলন বা উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে গুরুত্বপূর্ণ রেলস্টেশনগুলোর নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হচ্ছে? যাত্রীদের নিরাপত্তা, রেলওয়ের গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং কর্মরত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সুরক্ষায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি ছিল কি না—সেটিও খতিয়ে দেখা জরুরি।
প্রতিবাদের অধিকার যেমন রক্ষা করতে হবে, তেমনি জনগণের সম্পদ ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তার অধিকারও সমানভাবে রক্ষা করতে হবে।
কারণ শেষ পর্যন্ত ভাঙা কাচের মূল্য কোনো ব্যক্তি নিজের পকেট থেকে পরিশোধ করেন না। নষ্ট হওয়া সিসিটিভি পুনঃস্থাপনের অর্থও কোনো আন্দোলনকারীর কাছ থেকে আসে না।
ক্ষতিগ্রস্ত অবকাঠামো মেরামতের টাকা আসে রাষ্ট্রীয় বাজেট থেকে—অর্থাৎ জনগণের অর্থ থেকে।
তাই আজকের প্রশ্নটি খুব সহজ—
যে সম্পদ জনগণের, সেটি ভেঙে জনগণের কী অর্জন হলো?
কার লাভ হলো, আর কার ক্ষতি হলো?
অন্যায়ের প্রতিবাদ হোক। অপরাধের বিচার হোক। দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হোক। কিন্তু প্রতিবাদের নামে যেন আরেকটি অন্যায় সৃষ্টি না হয়।
রেলস্টেশন রেলেরও, সর্বোপরি জনগণের।
জনগণের সম্পদ রক্ষা করা মানে জনগণের স্বার্থ রক্ষা করা।