ঢাকা, শনিবার, ১৪ মার্চ ২০২৬

২৯ ফাল্গুন ১৪৩২, ২৪ রমজান ১৪৪৭

মেট্রোরেল

সুযোগ সন্ধানীদের ফাঁদে মেট্রোরেল

বিশেষ প্রতিবেদক

প্রকাশ: ১৬:২৩, ৫ মার্চ ২০২৬

সুযোগ সন্ধানীদের ফাঁদে মেট্রোরেল

ছবি :সংগ্রহীত

রাজধানীর ঢাকা মেট্রোরেলে ‘উল্টো যাত্রা’ বা অতিরিক্ত পথ ঘুরে সিট দখলের অভিযোগ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সচিবালয়  মেট্রো স্টেশনসহ মাঝপথের কিছু যাত্রী মতিঝিল মেট্রো স্টেশনগামী ট্রেনে উঠে শেষ স্টেশনে না নেমে ট্রেন ঘুরে উত্তরা অভিমুখে একই সিটে বসে ফিরে আসছেন। এতে মাঝপথের স্টেশনগুলো থেকে ওঠা অনেক যাত্রী সিট না পেয়ে দাঁড়িয়ে যাত্রা করতে বাধ্য হচ্ছেন।

নিয়মিত যাত্রীদের অভিযোগ, সচিবালয় থেকে মতিঝিল হয়ে আবার সচিবালয় বা উত্তরা যাওয়ার এই কৌশলে ভাড়ার হিসাবেও অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও আলোচনা-সমালোচনা বাড়ছে।

যাত্রীদের বর্ণনা অনুযায়ী, সচিবালয় স্টেশনে উত্তরামুখী ট্রেনে অনেক সময় সিট পাওয়া যায় না। এ অবস্থায় কিছু যাত্রী মতিঝিলগামী ট্রেনে উঠে শেষ প্রান্তে পৌঁছান। সেখানে নামার পরিবর্তে ট্রেনের ভেতরেই বসে থাকেন। পরে ট্রেনটি বিপরীতমুখে উত্তরার দিকে যাত্রা শুরু করলে তারা বসা অবস্থাতেই ফিরে আসেন।

এর ফলে সচিবালয়, শাহবাগসহ পরবর্তী স্টেশনগুলোতে ওঠা যাত্রীরা সিটের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন। বিশেষ করে ব্যস্ত সময়ে অনেককেই দাঁড়িয়ে যাত্রা করতে হয়।

একাধিক যাত্রী বলেন, শেষ স্টেশনে যাত্রীদের নামা বাধ্যতামূলক না থাকায় এবং ট্রেন দ্রুত ঘুরে যাওয়ায় এ সুযোগ তৈরি হয়েছে। শেষ স্টেশনে নেমে পুনরায় বোর্ডিংয়ের ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা হলে এ প্রবণতা কমতে পারে বলে মনে করছেন তারা।

মেট্রোরেলের ভাড়া দূরত্বভিত্তিক। অর্থাৎ যে যাত্রী যত দূরত্ব অতিক্রম করেন, সে অনুযায়ী ভাড়া পরিশোধ করেন। সমালোচকদের মতে, কেউ যদি সচিবালয় থেকে উত্তরা যেতে চান, তবে সরাসরি উত্তরামুখী ট্রেনে ওঠাই স্বাভাবিক।তবে কেবল সিট নিশ্চিত করতে মতিঝিল পর্যন্ত গিয়ে আবার ফিরে আসা ভাড়ার নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক না হলেও নৈতিকতার প্রশ্ন তোলে এবং অন্য যাত্রীদের জন্য অসুবিধা সৃষ্টি করে।

সাধারণ যাত্রীরা বলছেন, এভাবে সিট দখলের প্রবণতা বন্ধে দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। তাদের মতে, গণপরিবহনের মূল উদ্দেশ্য সবার জন্য সমান সুযোগ নিশ্চিত করা।

নিয়মিত যাত্রী আব্দুল গনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লিখেছেন, মতিঝিলের কয়েক স্টেশন আগে থেকেই সিট দখল করে উত্তরার দিকে যাওয়ার অনৈতিক কাজ বন্ধ হওয়া উচিত। তার মতে, শেষ স্টেশনে পৌঁছে যাত্রীদের নামা বাধ্যতামূলক করা হলে এমন প্রবণতা অনেকটাই কমে যাবে।

অন্য এক যাত্রী সাইফুল্লাহ কাওসার বলেন, গণপরিবহনে ব্যক্তিগত সুবিধার চেয়ে সামষ্টিক স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কৌশল করে আগে থেকে সিট দখল করলে তা অন্য যাত্রীদের প্রতি অন্যায় হয়ে যায়।

তবে সবাই বিষয়টিকে একইভাবে দেখছেন না। রুহুল আলম তারিক নামের এক যাত্রীর মতে, অতিরিক্ত দূরত্বের জন্য ভাড়া পরিশোধ করা হলে সেটিকে পুরোপুরি অবৈধ বলা কঠিন। তার মতে, স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা না থাকলে যাত্রীরা সুযোগ নিতেই পারেন। এ মন্তব্য নিয়েও সামাজিক মাধ্যমে নতুন বিতর্ক তৈরি হয়েছে।

মেট্রোরেল পরিচালনাকারী প্রতিষ্ঠান ডিএমটিসিএল জানিয়েছে, মতিঝিল ঘুরে সিট দখলের এই প্রবণতার বিষয়টি তাদের জানা আছে। এর আগেও এমন অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযান চালিয়ে কয়েকজন যাত্রীকে সতর্ক করা হয়েছে এবং জরিমানাও করা হয়েছে।ডিএমটিসিএলের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) মো. নজরুল ইসলাম বলেন, বিষয়টি কর্তৃপক্ষের নজরে রয়েছে এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

সংশ্লিষ্টরা জানান, শেষ স্টেশনে যাত্রীদের নামা নিশ্চিত করা এবং প্ল্যাটফর্ম ও ট্রেনে নজরদারি বাড়ানোর বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। যাত্রীদেরও নিয়ম মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ও বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) অধ্যাপক ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, মেট্রোরেল মূলত সময়নির্ভর নগর পরিবহন ব্যবস্থা। এখানে বসে বা দাঁড়িয়ে যাওয়ার বিষয়টি মুখ্য নয়; নির্দিষ্ট সময়ে দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোই প্রধান লক্ষ্য।

তার মতে, শেষ স্টেশনে যাত্রীদের নামা বাধ্যতামূলক করা, ঘোষণা জোরদার করা এবং প্রয়োজনে নীতিমালায় পরিবর্তন এনে শাস্তির বিধান যুক্ত করলে এ ধরনের আচরণ কমে আসতে পারে।

এ সম্পর্কিত খবর

আরও পড়ুন