শিরোনাম
রেল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ০০:৩৩, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | আপডেট: ০০:৩৩, ২৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬
গ্রাফিক্স
বাংলাদেশ রেলওয়ের মতো একটি বৃহৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে দুর্নীতি ও অনিয়মের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমের অনুসন্ধানী ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তবে সাংবাদিকতা, ঠিকাদারি ব্যবসা, বিজ্ঞাপননির্ভর সম্পর্ক এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের মধ্যে স্বার্থের সংঘাত তৈরি হলে তা শুধু সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীর জন্য নয়, গণমাধ্যমের বিশ্বাসযোগ্যতার জন্যও উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
রেলওয়ের বিভিন্ন পর্যায়ের সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ঠিকাদারি ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত কিছু ব্যক্তি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে রেলওয়ের বিভিন্ন ক্ষেত্রে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। কোটি কোটি টাকার ঠিকাদারি কাজ প্রত্যাশামতো না পাওয়া, নির্দিষ্ট সিদ্ধান্ত অনুকূলে না যাওয়া কিংবা পছন্দের কর্মকর্তা-কর্মচারীর বদলি, পদায়ন ও পদোন্নতির সুপারিশ বাস্তবায়িত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি ও অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংবাদ প্রকাশের ঘটনাও ঘটে বলে অভিযোগ রয়েছে।
তবে বিষয়টি শুধু ঠিকাদারি স্বার্থের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। রেলওয়ের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, কিছু ক্ষেত্রে বিজ্ঞাপন বা অন্যান্য সুবিধাকে কেন্দ্র করেও সাংবাদিক ও কর্মকর্তাদের মধ্যে এক ধরনের নির্ভরশীল সম্পর্ক তৈরি হয়। চট্টগ্রামের সিআরবি, রাজশাহী রেলওয়ে দপ্তর, ঢাকার রেল ভবনসহ বিভিন্ন কার্যালয়ে কর্মরত কর্মকর্তাদের কেউ কেউ অভিযোগ করেন, কিছু গণমাধ্যমকর্মী নিয়মিত দপ্তরে যাতায়াত করেন এবং বিজ্ঞাপন বা বিভিন্ন সহযোগিতার প্রত্যাশা রাখেন। সংশ্লিষ্টদের দাবি, প্রত্যাশিত সহযোগিতা না পেলে কোনো কোনো ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি, অর্থ লোপাট, বিদেশে অর্থ পাচার, অবৈধ সম্পদ অর্জন বা অনিয়মের অভিযোগ তুলে সংবাদ প্রকাশের প্রবণতা দেখা যায়।
তবে এ অভিযোগের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ও স্পষ্ট করা প্রয়োজন—সব সাংবাদিককে এক কাতারে ফেলা যায় না। দেশের অধিকাংশ সাংবাদিক পেশাগত নৈতিকতা মেনে জনস্বার্থে কাজ করেন এবং দুর্নীতির তথ্য অনুসন্ধান ও প্রকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাই কিছু ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের দায় পুরো সাংবাদিক সমাজের ওপর বর্তানো সমীচীন নয়।
অভিযোগের বিষয়টি শুধু সংবাদপত্র বা অনলাইন নিউজ পোর্টালে প্রকাশিত প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ নয়। চট্টগ্রামে সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মিথ্যা, বিভ্রান্তিকর ও মানহানিকর তথ্য প্রচার, ছবি ব্যবহার করে ফটোকার্ড তৈরি এবং এসব পোস্টের লিংক বিভিন্ন ব্যক্তি ও সরকারি দপ্তরে পাঠিয়ে চাপ সৃষ্টির অভিযোগও উঠেছে।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কোনো কোনো ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি পোস্ট বা ফটোকার্ড ছড়িয়ে দেওয়ার পর সেটি বিভিন্ন গ্রুপ ও ব্যক্তিগত যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিতভাবে ছড়ানো হয়। এমনকি প্রচারিত তথ্য সরিয়ে নেওয়া বা আরও ভাইরাল না করার বিনিময়ে অর্থ দাবির চেষ্টার অভিযোগও রয়েছে। এসব অভিযোগের সত্যতা অবশ্যই তদন্ত ও প্রমাণের মাধ্যমে নির্ধারণ করতে হবে। তবে অভিযোগগুলো সত্য হলে তা কেবল সাংবাদিকতার প্রশ্ন নয়; বরং আইনশৃঙ্খলা ও সাইবার অপরাধের বিষয় হিসেবেও বিবেচিত হতে পারে।
সম্প্রতি পাহাড়তলী রেলওয়ে এলাকার একটি সরকারি অফিসকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একটি ফটোকার্ড ছড়িয়ে পড়ার ঘটনাও এ প্রসঙ্গে আলোচনায় এসেছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, ফটোকার্ডে যার নাম ও ছবি ব্যবহার করা হয়েছে, তিনি সংশ্লিষ্ট অফিসের প্রধান নন এবং প্রচলিত সরকারি বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কাজ অনুমোদন বা সম্পাদনের একক ক্ষমতাও তার নেই। অথচ উপস্থাপনায় এমন ধারণা দেওয়া হয়েছে যেন পুরো কার্যক্রমটি ওই কর্মকর্তা একাই নিয়ন্ত্রণ করেন। এ ধরনের উপস্থাপন সত্যতা যাচাই ছাড়া করা হলে তা একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত ও পেশাগত মর্যাদা ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি জনসাধারণের মধ্যেও বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে।
সরকারি কোনো কাজের দায়ও সাধারণত একজন কর্মকর্তার ওপর এককভাবে বর্তায় না। সরকারি ক্রয়, উন্নয়ন প্রকল্প, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত ও আর্থিক অনুমোদনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত বিধি-বিধান, কমিটি, কারিগরি মূল্যায়ন এবং বিভিন্ন পর্যায়ের অনুমোদন প্রক্রিয়া থাকে। ফলে কোনো সিদ্ধান্তের সঙ্গে যুক্ত একাধিক স্তর ও কর্তৃপক্ষকে বাদ দিয়ে শুধু একজন কর্মকর্তাকে দায়ী করে সংবাদ বা প্রচারণা চালানো হলে তথ্যের পূর্ণতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
তবে এর অর্থ এই নয় যে কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ প্রকাশ করা যাবে না। বরং প্রকৃত দুর্নীতি, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের তথ্য থাকলে তা নথিপত্রসহ প্রকাশ করা সাংবাদিকতার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব। প্রশ্ন হচ্ছে—অভিযোগের পেছনে প্রমাণ কী, অভিযোগকারীর সম্ভাব্য স্বার্থ কী এবং সংবাদ প্রকাশের আগে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষের বক্তব্য নেওয়া হয়েছে কি না।
রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলোর অভিযোগ, বিষয়টির আরেকটি দিকও রয়েছে। কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারীও নিজেদের স্বার্থে প্রভাবশালী ঠিকাদার, ব্যবসায়ী বা গণমাধ্যমসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ব্যবহার করেন। অর্থাৎ একদিকে ব্যবসায়িক স্বার্থ, অন্যদিকে প্রশাসনিক স্বার্থ এবং মাঝখানে গণমাধ্যমের প্রভাব—এই ত্রিমুখী সম্পর্ক থেকেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে অঘোষিত প্রভাববলয় তৈরি হতে পারে।
সুতরাং রেলওয়ের ঠিকাদারি কাজ, বিজ্ঞাপন বণ্টন, বদলি-পদায়ন ও পদোন্নতির সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের প্রকাশিত সংবাদ বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচারণার মধ্যে কোনো অস্বাভাবিক যোগসূত্র রয়েছে কি না, তা নথিপত্রের ভিত্তিতে অনুসন্ধান করা প্রয়োজন।
কারণ দুর্নীতির বিরুদ্ধে সাংবাদিকতা যেমন প্রয়োজন, তেমনি সাংবাদিকতার পরিচয় ব্যবহার করে ব্যক্তিগত, ব্যবসায়িক বা প্রশাসনিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ থেকেও গণমাধ্যমকে মুক্ত থাকতে হবে। অভিযোগের বিচার হোক প্রমাণে, আর সংবাদ প্রকাশ হোক জনস্বার্থে—ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়।
লেখক : মনিরুজ্জামান মনির
সাংবাদিক ও কলামিস্ট