ঢাকা, মঙ্গলবার, ০৪ আগস্ট ২০২৬

১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

ঢাকা-টঙ্গী চতুর্থ রেলপথ

তিন বছরের প্রকল্প ১৫ বছরে

সৌজন্যে কালের কন্ঠ

প্রকাশ: ১৫:২৪, ২ আগস্ট ২০২৬ | আপডেট: ১৫:৪২, ২ আগস্ট ২০২৬

তিন বছরের প্রকল্প ১৫ বছরে

গ্রাফিক্স

 
  • বিএনপি সরকার আসার পর কাজে গতি ফিরেছে
  • দুই বছর পর ভারতীয় ঋণছাড়, বকেয়া শোধ শুরু
  • চারবার মেয়াদ ও ব্যয় বাড়লেও কাজ হয়েছে মাত্র ৫৩ শতাংশ

 

 

তিন বছরের ঢাকা-টঙ্গী চতুর্থ রেলপথ প্রকল্প ১৫ বছরেও শেষ হচ্ছে না। এই সময়ে প্রকল্পটির ভৌত কাজ মাত্র ৫৩ শতাংশ আর আর্থিক অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৪০ শতাংশ।

 

তা-ও বিএনপি সরকার গঠনের পর কাজে গতি ফিরেছে। সময়ের সঙ্গে সাড়ে আট শ কোটি টাকার মূল প্রকল্পের মেয়াদ যেমন বেড়েছে, তেমনি ব্যয়ও বেড়েছে কয়েক গুণ। এটি চার দফায় বেড়ে এখন পৌঁছেছে তিন হাজার ৩৪২ কোটিতে। মূলত ভারতীয় ঋণের টাকা ছাড় না হওয়া, ঢাকা এক্সপ্রেসওয়ের সঙ্গে কাজের সমন্বয়হীনতা এবং বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) কাছ থেকে সময়মতো জমি বুঝে না পাওয়াই প্রকল্প পিছিয়ে যাওয়ার মূল কারণ।

 

এদিকে প্রকল্পটি পিছিয়ে যাওয়া ও অতিরিক্ত খরচের কারণে খোদ সরকারি সংস্থা পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) অসন্তোষ প্রকাশ করেছে। একই সঙ্গে সময়মতো প্রকল্প শেষ না হওয়ায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ারও সুপারিশ করেছে।

 

বিএনপি সরকার গঠনের সাড়ে পাঁচ মাস হয়েছে। এরই মধ্যে প্রকল্প কাজে গতি ফেরাতে তোড়জোড় শুরু করেছে।

ভারতীয় ঋণের অর্থছাড় শুরু হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় প্রকল্প গতি পেয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, প্রায় আড়াই বছর পরে গত জুলাই মাসের তৃতীয় সপ্তাহে এক্সিম ব্যাংক অর্থ ছাড় করেছে। ফলে ঠিকাদারদের বকেয়া শোধ করা হয়েছে। এ কারণে আবারও প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে।

জানা যায়, রাজধানী ঢাকার সঙ্গে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলের রেল যোগাযোগে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঢাকা-টঙ্গী রেলপথ। প্রতিদিন শতাধিক যাত্রী ও মালবাহী ট্রেনে এই পথে চলাচল করে লক্ষাধিক যাত্রী। কিন্তু মাত্র দুটি লাইনের কারণে দীর্ঘদিন ধরেই ট্রেন চলাচলে শিডিউল বিপর্যয়, নতুন ট্রেন চালু করতে না পারা এবং হঠাৎ কোনো ট্রেনে যান্ত্রিক গোলযোগ শুরু হলে যাত্রী ভোগান্তি বেড়ে যায় কয়েক গুণ।

তাই যাত্রী ভোগান্তি লাঘবে ২০১১ সালে ঢাকা-টঙ্গী পথে তৃতীয় ও চতুর্থ রেলপথ নির্মাণ প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। একই সঙ্গে টঙ্গী-জয়দেবপুর একক রেলপথে দ্বিতীয় লাইন নির্মাণের প্রকল্পও গ্রহণ করা হয়। রেলপথ মন্ত্রণালয়কে পৃথক মন্ত্রণালয় করার পর ২০১২ সালে ভারতীয় ঋণে শুরু হয় প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক কাজ।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, প্রকল্পের পিছিয়ে যাওয়ার পেছনে মূল তিন কারণের পাশাপাশি বিভিন্ন সংস্থার গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি ও অপটিক্যাল ফাইবার লাইন স্থানান্তরে বিলম্ব, স্টেশনের নকশা পরিবর্তন, তুরাগ নদীর সেতুর পুনর্নকশা, অতিরিক্ত লুপলাইন নির্মাণ, কভিড-১৯ মহামারি এবং নির্মাণসামগ্রী সরবরাহে বিলম্বও প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় প্রভাব ফেলেছে।

৩ বছরের প্রকল্প কেন ১৫ বছরেও হয়নি : এই প্রকল্পের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, প্রকল্পটির গতি স্থবির হওয়ার পেছনে সবচেয়ে বড় বাধা ছিল ঢাকা এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে প্রকল্পের পিয়ার নির্মাণের কাজ। এটি শুরু হওয়ায় কমলাপুর-মগবাজার সেকশনে নির্মিত হয়ে চতুর্থ লাইনটি তুলে ফেলতে হচ্ছে। এর আগেও একই করিডরে এক্সপ্রেসওয়ের পিয়ার, ভারী যন্ত্রপাতি ও নির্মাণকাজ চলায় দীর্ঘ সময় বিমানবন্দর-তেজগাঁও ও তেজগাঁও-মগবাজার অংশে রেলপথ নির্মাণ বারবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে।

প্রকল্প পরিচালক নাজনীন আরা কেয়া বলেন, ‘প্রকল্পের কাজ আবারও শুরু হয়েছে। তবে সিটি করপোরেশন মগবাজার-খিলগাঁও এলাকার অতীশ দীপঙ্কর সড়কে জায়গা না দেওয়ায় আমাদের তৈরি করা চতুর্থ লাইনের সঙ্গে এক্সপ্রেসওয়ের পিয়ার বসানো হচ্ছে। ফলে সেটি এখন আবার তুলে ফেলতে হচ্ছে। এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের পরে এটা আবার বসানো হবে। আমাদের প্রকল্পের শুরুতেই নানা জটিলতা পেরিয়ে কাজ করতে হচ্ছে। তাই সময় বেশি লেগে যাচ্ছে। তবে সামনে তেমন বাধা নেই। আমরা আর দুই বছর সময় পেলেই বাকি কাজ করে ফেলতে পারব।’

আইএমইডির নজরদারি, অর্থের বিকল্প উৎসর পরামর্শ বিশেষজ্ঞদের : পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগ (আইএমইডি) দীর্ঘদিন ধরে প্রকল্পটির ধীরগতির বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। সংস্থাটি সময়মতো কাজ শেষ করতে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের একাধিকবার তাগিদ দিয়েছে। প্রয়োজন হলে দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানিয়েছে।

এ বিষয়ে নৌ, সড়ক ও রেলপথ রক্ষা জাতীয় কমিটির সাধারণ সম্পাদক আশীষ কুমার দে কালের কণ্ঠকে বলেন, অর্থায়ন ও অন্যান্য জটিলতায় যদি সাড়ে আট শ কোটি টাকার প্রকল্প সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকায় চলে যায়, তাহলে তো হবে না। একদিকে সময় বাড়ছে, অন্যদিকে অর্থ ব্যয়ও বাড়ছে, আবার যাত্রীরাও যথাসময়ে সেবা পাচ্ছে না। এ জন্য সরকারের উচিত অর্থায়ন জটিলতা বা অন্যান্য সমস্যা দেখা দিলে বিকল্প অর্থায়নের ব্যবস্থা রাখা।

নগর ও গণপরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আদিলুর রহমান খান বলেন, বিদেশি ঋণের প্রকল্পে অচলাবস্থা তৈরি হলে সেটা জিটুজি প্রকল্প হলেও অর্থায়নে সরকারকে বিকল্প রাখা উচিত। সরকারের রেল বেইস প্রকল্পে প্রাধান্য নেই, সে জন্য এই প্রকল্প চলা অবস্থায় এক্সপ্রেসওয়েরও কাজ শুরু করেছে। অথচ ঢাকা-টঙ্গী চতুর্থ রেলপথ তৈরি হলে এই রুটে দ্বিগুণ মানুষের চলাচলের সুযোগ হতো। সরকারের অবশ্যই উচিত ঋণদাতারা ব্যর্থ হলে এর বিকল্প ব্যবস্থা নিতে, যাতে খরচ তিন-চার গুণ বেড়ে জনগণের ওপরে বোঝা তৈরি না হয়।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন