শিরোনাম
রেল নিউজ ডেস্ক
প্রকাশ: ২০:৩০, ২১ অক্টোবর ২০২৬ | আপডেট: ০০:০৮, ২২ অক্টোবর ২০২৬
গ্রাফিক্স
রেললাইনে ট্রেনের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে শুধু একটি ত্রুটি নয়, বরং রেলপথ, স্লিপার, চাকা ও রেলের সংযোগস্থলসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন উপাদানের সম্মিলিত অবস্থা বিবেচনা করা জরুরি। এসব উপাদানের একাধিক ত্রুটি একসঙ্গে দেখা দিলে ট্রেনের চলাচলে ভারসাম্যহীনতা তৈরি হতে পারে, যা একপর্যায়ে লাইনচ্যুতির ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
সম্প্রতি রেলপথের বিভিন্ন ত্রুটি ও সেগুলোর পারস্পরিক প্রভাব ব্যাখ্যা করতে গিয়ে এমন পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন বাংলাদেশ রেলওয়ের অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব) আতাউল হক ভুঁঞা।
তাঁর ব্যাখ্যায়, চাকা ও রেলের সংযোগস্থলে ত্রুটি দেখা দিলে চাকা রেলের ওপর স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হওয়ার প্রক্রিয়া ব্যাহত হতে পারে। এতে চাকা ও রেলের সংস্পর্শের জ্যামিতি পরিবর্তিত হয় এবং ট্র্যাকের নির্দিষ্ট অংশে চাপের বণ্টনেও পরিবর্তন আসতে পারে। ফলে ট্র্যাকের কয়েকটি স্লিপার বা নির্দিষ্ট অংশে অতিরিক্ত চাপ কেন্দ্রীভূত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।
তিনি রেললাইনের এই সমস্যাকে বিচ্ছিন্ন কোনো ত্রুটি হিসেবে না দেখে একাধিক ত্রুটির সম্মিলিত প্রভাব হিসেবে বিবেচনা করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর ভাষায়, এটি একটি ‘ডিফেক্ট ফ্যামিলি’ বা পরস্পর সম্পর্কযুক্ত ত্রুটির সমষ্টি। অর্থাৎ, রেলপথের একটি অংশে ত্রুটি দেখা দিলে তার প্রভাব অন্য উপাদানেও পড়তে পারে।
আতাউল হক ভুঁঞার ব্যাখ্যায়, রেল ও চাকার সংস্পর্শস্থলে স্বাভাবিক অবস্থা নষ্ট হলে ট্র্যাকে সৃষ্ট বল ও চাপের বণ্টন পরিবর্তিত হতে পারে। ট্র্যাকের কাঠামো সেই চাপ যথাযথভাবে ধারণ বা ছড়িয়ে দিতে না পারলে নির্দিষ্ট স্থানে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ট্র্যাকের দৃঢ়তার তারতম্য বা ডিফারেনশিয়াল স্টিফনেসও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
এ ছাড়া চাকার ফ্ল্যাট বা সমতল অংশ তৈরি হওয়া, রোলিং রেডিয়াসের তারতম্য এবং রেলের সিটে স্লিপারের অবস্থানগত ত্রুটি ট্রেন চলাচলের সময় গতিশীল বল বাড়িয়ে দিতে পারে। বিশেষ করে একই অ্যাক্সেলে যুক্ত দুটি চাকার ঘূর্ণন ও অতিক্রান্ত দূরত্বের মধ্যে সামঞ্জস্যহীনতা তৈরি হলে চাকা-রেল সংযোগে অতিরিক্ত গতিশীল প্রতিক্রিয়া দেখা দিতে পারে।
একটি বগির আটটি চাকা চলার সময় সমানভাবে লোড বহন করে কি না, সেই প্রশ্নও সামনে এনেছেন তিনি। বাস্তবে ট্র্যাকের অবস্থা, সাসপেনশন, চাকার অবস্থা ও চলাচলের গতির মতো বিষয়ের কারণে চাকার ওপর লোডের বণ্টন পরিবর্তিত হতে পারে। এর সঙ্গে চাকার ফ্ল্যাট বা ট্র্যাকের জ্যামিতিক ত্রুটি যুক্ত হলে লোডিং-আনলোডিং এবং গতিশীল চাপের মাত্রা বাড়তে পারে।
তাঁর আলোচনায় ফ্ল্যাঞ্জ ক্লাইম্বিংয়ের বিষয়টিও উঠে এসেছে। চাকা রেলের ওপর স্বাভাবিকভাবে পরিচালিত হওয়ার পরিবর্তে ফ্ল্যাঞ্জের মাধ্যমে রেলের মাথার ওপর উঠে যাওয়ার প্রবণতা তৈরি হলে লাইনচ্যুতির ঝুঁকি দেখা দিতে পারে। চাকা ও রেলের সংস্পর্শের অবস্থা, ঘর্ষণ, গতিশীল বল এবং ট্র্যাকের জ্যামিতিক ত্রুটি—সবকিছুই এ ধরনের ঘটনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
এ ছাড়া কয়েকটি স্লিপারের রেল সিটের অবস্থান নষ্ট হওয়া, রেলের মাথার অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া কিংবা রেলজয়েন্টে নির্ধারিত জ্যামিতির বিচ্যুতি ট্র্যাকের ওপর অতিরিক্ত গতিশীল বল তৈরি করতে পারে বলে উল্লেখ করেছেন তিনি। চাকার ফ্ল্যাটের মতো ত্রুটি থাকলে এ ধরনের বল আরও বাড়তে পারে।
আতাউল হক ভুঁঞার বক্তব্যের মূল বিষয় হলো, ট্রেনের লাইনচ্যুতিকে শুধু একটি চাকা, একটি স্লিপার বা রেললাইনের একটি নির্দিষ্ট ত্রুটির ফল হিসেবে দেখলে পুরো পরিস্থিতি বোঝা সম্ভব নয়। বরং চাকা-রেল সংযোগ, ট্র্যাকের কাঠামো, স্লিপারের অবস্থা, রেলের জ্যামিতি এবং চলাচলের সময় সৃষ্ট গতিশীল বলের পারস্পরিক সম্পর্ক বিশ্লেষণ করা জরুরি।
রেলপথের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে তাই নিয়মিত ট্র্যাক পরিদর্শন, চাকা ও রেলের সংযোগস্থলের অবস্থা পর্যবেক্ষণ, স্লিপার ও রেল সিটের ত্রুটি শনাক্তকরণ এবং ট্র্যাকের জ্যামিতিক মান বজায় রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
**লেখক:** আতাউল হক ভুঁঞা
অতিরিক্ত মহাব্যবস্থাপক (পূর্ব), বাংলাদেশ রেলওয়ে
সম্পাদনা-নোট: লেখাটিকে সংবাদপত্রের উপযোগী করে সাজানো হয়েছে। মূল লেখায় উল্লেখিত ‘দুই সেকেন্ডের নীতি’, ‘P-1/P-2 ফোর্স’ এবং নির্দিষ্ট জয়েন্ট অ্যাঙ্গেলের মতো কারিগরি দাবিগুলো স্বাধীনভাবে যাচাই করা হয়নি। প্রকাশের আগে এসব তথ্যের কারিগরি ভিত্তি নিশ্চিত করা ভালো।